গণমাধ্যম কমিশন কেন প্রয়োজন

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বাংলাদেশে যত আলোচনা হয়েছে, এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে ততটা হয়নি। অথচ একটি স্বাধীন গণমাধ্যম শুধু আইনি সুরক্ষায় টিকে থাকে না; টিকে থাকে এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর, যা স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।

বাংলাদেশে সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন এ আলোচনাকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তাবের দিকে নিয়ে এসেছে। কমিশনের প্রতিবেদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল একটি স্বাধীন ও স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন গঠন। পাশাপাশি গণমাধ্যমের কর্মী, সম্পাদক, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের আলোচনায়ও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, কেন একটি স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন প্রয়োজন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বর্তমান বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বড় সংকট শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, পেশাগত মান, শ্রম অধিকার, জন–আস্থা ও জবাবদিহিরও সংকট। সমস্যাগুলো আলাদা মনে হলেও বাস্তবে তারা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাই সমাধানও বিচ্ছিন্ন নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক সমাধান হবে সবচেয়ে বেশি কার্যকর।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

বর্তমানে সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যম—প্রতিটির জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রক কাঠামো, অনুমোদন প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ রয়েছে। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের ডিক্লারেশন, এরপর তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন ধাপ এবং সরকারি বিজ্ঞাপনের জন্য পৃথক তালিকাভুক্তি রয়েছে। অনলাইন গণমাধ্যমের নিবন্ধনের জন্য রয়েছে আলাদা প্রক্রিয়া। আবার টেলিভিশনের ক্ষেত্রে ডাক ও টেলিযোগাযোগ, স্বরাষ্ট্র এবং তথ্য মন্ত্রণালয়সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এই খণ্ডিত কাঠামো শুধু দীর্ঘসূত্রতা তৈরি করে না, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও সৃষ্টি করে।

এর ফলে সরকার পরিবর্তনের সময় লাইসেন্স, নিবন্ধন ও অনুমোদন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্কের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নতুন কিছু নয়। এর প্রভাব পড়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত পরিবেশের ওপর। একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন এ ক্ষেত্রে অভিন্ন নীতিমালা ও স্বচ্ছ লাইসেন্সিং কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে পুরো প্রক্রিয়া আরও নিয়মতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য হবে। এতে লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক জটিলতা যেমন কমবে, তেমনি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অধিকার ও দায়িত্বও আরও স্পষ্ট হবে।

গণমাধ্যম কমিশনের কাজ কখনোই সংবাদ সেন্সর করা, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা বা কোন সংবাদ প্রকাশিত হবে তা নির্ধারণ করা নয়। বরং ন্যায়সংগত নীতিমালা, পেশাগত মান, অভিযোগ নিষ্পত্তি, সাংবাদিকদের অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করার মধ্যেই এর ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।

একইভাবে সম্পাদকীয় মান ও পেশাগত নীতিমালার ক্ষেত্রেও একটি সমন্বিত কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে অনেক টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমে সম্পাদকীয় নীতিমালা, নৈতিক মানদণ্ড ও অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির বিষয়গুলো এখনো সুস্পষ্ট নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান ইতিবাচক চর্চা অনুসরণ করলেও তা পুরো খাতজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একটি স্বাধীন কমিশন স্ব-নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে সম্পাদকীয় নীতিমালা, পেশাগত আচরণবিধি ও নৈতিক মানদণ্ডের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে। এতে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।

সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্রের জন্য ওয়েজ বোর্ড থাকলেও টেলিভিশন, অনলাইন ও অন্যান্য গণমাধ্যমে এখনো অভিন্ন ন্যূনতম বেতনকাঠামো নেই। একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেও অনেক সাংবাদিকের বেতন ও সুযোগ-সুবিধায় বড় বৈষম্য দেখা যায়। বিশেষ করে অনেক তরুণ সাংবাদিক অনিশ্চিত চাকরি ও অস্বাভাবিক কম বেতনে কাজ করেন। এমন বাস্তবতায় দক্ষ জনবল দীর্ঘ মেয়াদে পেশায় ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক প্রতিষ্ঠানে মালিকদের ইচ্ছায় চাকরির স্থায়িত্ব ও বেতন নির্ধারিত হয়।

এ কারণে একটি স্বাধীন কমিশন সব ধরনের গণমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করে অভিন্ন ওয়েজ বোর্ড বা ন্যূনতম বেতনকাঠামোর সুপারিশ করতে পারে। এর উদ্দেশ্য সবার জন্য একই বেতন নির্ধারণ নয়; বরং এমন একটি ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা, যার নিচে কোনো প্রতিষ্ঠান না যায়। এতে সাংবাদিকতার পেশাগত মর্যাদা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং দক্ষ জনবল আকর্ষণের পরিবেশ—সবই উপকৃত হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি হলো নাগরিকের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা। কোনো সংবাদে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ হলে বর্তমানে সব ধরনের গণমাধ্যমের জন্য সমানভাবে কার্যকর কোনো প্রতিকারব্যবস্থা নেই। ১৯৭৪ সালের আইনে গঠিত বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল মূলত সংবাদপত্র–সম্পর্কিত অভিযোগ নিষ্পত্তির দায়িত্ব পালন করে।

কিন্তু টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যম একই কাঠামোর আওতায় পড়ে না। ফলে বর্তমান গণমাধ্যম বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যপরিধি ও সক্ষমতা আরও যুগোপযোগী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণের ব্যক্তিস্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদাহানির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রতিকারের জন্য একটি আইনি সুরক্ষা খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

এ ক্ষেত্রে কমিশনের অধীনে একটি স্বাধীন অভিযোগ ও সালিসি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে, অথবা বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিলকে আরও কার্যকর ও বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার উপযোগী করে তোলার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। এতে পাঠক, দর্শক, শ্রোতা ও গণমাধ্যম—সব পক্ষই উপকৃত হবে। ভুল বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ সংশোধনের সুযোগ তৈরি হবে, আদালতের বাইরে দ্রুত প্রতিকার চাওয়ার একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং সংবাদমাধ্যমও নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবে। এতে জন–আস্থা বাড়বে।

একইভাবে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকা সাংবাদিক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কমিশন একটি সমন্বয়কারী ভূমিকা পালন করতে পারে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত অধিকার, হয়রানি থেকে সুরক্ষা এবং কল্যাণমূলক বিষয়গুলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় এলে সামগ্রিক গণমাধ্যম পরিবেশ আরও শক্তিশালী হতে পারে।

বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে এমন স্বাধীন কাঠামো কার্যকর রয়েছে। যুক্তরাজ্যে সম্প্রচার খাতের তদারকিতে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা (অফকম) সরকারের অংশ নয়। আয়ারল্যান্ডের মিডিয়া কমিশনও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জনস্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যেই কাজ করে।

আশার কথা, আমাদের দেশেও এমন একটি স্বাধীন জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে কমিশনের রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

গণমাধ্যম কমিশনের কাজ কখনোই সংবাদ সেন্সর করা, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা বা কোন সংবাদ প্রকাশিত হবে তা নির্ধারণ করা নয়। বরং ন্যায়সংগত নীতিমালা, পেশাগত মান, অভিযোগ নিষ্পত্তি, সাংবাদিকদের অধিকার এবং গণমাধ্যমের স্ব-নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করার মধ্যেই এর ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। স্বাধীনতার বিনিময়ে নিয়ন্ত্রণ নয়; স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই হতে পারে এ ধরনের কমিশনের মূল দর্শন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সামনে এখন দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলোকে কাটিয়ে ওঠার একটি বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এসেছে। নতুন সরকারের অঙ্গীকার অনুযায়ী গণমাধ্যম কমিশন যদি সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ ও আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারে, তাহলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ নয়; বরং দায়িত্বশীলতার ও জবাবদিহির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।

  • জুবায়ের বাবু নির্মাতা, সাংবাদিক ও সম্প্রচারক