নূপুর শর্মাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলো বটে, কিন্তু তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে মুসলিম সম্প্রদায়ের যে লোকজন ক্ষোভ-বিক্ষোভ করেছিল, তাদের শায়েস্তা করা হলো, উপরন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের কাছে এই বার্তাও দেওয়া গেল যে মুসলমানরা অসহিষ্ণু ও হিংসাপ্রবণ, এদের ‘লাইনে’ রাখতে হলে বিজেপির বিকল্প নেই। এক ঢিলে কয়েকটি পাখি মারার এসব কৌশল বিজেপিকে নিতেই হয়। বাবরি মসজিদ, কাশ্মীর, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ইত্যাদি বিদ্বেষ জাগানোর মতো ইস্যু না থাকলে, দেশের অনিয়ম, দুর্নীতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ব্যর্থতার কথা ওঠে। তখন নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কথাও সজোরে বলতে থাকে বিরোধীরা। সামনে নির্বাচন থাকলে এসব কথা খুবই বিপদে ফেলে দেয় সরকারি দলের নীতিনির্ধারকদের। তাই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বহু পুরোনো ক্ষতটিতে সময়মতো খোঁচা দিলে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যায়। নূপুর শর্মা দল থেকে বহিষ্কৃত হলেন বটে, তবে যাওয়ার আগে তাঁর প্রতি দলের অর্পিত দায়িত্বটিও পালন করে গেলেন তিনি।

কিন্তু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তো বিজেপি নয়। ভারতে বিজেপির হিন্দু জাতীয়তাবাদ আর রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখন আর লুকোছাপার কোনো বিষয় নয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় একটি সাম্প্রদায়িক দল থাকলে সেখানকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থা কী হতে পারে, তার উদাহরণ যেমন বিজেপিশাসিত ভারতে আমরা দেখছি, তেমনি দেখেছিলাম স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের আমলেও। ১৯৯০ সালে অযোধ্যায় উগ্রপন্থী হিন্দুরা বাবরি মসজিদে হামলা চালানোর পর জাতীয় পার্টির নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের উসকানিমূলক বক্তব্য আমরা যেমন শুনেছি, তেমনি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি দলের মদদে কীভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় থেকে শুরু করে ঘরবাড়ি আক্রান্ত হয়েছিল, সেটাও দেখেছি। এই বাবরি মসজিদ নিয়েই এ দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আরেক দফা হামলার ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ১৯৯২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে।

সারা দেশের মানুষ এখন জেনে গেছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় বা বাড়িঘরে কোনো না কোনো উপায়ে হামলা করা যায়। যদি কোনো যদু-মধু-শ্যাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজ ও অবাধ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট দেয় তাহলে তো কথাই নেই, এমনকি যদি একটি হিন্দু-বৌদ্ধ নাম দিয়ে নকল আইডি ব্যবহার করেও (কিছু ঘটনায় তা–ই প্রমাণ মিলেছে) উত্তেজক কিছু লেখা হয়, তখন কান চিলে নিল, না কাকে নিল, সেটা দেখার অবকাশ পর্যন্ত পায় না কিছু মানুষ, ‘অনুভূতি’র নামে ঝাঁপিয়ে পড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর।

কিন্তু আওয়ামী লীগ শাসনামলেও সেই নির্মম নিয়তির হাত থেকে কেন রক্ষা পেল না এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়? দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যে মুক্তিযুদ্ধ, সেই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। সেই দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সময়েই যেকোনো অসিলায় (ফেসবুকের পোস্ট) যদি দু-এক দিন পরপরই সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা হয়, যদি কোনো এক চপলমতি ছাত্রের হঠকারী ফেসবুক মন্তব্যের জন্য ইশপের গল্পের ভেড়ার জল ঘোলা করার মতো অজুহাত দেখিয়ে কলেজের অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে বিজেপি, আরএসএস, শিবসেনা, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি বা আওয়ামী লীগ সব একাকার হয়ে যায় নাকি?

সারা দেশের মানুষ এখন জেনে গেছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় বা বাড়িঘরে কোনো না কোনো উপায়ে হামলা করা যায়। যদি কোনো যদু-মধু-শ্যাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজ ও অবাধ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে ধর্ম অবমাননাকর পোস্ট দেয় তাহলে তো কথাই নেই, এমনকি যদি একটি হিন্দু-বৌদ্ধ নাম দিয়ে নকল আইডি ব্যবহার করেও (এ রকম বেশ কয়েকটি ঘটনার প্রমাণ ইতিমধ্যে মিলেছে) উত্তেজক কিছু লেখা হয়, তখন কান চিলে নিল, না কাকে নিল, সেটা দেখার অবকাশ পর্যন্ত পায় না কিছু মানুষ, ‘অনুভূতি’র নামে ঝাঁপিয়ে পড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর। অতঃপর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যখন দেখা যায় ব্যাপারটি সত্যি নয়, ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।

