অর্থাভাবে বিচারের বাণী নীরবে–নিভৃতে কাঁদে

মাথা থাকলে মাঝেমধ্যে সবারই কিছু না কিছু ব্যথা হয়। কারও হয় ঘন ঘন, কারও মাঝেমধ্যে, কারওবা কদাচিৎ। নিজের হাতে চেক করলাম। মাথাটা যেখানে থাকার কথা, সেখানেই আছে। একটা পুরোনো ব্যাপারে বাজেটের মৌসুম এলে মাথায় একটু–আধটু ব্যথা লাগে। এই ব্যথা বহু বছর ধরেই হচ্ছে।

মাথাব্যথার কারণটা নিয়ে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রথম আলো পত্রিকাতেই আমার কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল এবং ২০২২ সালে একটি সাক্ষাৎকারও। কমবেশি এক যুগ আগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সে (বিলিয়া) এ বিষয়ে সেমিনারও আয়োজিত হয়েছিল। এক যুগব্যাপী আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের বাজেট নিয়ে ‘ঘটরমটর’–এর একটা সুফল এখন দৃশ্যমান। এবারের বাজেট সামনে রেখে ১৮ মে প্রথম আলোতে আইনজীবী এম এম খালেকুজ্জামানের ‘বরাদ্দের বৈষম্য থেকে মুক্তি পাক বিচার বিভাগ’ শিরোনামেও একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

অন্য প্রসঙ্গ, সপ্তাহ দুয়েক আগে পরিচিত মধ্যবয়সী একজন নারী ঢাকার জেলা আদালতে গিয়েছিলেন। দুদিন পরে দেখা হওয়ামাত্রই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘জানেন লিফটের জন্য কত লম্বা লাইন ছিল?’ আদালত এলাকার নোংরা দুর্গন্ধময় অলিগলিতে চলাফেরা করে তাঁর নাকি বমি আসছিল। ঢাকার আদালত এলাকার কারও সমালোচনার জন্য ওই নারীর বক্তব্য তুলে ধরছি না। যাঁদের আদালতপাড়ায় এখনো যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি, তাঁদের কী মধুর অভিজ্ঞতা হতে পারে, সেই সাবধানতা বার্তা আগেভাগে দিয়ে রাখলাম। অবশ্য এটাও বলে রাখা দরকার যে কোনো কোনো জেলায় নতুন ইমারত হয়েছে। অবস্থার কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের ‘বিজয় ৭১’ নামে নতুন একটি কোর্ট বিল্ডিং হয়েছে। সকালে সেই বিল্ডিংয়ের লিফটের সামনে লাইন লেগে যায়। তবে বয়সের কারণে আমাকে অপেক্ষা করতে হয় না। জুনিয়র আইনজীবীরা জায়গা করে দেন। পাঠক মাত্রই জানেন, মন্ত্রণালয়গুলো এবং বাজেটের অন্তর্গত প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচাপাতির দুটি প্রধান বিভাজন থাকে—রাজস্ব ও উন্নয়ন খাত। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের জন্য এই বিভাজন সরকারের প্রকাশিত বাজেটে খুঁজে পাইনি।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে সুপ্রিম কোর্টের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ ছিল ১৯৬ কোটি টাকা; ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ২০৯ কোটি টাকা এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৩৭ কোটি টাকা। আগেও বলেছি, কিন্তু যেহেতু মাথাব্যথার উপশম হচ্ছে না, তাই আবার বলছি, ইদানীং চার লেনের মহাসড়কের খরচ কিলোমিটারপ্রতি ১০০ কোটি টাকা, তাই সুপ্রিম কোর্টের মোট বরাদ্দের অর্থ দিয়ে দুই কিলোমিটারের বেশি মহাসড়ক নির্মাণ কষ্টকর। আর দুই কিলোমিটার মহাসড়কের মধ্যে যদি আড়াই শ মিটারের সেতু বানাতে হয়, তাহলে বাজেট কত হবে কে জানে।

২.

আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দ ছিল ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা, যা একটু বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ৮৬ কোটি টাকা। আর এখন (২০২৩-২৪ অর্থবছর) ২ হাজার ২২২ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগের বছর থেকে বর্তমান বছরে মোটাদাগে বাড়ে ২০০ কোটি টাকা।

দেশে অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা কমবেশি দুই হাজার জন। তাঁদের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষার্থে অথবা প্রেষণে মন্ত্রণালয়ে ব্যস্ত থাকেন দুই থেকে তিন শ জন। অর্থাৎ দুই হাজার কোটি টাকায় ১ হাজার ৭০০ বিচারক দিয়ে ১৭ কোটি লোকের এই দেশে আইন ও বিচারের দায়িত্ব সম্পন্ন করা হচ্ছে।

এই অপ্রতুল বরাদ্দের ফলাফল সহজেই আঁচ করা যায়। ৩০ এপ্রিল ২০২৪ সালের দৈনিক কালবেলা পত্রিকার শিরোনাম ‘মন্ত্রীর ঘোষণার পরও মামলাজট বেড়েছে ছয় লাখ।’ কালবেলার এই রিপোর্ট থেকে কিছু সংখ্যা তুলে ধরছি। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, ‘প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের বিচারাধীন মামলার স্তূপ পৌঁছেছে ৪৩ লাখে। এক যুগ আগে ২০১২ সালে বিচারাধীন মামলা ছিল ২১ লাখ ৩৫ হাজার। এক যুগের ব্যবধানে বিচার বিভাগে মামলার জট বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।’

