‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’—মুখের বুলি হয়েই থাকবে?

নিখোঁজ যাত্রীদের মরদেহ উদ্ধারের পর স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। দৌলতদিয়া ঘাট, রাজবাড়ীছবি: সাজিদ হোসেন

 ‘ডেথ বাই নেচার ইজ আ গ্রিফ, 

বাট ডেথ বাই নেগলেক্ট ইজ আ ক্রাইম’

চেরনোবিল, এইচবিও সিরিজ (২০১৯)

বুধবার রাতে রাজধানীর শ্যামলীর একটি হাসপাতালে একজন রোগীকে দেখে বাসায় ফিরতে চড়ে বসলাম পাবলিক বাসে। রাত প্রায় ১১টা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল তখন। বাস যাত্রীতে ঠাসা। কোনোভাবে দাঁড়ানো গেল।

যাত্রীদের মধ্যে খুব একটা কোলাহল নেই। কয়েকজনের হাতে মোবাইলের দিকে চোখ গেল। সবার মোবাইলের স্ক্রিনে একই ভিডিও। একটা বাস পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটে গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে দু-একজন কথা বলে উঠলেন। একেকজন একেক তথ্য দিচ্ছিলেন। তখন দুজন বলে উঠলেন, তাঁরা সে সময় ঘটনাস্থলেই ছিলেন। কাছাকাছি সময়েই ফেরি করে ঘাট পার হয়েছেন। সেখান থেকেই আসছেন এখন।

প্রত্যক্ষদর্শী দুজনের সঙ্গে কথা হলো। চোখেমুখে বিষাদ লেগে আছে এখনো। নির্মম কিছু মৃত্যুর সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন তাঁরা। আর তাঁদের কথা শুনে কেউ একজন বলে উঠলেন—এ দেশে বাঁচা–মরার কোনো গ্যারান্টি নেই। 

আরও পড়ুন

বুধবার বিকালে (২৫ মার্চ ২০২৬) রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটের পদ্মা নদীতে বাসডুবির এ ঘটনায় পুরো জাতি শোকাহত। পরদিন স্বাধীনতা দিবসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামনে এল মর্গে বাসডুবিতে নিহত যাত্রীদের লাশের ছবি। মর্গের ব্যাগ থেকে এক নারীর হাত বের হয়ে আছে। হাতে মেহেদি, নতুন চুড়ি। আরেকটি ব্যাগ থেকে বেরিয়ে আছে এক নবজাতকের হাত। মায়ের পেট থেকে বের হয়েই যেভাবে মুষ্টিবদ্ধ হাত থাকে শিশুর, সে রকমই। ঠিকমতো দুনিয়া দেখার আগেই মর্গের ব্যাগের ভেতরেই স্থান হলো তার। 

এবারের ঈদযাত্রায় সাত দিনের ছুটিতে প্রায় তিন শ মানুষ নানা দুর্ঘটনায় মারা গেলেন। অনেক যুদ্ধে বা বড় কোনো হামলাতেও এত সংখ্যক মানুষ মারা যায় না। সারা বছরই প্রায় দিন কোনো না কোনো দুর্ঘটনা আমাদের স্তব্ধ করে দেয়। ভবন বা স্থাপনা ধসে, ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে, বিস্ফোরণে; লঞ্চ দুর্ঘটনায়, সড়কে মুখোমুখি সংঘর্ষে—কতভাবেই না লাশের মিছিল দেখতে দেখতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।

শুধু তা–ই নয়, রাস্তায় একটা ইট, রড বা ফুলের টব পড়েও মানুষ মরে যাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সমাজবিজ্ঞানীরা এসব প্রাণহানিকে মৃত্যু বলতে রাজি নন।

একটার পর একটা ঘটনা ঘটতেই থাকে, প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়, বিশেষজ্ঞরা নানা সুপারিশও দেন; এরপরও কেন এসব ঘটনা থামে না। মোটাদাগে একটাই কারণ—কারও কোনো দায় না নেওয়া। রাষ্ট্র ও সরকারের কারও কোনো জবাবদিহি না থাকা।

নরওয়েজীয় সমাজবিজ্ঞানী জোহান গালতুং এসব ঘটনাকে বলছেন স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স বা কাঠামোগত সহিংসতা। তাঁর মতে, যখন কোনো সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের অকালমৃত্যু ঘটে, তখন সেটি কেবল ‘দুর্ঘটনা’ নয়, বরং একটি ‘হত্যাকাণ্ড’। রাশিয়ার পারমাণবিক চুল্লি বিস্ফোরণ নিয়ে নির্মিত সিরিজ চেরনোবিলে এক শোকার্ত মায়ের একটি ডায়ালগ দিয়ে এ জন্যই লেখাটি শুরু করা। 