কিছু মানুষ ঘরবাড়ি-আশ্রয় হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আহাজারি করেছে, ভাঙা মন্দির ও দেব-দেবীর মূর্তি ও পোড়া ঘরের সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলোর ছবি দেখে ‘করুণাসিক্ত’ কিছু সহৃদয় ব্যক্তি ঢাকা-চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে মানববন্ধন করেছেন। এই নির্যাতনের বিচার দাবি করেছেন। তাতে আশ্বাস পাওয়া যায়, কিছু মামলা হয়, গ্রেপ্তারও হয় দোষী-নির্দোষ অনেকেই। কিন্তু যাকে আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বলি, সে রকম কিছু হয় না। অর্থাৎ রাষ্ট্র, আরও নির্দিষ্ট করে বললে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি, আশ্বস্ত করতে পারেনি।

ভারতে বিজেপি সরকারের সাম্প্রদায়িক নীতির পেছনে ভোটের রাজনীতি আছে। তাই তাদের মুখপাত্র (সাবেক) নূপুর শর্মা জেনে-বুঝেই সাম্প্রদায়িক উসকানি দেন। কিন্তু বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো মুখপাত্র সাম্প্রদায়িক উসকানি তো দেনই না, উপরন্তু অসাম্প্রদায়িক চেতনার দৃঢ়প্রত্যয় উচ্চারণ করেন। তবে ভোটের রাজনীতির কাছে তঁারাও অসহায় কি না, সেই প্রশ্ন জাগে। আবার দলীয় আদর্শের দায় বহন করার সদিচ্ছা সব নেতা-কর্মীর আদৌ আছে কি না, প্রশ্ন সেটাও। নড়াইলে কলেজ অধ্যক্ষকে জুতার মালা পরানোর ঘটনার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে নাগরিক সমাজের এক মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বলেছেন, ‘আমি বুঝতে পারি না এসব ঘটনা যখন ঘটে, তখন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ কর্মীরা কোথায় থাকে? তারা প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসে না কেন?’

বুঝতে আমরাও পারি না। বরং ভাবি, আওয়ামী লীগ আছে তো আওয়ামী লীগে? নাকি ভোটের আসনপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশে হারিয়ে গেছে সবকিছু? শুধু চট্টগ্রাম জেলায় ১৬টি সংসদীয় আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের রাজনৈতিক জীবনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা যে চিত্রটি পাই, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। শুধু জানাই, অন্তত পাঁচজন সংসদ সদস্য নিকট বা দূর অতীতে বিভিন্ন দল থেকে এসে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন ডবলমুরিংয়ের এম এ লতিফ (বিএনপি), পটিয়ায় শামসুল হক চৌধুরী (জাতীয় পার্টি), রাউজানে ফজলে করিম চৌধুরী (মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এনডিপি), সাতকানিয়ায় আবু রেজা মোহাম্মদ নেজাবুদ্দীন নদভী (জামায়াত), চকরিয়ায় জাফর আলম (জাসদ)। এ ছাড়া দলবদল না করেও অন্য দল থেকে নৌকায় চেপেছেন হাটহাজারীতে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (জাতীয় পার্টি) ও ফটিকছড়িতে নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী (তরীকত ফেডারেশন)।

এটি একটিমাত্র জেলার হিসাব। সারা দেশে নিশ্চয় এই হিসাবের খুব বেশি হেরফের হবে না। বিভিন্ন দল থেকে এসে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা তাঁদের ক্ষমতাবলয়ে বড় সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সেই সমর্থকেরা যতটা সংসদ সদস্যদের অনুগত, ততটা আওয়ামী লীগের কি না, সেই সন্দেহ থেকেই যায়।

ভোটের হিসাবের সঙ্গে নীতি-আদর্শের গরমিলে আওয়ামী লীগকে তার প্রকৃত চেহারায় পাওয়ার আশা এখন সত্যিকার অর্থেই যেন দুরাশা। মফিজুর রহমান যে বিস্ময় প্রকাশ করেন, বিভিন্ন অঘটনের সময় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের কর্মীরা কোথায় থাকেন, সেই প্রশ্নের মধ্যেই হয়তো তার উত্তর নিহিত। হয় তাঁরা নিষ্ক্রিয় থাকেন, নয়তো দুর্বলের ওপর আক্রমণের সময়ে নিজেরাই ভিড়ে যান ‘সবলে’র দলে।

একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তির কারণ সম্পর্কে ‘হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদে’র সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য যথার্থ বলে মনে হয়, ‘মামলাগুলো হচ্ছে দায়সারাভাবে। মামলা করে ভুক্তভোগীদের সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছে। আবার অপরাধীদের নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে, এসব মামলায় তাদের কিছু হবে না। আর তাই মামলা থেকে প্রকৃত অপরাধী জামিন পেয়ে যাচ্ছে।’ (প্রথম আলো, ১৮ জুলাই)

শেষ পর্যন্ত ‘এখানে তুমি সংখ্যালঘু, ওখানে তুমি জমজমাট’—গানের কথাটিকেই অনিবার্য মনে হয়, রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগই থাকুক বা ভারতীয় জনতা পার্টি।

বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক, কবি ও সাহিত্যিক

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন