ট্রাম্পপন্থী মালিকানায় গিয়ে সিএনএন কি আগের মতো থাকবে

ডোনাল্ড ট্রাম্পফাইল ছবি

‘কেব্‌ল নিউজ নেটওয়ার্ক’ সিএনএন নামেই বেশি পরিচিত। সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন টেড টার্নার, যিনি ২৪ ঘণ্টা সংবাদজগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। তিনি ৮৭ বছর বয়সে ৬ মে ফ্লোরিডায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

টেড টার্নার ছিলেন এক দূরদর্শী, ব্যতিক্রমী ও জনহিতৈষী ব্যক্তিত্ব, যিনি চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ২৪ ঘণ্টাব্যাপী সম্প্রচার নেটওয়ার্ক সিএনএনের জন্য। সিএনএন যত দিন থাকবে, তত দিন প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁকে স্মরণ করবে এবং শ্রদ্ধা জানাবে।

সিএনএন আর কত দিন থাকবে

সেটাও টার্নার বলে গেছেন সিএনএন শুরু করার সময়। টার্নার ঘোষণা করেছিলেন: ‘পৃথিবী ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের সম্প্রচার বন্ধ করব না। আমরা সম্প্রচারে থাকব, আমরা পৃথিবী ধ্বংসের ঘটনাও সরাসরি কাভার করব, আর সেটাই হবে আমাদের সর্বশেষ ঘটনা, একেবারে শেষ সংবাদ।’

সিএনএন পৃথিবীর যেকোনো দেশে যাঁরা খবর পড়েন বা খবর দেখেন—সবার কাছে খুবই পরিচিত নাম। আমি, আপনি এবং আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন, যেকোনো ভাষায় সংবাদমাধ্যমে খবর পেয়ে থাকি না কেন, আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে সিএনএনের গ্রাহক। কারণ, সিএনএনের বরাত দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি সংবাদমাধ্যম প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু খবর পরিবেশন করে থাকে।

সিএনএন ২৪ ঘণ্টা খবর পরিবেশন করে। পৃথিবীর যেকোনো কোণে, যেকোনো দেশে যদি হঠাৎ কোনো সংবাদযোগ্য ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সিএনএনের কর্মীরা সেখানে ক্যামেরা নিয়ে হাজির হবেন এবং ‘লাইভ’ সংবাদ পরিবেশন করবেন। সেই সংবাদ যুদ্ধ, ভূমিকম্প, সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা নির্বাচন, যা–ই হোক না কেন! সিএনএন নামটার সঙ্গে আছে একধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা।

১৯৮০ সালের ১ জুন যাত্রা শুরু হয়েছিল সিএনএনের। টেড টার্নার তখন ছিলেন একটা ছোট রেডিও স্টেশনের মালিক। সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচারণায় যাঁর তেমন কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না, সেই টেড টার্নার শুরু করেন ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল সিএনএন। সিএনএন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনের সম্ভ্রান্ত সংবাদমাধ্যমগুলোয়, বলা চলে হাসাহাসি শুরু হয়ে যায় সিএনএনকে নিয়ে। নিন্দুকেরা সিএনএনের নাম রাখলেন ‘চিকেন নুডলস নেটওয়ার্ক’।

আরও পড়ুন

গণমাধ্যমজগতের আরেক কর্ণধার রুপার্ট মারডক তখন সিএনএন নিয়ে তাঁর নিউইয়র্ক পোস্ট পত্রিকায় যে খবর ছেপেছিলেন, তার শিরোনাম ছিল: ‘টার্নার কি উন্মাদ?’

সবাই বলল, কারা দেখবেন সারা দিনের এই সংবাদ চ্যানেল? বলা যায়, আমেরিকার বিখ্যাত সংবাদমাধ্যমগুলো প্রথম দিনেই সিএনএনের মৃত্যুসংবাদ লিখে ফেলল। অপেক্ষা শুধু প্রচার করার। পক্ষান্তরে, দূরদর্শী কেউ কেউ একে দেখেছিলেন ‘নিন্দুকপূর্ণ এক পৃথিবীতে একটি বৈপ্লবিক ও ইতিবাচক শক্তি’ হিসেবে।

টেড টার্নারের ‘খবরই সবকিছুর শীর্ষে’ প্রত্যয়ই সঠিক হলো। পৃথিবীটার প্রতিটি দেশেই এখন ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল চলছে। আমাদের দেশেও একাধিক সংবাদ চ্যানেল আছে। সিএনএন শুধু ২৪ ঘণ্টার সংবাদ নয়, সংবাদের অনেক নতুন ধারারও প্রবর্তন করেছে; যেমন ‘সিএনএন হেডলাইন’, ‘ব্রেকিং নিউজ’। আজকাল টিভিতে যে ‘টক শো’ আমরা দেখি, সেটাও এসেছে সিএনএনের এককালীন ‘ক্রসফায়ার’ অনুষ্ঠানের অনুকরণে। সিএনএনের ‘ল্যারি কিং লাইভ’ সাক্ষাৎকারের কলাকৌশলকে একটা নতুন মাত্রায় উন্নীত করেছিল। ল্যারি কিং শান্ত মেজাজে ‘বোকার’ মতো প্রশ্ন করে বিশ্বের সব জাঁদরেল লোকের মুখ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করে আনতেন।

সিএনএনের মালিকানা বদল হচ্ছে। সিএনএনকে বর্তমান মালিক ওয়ার্নার ব্রাদার্স থেকে কিনছেন প্রযুক্তি কোম্পানি ওরাকলের মালিক ল্যারি এলিসনের ছেলে ডেভিড এলিসন। তাঁরা বাপ-ছেলে দুজনেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোর সমর্থক।

এলিসন হলেন প্যারামাউন্টের স্বত্বাধিকারী। স্ট্রিমিং প্রযুক্তির উদ্ভাবক নেটফ্লিক্সও সিএনএনকে কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা প্যারামাউন্টের সঙ্গে পেরে ওঠেনি।

অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন মালিকদের অধীন সিএনএন কি তার স্বাধীনতা রাখতে পারবে? ভবিষ্যতে সিএনএন খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভরশীলতা নিয়ে কি এখনকার মতো আস্থা রাখা যাবে? নেটফ্লিক্স যদি সিএনএনকে কিনতে পারত, তাহলে সিএনএনের অনুরাগীরা আশ্বস্ত হতো। কারণ, নেটফিলিক্সের কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই।

আরও পড়ুন

আগেও সিএনএনের মালিকানা বেশ কয়েকবার হাত বদলিয়েছে। প্রতিবারই নানা শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, তবে এখন পর্যন্ত সিএনএন তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। তবে ট্রাম্পের সময়ে আগের সব বিশ্বাস বদলে গেছে। তাই তো সবার এত ভয়! এই বিক্রয়ের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। সেটা যে শুধু আনুষ্ঠানিকতা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কথা শুনলেই বোঝা যাবে ভবিষ্যতে সিএনএনের জন্য কী অপেক্ষা করছে। তিনি বলেছেন, তিনি সিএনএনের নিয়ন্ত্রণ ধনকুবের ডেভিড এলিসনের হাতে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। পেন্টাগনে এক ব্রিফিং চলাকালে তিনি বলেন, ‘ডেভিড এলিসন যত দ্রুত ওই নেটওয়ার্কের দায়িত্ব নেবেন, ততই মঙ্গল।’

রুপার্ট মারডকের ফক্স নিউজ চ্যানেলের সাবেক কর্মচারী হেগসেথ কেন যে এত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, তা বুঝতে কারও কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশন নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযোগ উত্থাপন করে আসছিলেন হেগসেথ। নিউইয়র্ক টাইমস এক সংবাদ বিশ্লেষণে লিখেছে, ‘সেক্রেটারি হেগসেথের এই বক্তব্য সিএনএনের অভ্যন্তরে এবং সংবাদমাধ্যমের অন্যান্য মহলে বিদ্যমান এই উদ্বেগকেই জোরালো করে তুলেছে যে এলিসন হয়তো নেটওয়ার্কটির সংবাদ পরিবেশনের ধারাকে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ বা ট্রাম্পের অনুকূল কোনো দিকে পরিচালিত করতে পারেন।’

