সংসদীয় স্থায়ী কমিটি: প্রতিশ্রুতি থেকে পিছু হটলে আস্থা থাকবে কীভাবে

বিএনপি ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাস পার হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব, অর্থনৈতিক চাপ ও জ্বালানিসংকট সামলাতে এখনো তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে সরকারকে এমন কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যাচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অনাস্থার পরিবেশ তৈরির দিকে নিয়ে যেতে পারে। অর্থনৈতিক ও জ্বালানিসংকটের অজুহাত হিসেবে যুদ্ধ ও বিগত দেড় দশকের স্বৈরশাসনকে দাঁড় করানোর সুযোগ থাকলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এ ধরনের অজুহাত দেওয়ার সুযোগ নেই।

কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। জুলাই সনদ মূলত রাজনৈতিক সমঝোতার দলিলে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দীর্ঘ আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এমন একটি রূপরেখা তৈরি করতে সক্ষম হওয়াটা এক বড় অর্জন এবং রাজনৈতিক সাবালকত্বেরও লক্ষণ। এতে প্রস্তাবিত সংস্কারের পক্ষে গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটও পড়েছে। সরকারের মন্ত্রীরা একাধিকবার জুলাই সনদ ‘অক্ষরে অক্ষরে’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যদিও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। 

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

সনদে কিছু বিষয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট ছিল, আবার কিছু বিষয়ে বিএনপিও সর্বসম্মত ঐকমত্য জানিয়েছিল। গণভোট বিএনপির এই নোট অব ডিসেন্টকে খারিজ করে দেয় কি না, আপাতত এ প্রশ্ন মুলতবি রেখে দেখা যেতে পারে, যেসব বিষয়ে বিএনপি নিজেরাও সায় দিয়েছিল, সেগুলোর কী হাল? 

যেমন জুলাই সনদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, ‘নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে পৃথকীকরণের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব সচিবালয় থাকবে এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।’ এ বিষয়ে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ-সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশও জারি করেছিল। অথচ ক্ষমতায় এসে বর্তমান সরকার সংসদে সেই অধ্যাদেশ বাতিল করে দিল। 

মনে রাখা দরকার, আমাদের রাজনীতিতে আস্থার সংকটই প্রবল। একদিকে কোনো রাজনৈতিক দলই অপরকে ন্যূনতম কোনো বিষয়ে বিশ্বাস করে না। অন্যদিকে জনগণের মধ্যেও প্রবল বিশ্বাস রয়েছে, ক্ষমতায় গিয়ে কেউই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে না। এমন পরিস্থিতিতে সদ্য গড়ে ওঠা কোনো সমঝোতার প্রতি আস্থা তৈরির মূল দায় বর্তায় সরকারি দলের ওপর। 

আবার ধরুন, সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতির বিষয়ে সনদে উল্লেখ করা হয়েছিল, ‘জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, অনুমিত হিসাব কমিটি ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্যে নির্বাচন করা হবে।’ এ বিষয়েও বিএনপির সম্মতি ছিল। এমনকি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও এ প্রতিশ্রুতি ছিল। 

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল আরেক চিত্র। সংসদে ৫০টি কমিটির মধ্যে বিরোধী দলের মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার কথা। কিন্তু শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদটি বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। সরকারি দল বলছে, এই অনুপাতে সভাপতির পদ দিতে তারা সাংবিধানিকভাবে বাধ্য নয়, ইতিহাসেও এমন নজির নেই। আবার তারা এ-ও বলছে, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে তারা এই পদগুলো দিতে রাজি হবে। 

জাতীয় সংসদ
ফাইল ছবি

এই যে দুটি বিষয় বলা হলো, এগুলো নিয়ে খোদ বিএনপিও ঐকমত্য জানিয়েছিল। এখন তারা বলতেই পারে, তারা আগে সংবিধান ‘সংশোধন’ করবে, পরে এসব করবে। যেমন সম্প্রতি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম দাবি করেছেন, জুলাই সনদ ‘বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন’ প্রয়োজন (প্রথম আলো, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

‘সংস্কার’ ও ‘সংশোধন’-এর সূক্ষ্ম পার্থক্য এড়িয়ে গিয়েও বলা যায়, সনদের সংস্কার প্রস্তাবগুলো মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথমত, কিছু প্রস্তাব ছিল সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে; আর দ্বিতীয়ত, কিছু প্রস্তাব ছিল আইন, অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি ছিল এই দ্বিতীয় অংশে। অর্থাৎ, এই সংস্কারের জন্য সংবিধান ‘সংশোধন’ করাও লাগবে না। 

