এত শিশু কেন হামে আক্রান্ত হচ্ছে

হামের সংক্রমণ রোধে শুরু হয়েছে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিছবি: প্রথম আলো

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বিপজ্জনক চেহারা নিয়েছে। ৬ এপ্রিল প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘মোট শিশুর ১৮% বরগুনায়, টিকা কর্মসূচির আয়োজনে ঘাটতি’ শিরোনামে খবর বেরিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৬ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, হাম সন্দেহে সারা দেশে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে সাড়ে আট হাজারের বেশি শিশু। ১ হাজার ৯৯ জনের নিশ্চিত হাম হয়েছে। ১১৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের কারণে।

অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব ও তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে গত দেড় দশকে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। এমন কী ঘটল যে আকস্মিকভাবে এত শিশু হামে আক্রান্ত হতে শুরু করল এবং তা শিশুমৃত্যুর মতো দুঃখজনক পরিস্থিতির দিকে মোড় নিল।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা লক্ষ করেছেন, বেশ কিছুদিন ধরে টিকা কার্যক্রমের গাফিলতির ভয়াবহ পরিণাম হামের এই প্রকট প্রাদুর্ভাব। এই টিকা কেনা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অহেতুক ও অপ্রত্যাশিত জটিলতা তৈরি হয়। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সে সময়ে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁদের দূরদর্শিতা ও সক্রিয়তার অভাবে শিশুদের টিকা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সঠিক সময়ে টিকা মজুত না করায় অসংখ্য শিশু যথাযথ বয়সে প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য এরও আগে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসেই হাম ও রুবেলার শেষ কার্যক্রমটি চলেছিল, যেখানে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার আওতায় আনা হয়। এরপর সেই সরকারকেও আর এ উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। মোটা দাগে হামের এই মারাত্মক প্রকোপের পেছনে বিগত দুই সরকারের অবহেলাকেই দায়ী করতে হয়। তবে জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ হিসেবে খুঁটিয়ে দেখতে গেলে হাম ও রুবেলার টিকার অব্যবস্থা ও অপ্রাপ্যতা ছাড়াও এই পরিস্থিতির পেছনে আরও কিছু বিষয় নজরে না পড়ে উপায় নেই, যা নিয়ে কথা বলা দরকার। চিকিৎসকেরা বলছেন, হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব শিশু এবার হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তার বড় অংশের বয়স ৯ মাসের কম। টিকার সূচি অনুযায়ী ৯ মাসের আগে কোনো শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয় না। এই প্রশ্ন তাহলে উঠতেই পারে, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা হামে আক্রান্ত হলে তার দায়ভার সরকারের ওপরে বর্তায় কী করে?

প্রকৃতপক্ষে এ প্রশ্ন তুলে আগের সরকারকে দায়ভার থেকে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। কেননা যেসব শিশুকে ছয় মাস বয়স থেকে ছয় মাস পর পর ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হয়, তাদের হামে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’র মজুত পর্যাপ্ত থাকলে হাম তাদের সহজে কাবু করতে পারে না। তাদের অন্য কিছু রোগ প্রতিরোধের শক্তিও বেড়ে যায়। কিন্তু ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি থাকলে হামে আক্রান্ত শিশুর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য নানা রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যার পরিণতি মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে। অন্ধত্বেরও ঝুঁকি থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাই শিশুদের ছয় মাস পর পর ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর সুপারিশ করেছে।

আমাদের সামান্য দূরদর্শিতা ও উদ্যোগের অভাব এ রকম বেদনাদায়ক মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। আরও বড় বিপর্যয় এড়ানোর জন্য টিকা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের অপুষ্ট অঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা এখন খুবই বাঞ্ছনীয়।

এবারের হামের প্রকোপের পেছনে সে রকম একটি পরিস্থিতির দায় আছে। আমাদের শিশুরা ২০২৪ সালের জুন মাসের পর থেকে নিয়মিত ছয় মাসের ব্যবধানে ভিটামিন ‘এ’র টিকা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আর পাচ্ছে না। ২০২৪ সালের জুনের পর তারা ভিটামিন ‘এ’ পেয়েছে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে, অর্থাৎ ছয় মাসের বদলে ৯ মাস পর। এরপর আবার এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ মাস এই টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আবার গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রমও শিথিল হয়ে পড়েছে। ফলে শিশুরা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাও পাচ্ছে না। সবমিলিয়ে এসব কারণে হাম এবার এতটা তীব্র চেহারা নিয়েছে।

এসবের বাইরে আরও একটি কারণও চোখে পড়ল। দেখা যাচ্ছে, যেসব হাসপাতালে হামের রোগীর সংখ্যা বেশি, দেশের সেসব অঞ্চল পুষ্টির নিরিখেও পিছিয়ে আছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখতে পাচ্ছি, হামের কারণে মৃত্যু হওয়া ১৭টি শিশুর ৫ জনই বরিশাল বিভাগের। ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে থেকে জানতে পারছি, পুষ্টির সূচক বিচারে বরিশাল বিভাগে অপুষ্টির মাত্রা দেশের গড় অপুষ্টির তুলনায় অনেক বেশি। হামের ভয়াবহতার পেছনে অপুষ্টিও বড় একটি কারণ।

আরও পড়ুন

সম্প্রসারিত টিকা কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে অনন্য এক নজির স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। অতীতে সব রাজনৈতিক সরকারই টিকা কার্যক্রমকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষও টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে সাড়া দিয়ে এসেছে অসম্ভব উৎসাহের সঙ্গে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এত দিনের সফল এই কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। বেসরকারি ও উন্নয়ন সহযোগীদের উপর্যুপরি তাগাদাকে তারা কিছুমাত্র আমলে নেয়নি। এরই নিদারুণ খেসারত এখন দিতে হচ্ছে আমাদের অসহায় শিশুদের।

আমাদের সামান্য দূরদর্শিতা ও উদ্যোগের অভাব এ রকম বেদনাদায়ক মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। আরও বড় বিপর্যয় এড়ানোর জন্য টিকা কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের অপুষ্ট অঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা এখন খুবই বাঞ্ছনীয়। তবে মূল বিষয় শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক পুষ্টি-পরিস্থিতির উন্নয়ন। এর জন্য সরকারসহ সংশ্লিষ্ট নানা পক্ষের একটি জরুরি জগরণী বার্তা নিতে হবে।

  • আসফিয়া আজিম জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ

    মতামত লেখকের নিজস্ব