সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের একটি স্ট্যাটাস এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। নেটিজেনরা তো বটেই, এতে জড়িয়ে পড়েছেন মূল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের দুই প্রধানও।
আমিরের অ্যাকাউন্ট সত্যিই হ্যাকড হয়েছিল কি না, সেই বিতর্ক সরিয়ে রেখে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়, সেই স্ট্যাটাসের অতি আপত্তিকর শব্দটি ছাড়া অন্যান্য বক্তব্য জামায়াত আমিরের আল-জাজিরার কাছে দেওয়া বক্তব্যের চেয়ে মোটেও খুব ভিন্ন কিছু নয়।
আল-জাজিরার সঙ্গে জামায়াতে কোনো নারী আমির হতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির যা বলেন, ‘এটা সম্ভব নয়। এটা সম্ভব নয় কারণ, আল্লাহ উভয়কে তাঁদের নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। কারণ, আপনি কখনো একজন সন্তান ধারণ করতে পারবেন না। আমরা কখনো শিশুকে স্তন্য পান করাতে পারব না। এটা সৃষ্টিকর্তার দান। নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। আল্লাহ যেভাবে তৈরি করেছেন, আমরা সেটা পাল্টাতে পারি না।’
উপস্থাপক তাঁকে সম্পূরক প্রশ্ন করেন, ‘সব নারী তো মা হতে না–ও চাইতে পারেন, আবার মা হলে কেনই–বা একজন নারী জামায়াতের আমির হতে পারবেন না?’
আমির বলেন, ‘কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তাঁদের সীমাবদ্ধতা থাকবে। আমরা এটা অস্বীকার করতে পারব না। একজন মা যখন শিশুর জন্ম দেবেন, তখন তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন? এটা সম্ভব? আল্লাহ সবকিছু সবচেয়ে ভালোভাবে জানেন।’
জামায়াত আমিরের বক্তব্য শুনে অনেক প্রশ্ন মাথাচাড়া দেয়। যখন জামায়াতের নেতারা একজন নারী প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের অধীনে মন্ত্রিত্ব করেছিলেন, সেটা কীভাবে বৈধ ছিল? দলটির গঠনতন্ত্রে আমির হওয়ার যোগ্যতার অনুচ্ছেদের প্রথম ধারায় কেন লিখে দেওয়া হয়নি, আমিরকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে? কেন এই
শর্ত ‘গুপ্ত’ হিসেবে থেকে গেল? ক্ষমতায় গেলে মুখে বলছেন না কিংবা গঠনতন্ত্রে লেখা নেই, এমন আর কী কী করবেন তাঁরা?
কিছুদিন আগে তরুণদের এক সভায় জামায়াতের আমির বাইরে কাজ করা নারীদের প্রতি তীব্র বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছেন। সেই সভায় তিনি তরুণদের কাছে প্রথমে জানতে চান, সেখানে কতজন অবিবাহিত আছেন। এরপর তাঁদের বিয়ের ব্যাপারে পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে নিয়ত করো, ঘরে রানি তুলে আনবা, কামলা তুলে আনবা না। যাকে আনবা, তাকে রানির মর্যাদা দিবা, গোলাপের মর্যাদা দিবা।’
নারী প্রশ্নে জামায়াত এর আগে থেকেই সমালোচিত হচ্ছিল এই নির্বাচনে একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন না দেওয়া নিয়ে। কেন অন্তত একজন নারীকেও মনোনয়ন দেওয়া হলো না, এমন প্রশ্নের জবাবে আল-জাজিরাকে জামায়াত আমির জানান, তাঁরা প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অথচ আমরা তাঁদের মুখেই প্রতিনিয়ত শুনি, তাঁদের দলের ৪০ শতাংশই নারী। জামায়াতের নারী শাখার সদস্যরা কয়েক দশক ধরেই বাড়ি বাড়ি দাওয়াতের কাজ করেন, এই অভিজ্ঞতা আছে এ দেশের প্রায় সবার। শুধু সেটা নয়, এই নির্বাচনেও জামায়াতের নারী কর্মীদের মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্বাচনী প্রচারের কথা সবাই জানেন। এমনকি অনেকেই এটা মনে করেন, এই নির্বাচনে তাঁদের এমন কাজের ভালো ফল পাবে জামায়াত।
তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে, জামায়াত কেন মনে করছে, তাঁরা নির্বাচন করতে পারবেন না? এর পেছনের কারণ বোঝা যাবে জামায়াতের আমিরের সাম্প্রতিক নানা বক্তব্য থেকে।
জামায়াতে ইসলামী এবার আরেকটি ‘চমক’ দেখিয়েছে এই নির্বাচনে একজন সনাতন ধর্মের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে, যিনি নিজেকে ‘আল্লাহর দূত’ হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন বলে বলছেন। অথচ জামায়াতের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীদের জামায়াতের সদস্য (রুকন) হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। একজন অমুসলিম মানুষ হতে পারেন সহযোগী সদস্য।
কিন্তু আমরা জেনে রাখব, জামায়াতের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা একচ্ছত্রভাবে রুকনদের; সহযোগী সদস্যরা মূলত আমাদের ছোটবেলার খেলায় ‘দুধভাত’–এর মতো। বলা বাহুল্য, একজন অমুসলিম যখন জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোয় ‘দুধভাত’, তাঁর পক্ষে জামায়াতের আমির হওয়ার কথা তোলা স্রেফ অবান্তর। এমন কোনো অবস্থান কি বাংলাদেশের সাংবিধানিক চৌহদ্দি মেনে ক্রিয়াশীল কোনো রাজনৈতিক দল নিতে পারে?