একইভাবে সংসদীয় কমিটির সভাপতি কোন দল থেকে দেওয়া হবে, তা যেহেতু সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির কোথাও নির্ধারণ করা নেই, সেহেতু সনদের এ প্রস্তাব এখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। আবার এটা একটা মনোভঙ্গিরও বিষয়।

আরও পড়ুন

সরকার সনদের বিভিন্ন বিষয়কে এখন দর-কষাকষির উপাদানে পরিণত করতে চাইছে: আপনি যদি আমার এ দাবি মানেন, তাহলে আমরা এই দাবি মানব। প্রথমত, সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখা হবে কীভাবে? শপথ গ্রহণের দিনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিল করার মধ্য দিয়ে সরকার তার অবস্থান ও মনোভাব অনেকটাই স্পষ্ট করেছে। 

দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো কখনোই কোনো দর-কষাকষির উপাদান হতে পারে না। ইতিমধ্যে দীর্ঘ সংলাপের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া সমঝোতার বিষয়গুলোকে দর-কষাকষির উপাদানে পরিণত করা আলামত হিসেবেও শুভ নয়। 

অন্যদিকে সমঝোতার বিষয়গুলোকে পাশ কাটাতে সরকার যে বিদ্যমান ‘সংবিধান’–এর দোহাই দিচ্ছে, অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকারকে আবার অসাংবিধানিক পদক্ষেপ নিতেও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি দুদকের চেয়ারম্যান পদে সুপ্রিম কোর্টের এক সাবেক বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা সংবিধানের বিধিনিষেধের স্পষ্ট লঙ্ঘন (প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট ২০২৬)। 

অর্থাৎ রাজনৈতিক সমঝোতা এড়ানোর বাহানা হিসেবে ‘সংবিধান’কে সামনে আনা হলেও প্রয়োজনমতো সেই সংবিধানকেই উপেক্ষা করা হয়। জনগণ যখন দেখে রাজনৈতিক সমঝোতা ও তাদের রায়কে উপেক্ষা করার জন্য বারবার ‘সংবিধান’কে ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন তাদের কাছে খোদ সংবিধানের গুরুত্বই লঘু হতে থাকে। 

এই যে বিষয়গুলো আলাপ করা হলো, তা সনদের ভেতরকার। অর্থাৎ যে বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত ছিল, সেগুলোকে সংলাপের মাধ্যমে একটা ন্যূনতম ঐকমত্যে নিয়ে আসার প্রয়াসের সঙ্গে এটা জড়িত। কিন্তু এর বাইরে আরও কিছু বিষয় নিয়ে নাগরিক সমাজ ও সর্বসাধারণের মধ্যে প্রবল ঐক্য ছিল এবং তারা আশাও করেছিল, সরকার এই বিষয়গুলো মানবে। সেগুলোও মানা হচ্ছে না। যেমন গুম ও মানবাধিকার বিষয়ে মৌলিক প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত রাজনৈতিক শ্রেণির সমঝোতা ভাঙার ইতিহাসও বটে। কোনো বিশেষ ঘটনার পর যখন রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে ওঠে, সেটা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে দুই স্তরে সংকট দেখা দিতে থাকে। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এবং দ্বিতীয়ত, সরকার ও জনগণের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়। এই ছয় মাসে দুটিরই আলামত পাওয়া যাচ্ছে। 

মনে রাখা দরকার, আমাদের রাজনীতিতে আস্থার সংকটই প্রবল। একদিকে কোনো রাজনৈতিক দলই অপরকে ন্যূনতম কোনো বিষয়ে বিশ্বাস করে না। অন্যদিকে জনগণের মধ্যেও প্রবল বিশ্বাস রয়েছে, ক্ষমতায় গিয়ে কেউই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে না। এমন পরিস্থিতিতে সদ্য গড়ে ওঠা কোনো সমঝোতার প্রতি আস্থা তৈরির মূল দায় বর্তায় সরকারি দলের ওপর। 

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই ‘আস্থা’র কোনো লিখিত দলিল বা চুক্তিনামা থাকে না। তবে এটাই যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান শর্ত, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আস্থার সংকটের পরিণতি দেখলে আমরা বুঝতে পারি। সরকার যদি শুরুতেই সমঝোতার রূপরেখা থেকে পিছু হটে, তবে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য বিপদ ডেকে আনবে।

সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক

* মতামত লেখকের নিজস্ব