রিপোর্টে আরও বলা আছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে বিচারাধীন মামলা ছিল ৩৭ লাখ আর এই বছর ডিসেম্বরে সেই জট আরও ছয় লাখ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ লাখে। অর্থাৎ এক যুগে উন্নতি হয়েছে প্রচুর।

আইন ও বিচারের বাজেট নিয়ে অতীতে কলামগুলোর মতো এখানেও মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কথা না বললেই নয়। কোরবানির ঈদ আসছে, অতীতের মতো নিশ্চয়ই বলা হবে যে কোরবানির জন্য এক কোটি বা ওই গোছের বিরাটসংখ্যক গরু-ছাগল প্রস্তুত করা হয়েছে। যত দূর বুঝি, এই কমবেশি এক কোটি গরু-ছাগলের ব্যাপারে মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অবদান ঢাকঢোল পিটিয়ে বলার মতো না। কেননা, কোরবানির পশুর হাটে মন্ত্রণালয়ের গরু-ছাগল থাকে না।

অবশ্য মন্ত্রণালয়টি গবেষণা করে, খামারিদের উপদেশ দেয়, জাটকা ও ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ রাখাসহ কিছু প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করে। এই দায়িত্ব পালনের জন্য ২০২১-২২ অর্থবছরে ওই মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা, যা বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছিল ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। আমাদের চেয়ে প্রায় ডবল। মাছ, গরু-ছাগল খাব না বা খেতে চাই না, সেটা বলছি না; কিন্তু বিচারের জন্য আরও অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন।

৩.

বাজেটের মৌসুম এলেই বিভিন্ন মহল অর্থ বরাদ্দ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দেনদরবারে ব্যস্ত হয়ে যায়। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল নামে আমাদেরও আইন দ্বারা গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান আছে। ওকালতি করতে হলে ওই বার কাউন্সিলের বেশ জটিল লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করতে হবে। গত পরীক্ষার সিজনে মোটাদাগে ৫১ হাজার এলএলবি পাস করা ছেলেমেয়েরা পরীক্ষা পর্ব সম্পন্ন করেছিলেন। কৃতকার্য হয়েছিলেন তিন হাজারের কিছু বেশি। যাঁরা এখন অ্যাডভোকেট হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারবেন এবং মক্কেলের পক্ষ হয়ে ওকালতিও করতেও পারবেন।

বার কাউন্সিল উকিল হওয়ার পরীক্ষাটাকে কঠিন করে একটা ভালো কাজ করেছে। আরও ভালো কাজ হতো যদি বার কাউন্সিল আইন ও বিচারের অর্থ বরাদ্দে অপ্রতুলতা নিয়ে শোরগোল পাকাত। মামলাজটের ভারে বিচারপ্রার্থীরা নিষ্পেষিত। ফৌজদারি, দেওয়ানিসহ সব ধরনের মামলায় মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এমনকি যুগের পর যুগ আদালতপাড়ায় ধরনা দেওয়ার যে অবর্ণনীয় কষ্ট, সে ব্যাপারে কোনো সমবেদনা স্পষ্টতই নেই। দেশের প্রতিটি জেলায় আইনজীবীদের বার অ্যাসোসিয়েশন আছে, তাঁরাও নিশ্চুপ।

আরেকটা ভূতের চেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো যে আমাদের সরকারের কোনো আইনজীবী ক্যাডার নেই। সরকারের পক্ষ হয়ে ফৌজদারি মামলায় আসামিকে দোষী প্রমাণ করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের নিয়োগ, কত দিন থাকবেন, কখন বরখাস্ত হবেন, তার কোনো নিয়মনীতি নেই। সবই চলে হুজুরের কৃপায়।

সারা বিশ্বেই অ্যাটর্নি জেনারেল বা ক্ষেত্রবিশেষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের নিয়োগ হয় সরকারের ইচ্ছায়। অনেকটা মন্ত্রীদের মতো। এই দুটি উচ্চ পদের নিচের পদগুলো ক্যাডার সার্ভিসের মতো লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে চাকরিজীবনের জন্য একটা ক্যাডার সার্ভিস হিসেবে বহাল থাকে।

‘ল ক্যাডার’ বা রাষ্ট্রের আইনজীবী ক্যাডার না থাকার অন্যতম ফলাফল হলো—প্রথমত, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং দ্বিতীয়ত, মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ হেরে যাওয়া। সরকার কোনো তথ্য দেয় না, কিন্তু ধারণা করি, ফৌজদারি মামলায় আমাদের দেশে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার শতকরা ২০ ভাগ। বিএনপির নেতা–কর্মীরা এই হিসাবের বাইরে!

মোদ্দাকথা, বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ১ হাজার ৭০০ বিচারক নিয়ে ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে একটি সুষ্ঠু ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা অসম্ভব।

● ড. শাহদীন মালিক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইনের শিক্ষক