নারীদের প্রতি নেতিবাচক মানসিকতার প্রমাণ জামায়াতের আমির তাঁর সাম্প্রতিক অনেক বক্তব্যেই রেখেছেন। নারীর কাজের ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা ৫ ঘণ্টা করার ঘোষণা দেওয়া এবং এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য কার্যত নারীকে ঘরে বেঁধে রাখার মানসিকতা প্রমাণ করে। এ প্রসঙ্গে তিনি এক সভায় বলেন, ‘৫ ঘণ্টার পারিশ্রমিক মালিকপক্ষ পরিশোধ করবেন এবং ৩ ঘণ্টার পারিশ্রমিক সরকার পরিশোধ করবে। যাঁরা ঘরের কাজ করবেন, তাঁদের রত্নগর্ভা মা হিসেবে সম্মানিত করা হবে। নারীরা আট ঘণ্টা কাজ করতে চাইলে তাঁদের সম্মানিত করা হবে।’
কিছুদিন আগে তরুণদের এক সভায় জামায়াতের আমির বাইরে কাজ করা নারীদের প্রতি তীব্র বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেছেন। সেই সভায় তিনি তরুণদের কাছে প্রথমে জানতে চান, সেখানে কতজন অবিবাহিত আছেন। এরপর তাঁদের বিয়ের ব্যাপারে পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে নিয়ত করো, ঘরে রানি তুলে আনবা, কামলা তুলে আনবা না। যাকে আনবা, তাকে রানির মর্যাদা দিবা, গোলাপের মর্যাদা দিবা।’ (https://youtube.com/shorts/Tj58qgC1j9s?si=dDfoZPvlGA4-8PPz)
নারীকে কীভাবে পরিবারে, সমাজে বা কর্মক্ষেত্রে স্থান দেওয়া হবে, সেটা নিয়ে কারও ব্যক্তিগত অভিমত থাকতেই পারে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের ক্রিয়াশীল কোনো রাজনৈতিক দল তার গঠনতন্ত্রে এমন কিছু কি রাখতে পারে, যেটা সংবিধান পরিপন্থী?
মজার ব্যাপার, জামায়াতের নারীরা এমন অবস্থান মেনে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। জামায়াতের নারী বিভাগের সেক্রেটারি জেনারেল নুরুন্নিসা সিদ্দিকা নারী নেতৃত্বের প্রসঙ্গে বলেন, ‘মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, পুরুষ হচ্ছে নারীর পরিচালক। আমরা এটা মেনে নিয়েই ইমান এনেছি। সুতরাং শীর্ষ পদে নারী নেতৃত্বে আসা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো নারীর অধিকার আদায় হচ্ছে কি না।’
আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং সংবিধানের প্রস্তাবনায় থাকা ‘মানবিক মর্যাদা’ এবং সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ কোনোভাবেই কোনো রাজনৈতিক দলকে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, আর্থসামাজিক অবস্থা—কোনো কিছুর ভিত্তিতে বৈষম্য করা অনুমোদন করে না। কিন্তু আমরা স্পষ্টভাবেই দেখতে পাচ্ছি, জামায়াতে ইসলামী তার গঠনতন্ত্র এবং আচরণে মুসলিম নারী এবং সব অমুসলিমের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। জামায়াতের দৃষ্টিতে তাঁরা কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিকশিত হতে দেখতে চাওয়া নাগরিকদের এই প্রশ্ন জারি রাখতেই হবে, জামায়াতের মতো একটি রাজনৈতিক দলের বাংলাদেশের বিদ্যমান সাংবিধানিক এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত এবং ক্রিয়াশীল থাকার অধিকার আছে? আর এসব মৌলিক প্রশ্নের সুরাহা হওয়ার আগে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার কথা বিবেচনা করা উচিত।
জাহেদ উর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