প্রতিবেদনে আরও লেখা হয়েছে, ‘সিএনএনের অভ্যন্তরে কর্মরত প্রতিবেদক ও প্রযোজকেরা এই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে যদি প্যারামাউন্ট কোম্পানিটিকে অধিগ্রহণ করে নেয়, তবে তাদের সংবাদকক্ষের স্বাধীনতা, যা তাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়, তা হয়তো ক্ষুণ্ন হতে পারে।’

এই নতুন পরিস্থিতি সিএনএনের সংবাদকক্ষে বড় উদ্বেগ ও শঙ্কা সৃষ্টি করেছে। তা দেখে চ্যানেলটির প্রধান নির্বাহী মার্ক টম্পসন একটি নথি প্রকাশ করতে বাধ্য হন। টম্পসন লিখেছেন, ‘এই পুরো প্রক্রিয়া চলাকালে আপনারা অনেক জল্পনা-কল্পনায় পড়েছেন, তা সত্ত্বেও আমি আপনাদের পরামর্শ দেব যে যতক্ষণ না আমরা আরও বিস্তারিত জানতে পারছি, ততক্ষণ ভবিষ্যতের ব্যাপারে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তে উপনীত হবেন না।’

সিএনএনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এলিসনের বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং ট্রাম্প নিয়মিতভাবেই সিএনএনকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে তীব্র সমালোচনা করে থাকেন।

তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অন্য আরেকটা বড় মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যম সিবিএসের মালিকও এলিসন। সেটাও ক্রমান্বয়ে ট্রাম্পের দিকে হেলছে। অনেকে মনে করেন, এলিসন খরচ কমানোর জন্য সিবিএস এবং সিএনএনের সংবাদ সংগ্রহের কার্যক্রমগুলোকে একীভূত করতে পারেন। তাতে সিএনএনের সংবাদ সংগ্রহ এবং সম্প্রচারের স্বাধীনতা দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হবে।

প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে সিএনএন কি তার সংবাদ প্রচারের বিশ্বস্ততা ধরে রাখতে পারবে?

টার্নার আগেই সিএনএনের মালিকানা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে সিএনএন যত দিন থাকবে, মালিকানা যাঁর হাতেই থাকুক না কেন, সিএনএনের সঙ্গে টেড টার্নারের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকবে। আমরা আশা করব, শুধু নাম নয়, সিএনএন টেড টার্নারের ‘সংবাদ প্রচারে বিশ্বস্ততা’র ঐতিহ্যকেও ধরে রাখবে।

সিএনএনের জন্মলগ্ন থেকেই সিএনএনের সঙ্গে আমার পরিচয়। জীবিকার প্রয়োজনে একাধিক দেশে এবং অনেক শহরে আমাকে যেতে হয়েছে। সিএনএনও সব সময় আমার সঙ্গেই ছিল। কত ঘটনা, কত নির্বাচন, কত যুদ্ধ, কত ব্রেকিং নিউজ যে সিএনএনের পর্দায় ‘জীবন্ত’ দেখেছি, তা অল্প কথায় লেখা সম্ভব নয়! এখনো মনে আছে, ১৯৮৬ সালে নাসার চ্যালেঞ্জের স্পেস শাটল যখন আকাশে বিস্ফোরিত হয়েছিল, বিরাট এক আতশবাজি যেন মেঘের কুণ্ডলী পাকিয়ে আটলান্টিকে নেমে পড়ছিল। এত বড় একটা দুর্ঘটনা যেন চোখের সামনেই ঘটে গেল। টেড টার্নার, তোমাকে ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি, তুমি সিএনএন প্রতিষ্ঠা না করলে এর সবই আমাকে অন্যদের চোখেই দেখতে হতো।

  • সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ই-মেইল: [email protected]