হাম: যে রোগ ঠেকানো যেত, সেই রোগেই নিঃস্ব পরিবার

হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুকে কোলে নিয়ে বাবা সাইফুল ইসলাম। গত বুধবার নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেছবি: প্রথম আলো

হামে আক্রান্ত সন্তানকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি আর আইসিইউর জন্য অপেক্ষা করতে করতে মৃত্যুর খবর যখন নিত্যদিনের শিরোনামে পরিণত, তখন সাইফুল ইসলামকে ‘ভাগ্যবান’ই বলতে হয়! হামে আক্রান্ত তাঁর দুই সন্তানই সুস্থ হয়েছে, কিন্তু চিকিৎসার খরচ জোগাতে ইটভাটার এই শ্রমিক এখন শূন্যহস্ত।

৬ জুন প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘দুই সন্তানের হামের চিকিৎসায় এক মাস হাসপাতালে, ইটভাটার শ্রমিক সাইফুল এখন নিঃস্ব’ শিরোনামের খবরটি নাগরিক ব্যস্ততার ভিড়ে হয়তো অনেকেরই চোখ এড়িয়ে গেছে। কড়া ইটের পাঁজা থেকে যে মানুষটি প্রতিদিন নগর-মহানগরের সুউচ্চ অট্টালিকার উপাদান জোগান দেন, তাঁর নিজের মাথার ওপর থেকেই এখন আচ্ছাদন সরে যাওয়ার উপক্রম। সন্তানেরা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে ঠিকই; কিন্তু সেই পরম প্রাপ্তির বিনিময়ে তাঁকে চুকাতে হয়েছে চড়া মূল্য। আকণ্ঠ ডুবে গেছেন ঋণে। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হওয়ায় কাজও করতে পারেননি। দুই বেলা খাবার জোগাড় করতেই এখন হিমশিম।

সাইফুলের জবানিতেই শুনুন তাঁর দুর্দশার কথা, ‘দুই বাইচ্চার পরপর হাম হইসে। এ কারণে এক মাসের বেশি সময় ধরি বলতে গেলে হাসপাতালেই থাইকতে অয়। টেয়া-হইসা আর কুলাইতাম হারিয়ের না। বেশির ভাগ ওষুধও কিনতে হয় বাইরে দোকানেত্তুন। এই লই হরায় ৩০-৪০ হাজার টেয়া খরচ কইচ্চি দুই বাইচ্চার লাই।’

আরও পড়ুন

সাইফুলের এই গল্প কেবল এক হতভাগ্য বাবার নিয়তি নয়; এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর ব্যর্থতার প্রতীক। যে রোগ একটি কার্যকর টিকার মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য, সেই রোগের কারণে ২০২৬ সালেও একটি পরিবারকে কেন এক মাস ধরে হাসপাতালের বারান্দায় দিন-রাত কাটাতে হবে? চিকিৎসার খরচ মেটাতে কেন একজন শ্রমজীবী মানুষকে নিঃস্ব হতে হবে? এই প্রশ্ন আপনার মনে করুণা উদ্রেকের জন্য নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার দিকটি আরেকবার খতিয়ে দেখার জন্য।

প্রশ্ন ওঠে, সাইফুলদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষ যখন সন্তানের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়েন, তখন এর দায় কার? এটি কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং নীতিগত ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফল।

সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ দেশে একটি নিম্নবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য যেকোনো আকস্মিক অসুখ মানেই অর্থনৈতিক বিপর্যয়; দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে যাওয়া। আমরা জিডিপির প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি কিংবা উন্নয়ন প্রকল্পের জৌলুশময় সাফল্যের গল্প শুনি। অথচ একজন শ্রমিককে যদি সন্তানের চিকিৎসার জন্য ধারদেনায় ডুবতে হয়, তবে সেই উন্নয়নের গল্প পরিহাসের মতো শোনায়।

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বহু আগেই দেখিয়েছেন, প্রকৃত উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো বা আয় বৃদ্ধির বিষয় নয়; মানুষের জীবনধারণ ও মর্যাদার সক্ষমতা বৃদ্ধিই এর মূল মানদণ্ড। কোনো রাষ্ট্র কতটা মানবিক, তা তার সবচেয়ে উঁচু ভবন দিয়ে নয়, প্রশস্ত মহাসড়ক দিয়ে নয়; বরং সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটি অসুস্থ হলে কতটা নিশ্চিন্তে তিনি চিকিৎসা পান, তা দিয়ে বিচার করা উচিত।

আরও পড়ুন

বেদনার বিষয় হলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন বিশ্বজুড়ে হাম নির্মূলে জোর দিচ্ছে, তখন আমাদের দেশে শিশুরা এখনো হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। মার্চ মাসে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। এই সংখ্যা শুধু একটি রোগের ভয়াবহতাই নয়, প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে নিয়ে আসে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মূলত টিকাদান কর্মসূচির ‘আউটরিচ গ্যাপ’ বা পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। দেশের প্রতিটি টিকাদান কেন্দ্রে টিকা বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা থাকলেও দুর্গম ও প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক শিশু নিয়মিতভাবে বাদ পড়ে যায়। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজীর আহমদের ভাষায়, পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও প্রচারের ঘাটতি ছিল, একই সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার কার্যক্রমও আগের মতো জোরালোভাবে পরিচালিত হয়নি।

ফলে প্রশ্ন ওঠে, সাইফুলদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষ যখন সন্তানের চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়েন, তখন এর দায় কার? এটি কোনো অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; বরং নীতিগত ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফল।

আজ সময় এসেছে জবাবদিহি দাবি করার। স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের বরাদ্দস্বল্পতা, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে নজরদারির অভাব কেন আমাদের নিয়তি হয়ে থাকবে? মাঠপর্যায়ে জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, তাদের ব্যর্থতার দায় কেন সাইফুলের মতো দিনমজুরকে বহন করতে হবে? প্রতিটি ট্র্যাজেডির পর তদন্ত কমিটি আর আশ্বাসের ফাঁপা বুলির চক্র থেকে বেরিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার সময় এখনই।

সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি তোলা জরুরি। প্রথমত, কোনো শিশুই যেন টিকাদানের আওতার বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের নিশ্চয়তা দিতে হবে। তৃতীয়ত, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে কার্যকর ও আধুনিক করে তুলতে হবে, যাতে সামান্য হামের চিকিৎসার জন্যও মানুষকে শহরমুখী হয়ে সর্বস্বান্ত হতে না হয়।

সন্তানদের সুস্থ করে সাইফুল আজ ঘরে ফিরেছেন। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি হয়তো স্বস্তি অনুভব করবেন। কিন্তু সামনে কীভাবে ঋণের বোঝা সামলাবেন, কীভাবে সংসারের চাকা ঘুরবে—সেই উদ্বেগ তাঁর পিছু ছাড়বে না। সাইফুলের সন্তানেরা বেঁচে গেছে, এ জন্য শোকর গুজার করি। কিন্তু একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে একজন শ্রমজীবী মানুষের সর্বস্ব হারানোর এই বাস্তবতা আমাদের উন্নয়নের গল্পকে যে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়, তার উত্তর রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

  • হাসান ইমাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহ–সম্পাদক

    [email protected]