একটার পর একটা ঘটনা ঘটতেই থাকে, প্রতিটি ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়, বিশেষজ্ঞরা নানা সুপারিশও দেন; এরপরও কেন এসব ঘটনা থামে না। মোটাদাগে একটাই কারণ—কারও কোনো দায় না নেওয়া। রাষ্ট্র ও সরকারের কারও কোনো জবাবদিহি না থাকা।

ফেরির অপেক্ষায় থাকা বাসটি পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে, ২৫ মার্চ ২০২৬
ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির সময় মনে আছে, সে ঘটনার সবচেয়ে বড় ও একমাত্র ঘাতক হিসেবে রানা প্লাজার মালিককে জাতীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। পালিয়ে যাওয়ার সময় বেনাপোল সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করে হেলিকপ্টারে করে উড়িয়ে আনা হয়েছিল। সে দৃশ্য প্রতিটি চ্যানেলে দেখানো হয়েছিল গোটা জাতিকে।

কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় অবৈধভাবে সেই রানা প্লাজা গড়ে উঠল, এর সঙ্গে সরকারি অনেকগুলো কর্তৃপক্ষ এবং এর কতিপয় কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন, তাঁদের কারও কিছু হলো না। কোনো ঘটনার দায় নিয়ে কারও দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া বা পদত্যাগ করা তো দূরের কথা, দুঃখ প্রকাশ করা বা নাগরিকের কাছে ক্ষমা চাওয়ার ঘটনাও এখানে বিরল।

কারও কোনো দায় বা জবাবদিহি না থাকার কারণে সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার বিস্ফোরণে মালিকপক্ষের কাউকে কোনো শাস্তি পেতে হয় না, যে ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের ১৩ জন কর্মীসহ অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছিল। তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মালিক জামিনে বের হয়ে রাজনৈতিক দলের নেতাও হয়ে যান। রূপগঞ্জে হাশেম ফুডসে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ শিশু শ্রমিকসহ অর্ধশতাধিক প্রাণহানি হয়েছিল, মালিকপক্ষের গায়ে আঁচড়ও পড়েনি। সড়কে মৃত্যুর মহামারিতে পরিবহনমালিকের বিরুদ্ধে মামলা হয় না। তাঁদের শাস্তি না হওয়াটাই এখানে নিয়ম!

আরও পড়ুন

দায় বা জবাবদিহির চেয়েও এখানে প্রাধান্য পায় মানবিক গল্প। বাচ্চাকে বাঁচিয়ে মায়ের মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা, মৃত্যুর সময় স্বামী-স্ত্রীর কেউ কাউকে ছেড়ে না যাওয়া, বিয়ের মেহেদি শুকানোর আগেই মৃত্যু, পুরো পরিবারকে হারিয়ে শিশুর এতিম হওয়া—এমন সব মানবিক গল্পে আমরা আবেগতাড়িত হতেই যেন ভালোবাসি।

আমাদের প্রতিবাদের ভাষা বড়জোর এতটুকুই বলা—স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা ও সরকারের দমন-নিপীড়নের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক নির্মল সেন ১৯৭৩ সালে মার্চ মাসে দৈনিক বাংলায় এই শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলেন। সেই লাইন নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ৫৩ বছর ধরে যেকোনো ঘটনায় এখনো লালন করে যাচ্ছে মানুষ। একটা রাষ্ট্রে কতটা অব্যবস্থাপনা, কতটা অরাজকতা তৈরি হলে মানুষ যুগের পর যুগ স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবিতে এমন হাহাকার করে যায়।

২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় এক ফেরিডুবিতে ২৫০ জনের বেশি স্কুলশিক্ষার্থী মারা যায়। আধুনিক বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ এ ফেরি দুর্ঘটনা নিয়ে নির্মিত হয়েছিল অস্কার মনোনীত ডকুমেন্টারি ইন দ্য অ্যাবসেন্স

আরও পড়ুন

এ ডকুমেন্টারি আমাদের দেখায় রাষ্ট্র ও সরকারের ‘অ্যাবসেন্স’ বা অনুপস্থিতি; সেই সঙ্গে সত্য ও জবাবদিহির অনুপস্থিতির কারণে এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা ডেকে নিয়ে আসে। এই বাস্তবতাই প্রতিটি ঘটনায় আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে। আর প্রতি কদমে কদমে আমরা হাজির হচ্ছি আমাদের মৃত্যুর সামনে। এ ছাড়া যেন আমাদের আর কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই।

রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

[email protected]

* মতামত লেখকের নিজস্ব