মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ
ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ মুখোমুখি বৈঠক করেছেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক অভিযানের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে এই পর্যায়ের নেতাদের বৈঠক হলো। এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের আলাপ এই বার্তা দেয় যে কূটনীতি এখন আর কোনো নোংরা শব্দ নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে সংলাপে বসার পথ কিয়েভ যে উন্মুক্ত রেখেছে, তা রাশিয়াকে দেখাতে ইউক্রেনের প্রতি আহ্বান জানানোর অব্যবহিত পরই নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের জি-২০ সম্মেলনের এক ফাঁকে এই দুই নেতা ১০ মিনিটের সংক্ষিপ্ত বৈঠকে মিলিত হন।

তাঁদের এই বৈঠকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে অস্ত্রবিরতির বিষয়ে আশার ঝিলিক দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নানা দিক থেকে আদতে দুটি পরাশক্তি শিবিরের প্রক্সি যুদ্ধ। এর রাশিয়া পক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে চীন এবং ইউক্রেনকে সমর্থন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

এক বছরের বেশি সময় ধরে চলমান এই যুদ্ধে এটি পরিষ্কার হয়েছে যে যুদ্ধে উভয় শিবিরের ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও উভয়েই লড়াই চালিয়ে যেতে সংকল্পবদ্ধ। এ অবস্থায় যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা থেকে বিশ্বকে বেরিয়ে আসতে হলে অস্ত্রবিরতি দরকার। তবে তার জন্য দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। যেমনটা দেখা গিয়েছিল ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা দুই কোরিয়ার যুদ্ধে। সেখানে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে দুই বছর অচলাবস্থা চলছিল।

সম্প্রতি র‍্যান্ডের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ জিইয়ে রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নেই। এ যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও অস্ত্র আরও যেতে থাকবে এবং এতে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করার চীনা সামর্থ্য বাড়বে। এ কারণে দীর্ঘ মেয়াদে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আটকে না থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রবিরতির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত হবে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন স্পষ্টতই বিশ্বাস করেন, দীর্ঘদিন এই যুদ্ধ ঝুলে থাকাটা তার জন্য বেশি লাভজনক; কারণ, সেটি হলে তাঁর সেনাবাহিনী ইউক্রেনে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যেতে পারবে এবং এর মাধ্যমে তিনি পশ্চিমাদের ধৈর্য পরীক্ষা করার মতো সময় পাবেন।

তবে এটিও স্পষ্ট যে রাশিয়া ইউক্রেনে তার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না। রাশিয়া এখন পর্যন্ত হয়তো ইউক্রেনের এক–পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড দখল করেছে, কিন্তু এই দখলদারি প্রতিবেশী দেশ ও ন্যাটোকে ক্ষুব্ধ করেছে। এই প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ফিনল্যান্ডকে ন্যাটো সদস্য করতে রাজি হয়েছে এবং সুইডেনকেও সদস্য করতে রাজি আছে বলে শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের আরোপ করা নজিরবিহীন অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি যে ক্ষতির শিকার হয়েছে, তার জের তাকে বহুদিন টানতে হবে।

আরও পড়ুন

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে চীনের শান্তি প্রস্তাব যে কারণে খারিজ হলো

আবার অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এক বছর আগে বৈশ্বিক বাণিজ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সফট পাওয়ার খাটিয়ে পুতিনের তখতকে ‘গুঁড়া’ করে দেওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সে উদ্দেশ্য পূরণ সহজ হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে তার সেনাবাহিনীর কাছে প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছাতে খুব একটা বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। রাশিয়া যাতে তার জ্বালানি রপ্তানি করতে না পারে, সে জন্য জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, কিন্তু তাতে পশ্চিমের উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না; কারণ, অ-পশ্চিমা বাজারে রাশিয়া সেই তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করা শুরু করে দিয়েছে (যদিও তা বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কমে)।

আরও পড়ুন

ইউক্রেন যুদ্ধ: জেলেনস্কি চীনের কথা শুনতে বাধ্য হতে পারেন

রাশিয়ার সেনাদের নৈতিক মনোবল ভেঙে পড়বে আর তারপর ইউক্রেন রাশিয়াকে দখল করা ভূখণ্ডের সবটা ফেরত দিতে বাধ্য করবে, এমন সম্ভাবনা প্রায় নেই।

যুক্তরাষ্ট্র যদিও ইউক্রেনের অখণ্ডতা বজায় রাখার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিশীল; কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইউক্রেনের হারানো ভূখণ্ডের পুরোটা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা এখন সুদূরপরাহত।

এর মধ্য থেকে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হচ্ছে চীন। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা ফ্রি রাশিয়া ফাউন্ডেশনের প্রকাশ করা একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপ করা অবরোধের ‘সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী’ হিসেবে চীন ইতিমধ্যে তার আখের গুছিয়ে নিয়েছে।

চীন রাশিয়ার তেল ও গ্যাস সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে ইতিমধ্যে মস্কোর ব্যাংকার ও সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হয়ে উঠেছে। এমনকি এ মুহূর্তে যদি চীন তাইওয়ানে অভিযানও চালায়, তাহলেও সেই সরবরাহব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি জড়াবে, চীনের ততই তাইওয়ানে দখলাভিযান চালানোর সম্ভাবনা জোরালো হবে। আর যুক্তরাষ্ট্র ভালো করেই জানে, চীন-রাশিয়ার কৌশলগত গাঁটছড়া কতটা ভূরাজনৈতিক দুঃস্বপ্নের মুখে ফেলে দেবে ওয়াশিংটনকে। যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় সেনাশক্তি, কিন্তু চীন ও রাশিয়ার যুক্ত শক্তি যে তাকে বেকায়দায় ফেলতে পারে, সেটি সে বুঝতে পারে।

এ যুদ্ধ ইতিমধ্যেই পশ্চিমের সামরিক সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে। সামরিক রসদ সরবরাহ করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন অস্ত্র উৎপাদনে বেগ পেতে হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর ঐকমত্য ক্রমে দুর্বল হচ্ছে।

এ অবস্থায় সি চিন পিং তাইওয়ান অভিযানের আগে পশ্চিমা দেশগুলোকে আরও বেশি ইউক্রেন যুদ্ধে জড়াতে উসকানি দিতে পারেন। ইতিমধ্যে চীন রাশিয়াকে নানা ধরনের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি ইউক্রেন যুদ্ধে জড়ালে বেইজিং তাইওয়ান আক্রমণে যেতে পারে।

সম্প্রতি র‍্যান্ডের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ জিইয়ে রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নেই। এ যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ ও অস্ত্র আরও যেতে থাকবে এবং এতে মার্কিন জনগণের অসন্তোষ বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করার চীনা সামর্থ্য বাড়বে। এ কারণে দীর্ঘ মেয়াদে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে আটকে না থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রবিরতির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত হবে।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

  • ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের অধ্যাপক এবং বার্লিনের রবার্ট বোচ একাডেমির একজন ফেলো