তরুণ ভোটার, ধর্ম এবং নির্বাচনের ভবিষ্যৎ

তরুণেরা অসন্তোষ প্রকাশ করতে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকেছেন। কিছু তরুণ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন; কিন্তু তাঁরা গণতন্ত্র বাদ দিয়ে ধর্মতন্ত্র চান—এমনটা নয়; বরং তাঁরা একই পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা আর দেখতে চান না। অন্যভাবে বললে, বিষয়টি শুধু মতাদর্শিক নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। লিখেছেন মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার

বহু বছরের রাজনৈতিক বিভাজন, ক্ষোভ ও বড় পরিবর্তনের সময় পার করে দেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এ সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হলো তরুণ ভোটাররা। দেশের বড় অংশের মানুষই ৩৫ বছরের নিচে। তাঁদের আশা, হতাশা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত শুধু এই নির্বাচন নয়, আগামী ১০ বছরে দেশ কোন দিকে যাবে, সেটিও ঠিক করবে।

এখন দেশে-বিদেশে অনেকে আলোচনা করছেন, বাংলাদেশের তরুণেরা কি আগের চেয়ে বেশি ধর্মমুখী হয়ে উঠছে? যদি হয়ে থাকে, তাহলে এর অর্থ কী? এটি কি রাজনৈতিক ইসলামের দিকে বড় কোনো পরিবর্তন, নাকি এটি বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিবাদ? বিষয়টি শিরোনামে যত সহজ মনে হয়, আসলে ততটা সহজ নয়।

২.

বাংলাদেশের তরুণেরা এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাঁদের সামনে তুলে ধরছে বিশ্বায়ন, ডিজিটাল সংস্কৃতি, পশ্চিমা জীবনধারা এবং বিশ্বের নানা রাজনৈতিক ঘটনা। কিন্তু একই সময়ে তাঁরা পারিবারিক ঐতিহ্য, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

এই দুই বাস্তবতার মধ্যে অনেক সময় ‘পরিচয়ের’ একটি টানাপোড়েন তৈরি হয়। তাই অনেক তরুণ ধর্মের দিকে ঝোঁকে রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে নয়, বরং নৈতিক দিকনির্দেশনা ও মানসিক শান্তি পাওয়ার জন্য। দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে ধর্ম তাদের কাছে স্থিরতা ও অর্থময়তার অনুভূতি দেয়।

এটি বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে ধর্মীয় জীবনযাপন বেছে নেওয়া মানেই গণতন্ত্রে অবিশ্বাস করা নয়। অনেক তরুণী, যাঁরা হিজাব পরেন বা ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণে অভ্যস্ত; তাঁরাই সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন, অফিস-আদালতে কাজ করছেন এবং সমাজে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। তাই এটিকে উগ্রপন্থার দিকে ঝোঁক বলা ঠিক নয়। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই এটি ব্যক্তিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পুনর্নিশ্চিতকরণ।

৩.

বাংলাদেশের অনেক তরুণ প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলিত রাজনীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট। বহু বছর ধরে তাঁরা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্বল জবাবদিহির কথা শুনে আসছেন। এসব কারণে তাঁদের মধ্যে হয়তোবা পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি আস্থা কিছুটা কমে গেছে।

তরুণ ভোটাররা সাধারণত কয়েকটি বিষয় নিয়ে চিন্তিত। যেমন রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র বা একই পরিবারগুলোর প্রভাব, নতুন নেতৃত্বের সুযোগের অভাব, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং চাকরি ও সুশাসনের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ।

 এই পরিস্থিতিতে কিছু তরুণ এমন রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে ঝুঁকছেন, যাঁরা নিজেদের নৈতিক ও সৎ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেন। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই সততা, ন্যায়বিচার ও নৈতিক শাসনের কথা বলে।

দুর্নীতি দেখতে দেখতে ক্লান্ত তরুণদের কাছে এই ভাষা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কারণ, তাঁরা জনজীবনে সততা দেখতে চান।

আরও পড়ুন

৪.

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতি বাড়তি সমর্থন কি বড় কোনো আদর্শগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত, নাকি এটি নিছকই একটি প্রতিবাদ?

বিশ্বের অনেক দেশে তরুণেরা অসন্তোষ প্রকাশ করতে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকেছেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক তরুণ তথাকথিত ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন। বেশির ভাগ সময় তাঁরা প্রার্থীদের সব মতের সঙ্গে একমত ছিলেন না; বরং তাঁরা প্রচলিত রাজনীতিতে হতাশ ছিলেন।

বাংলাদেশেও হয়তো তেমন কিছু ঘটছে। কিছু তরুণ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন; কিন্তু তাঁরা গণতন্ত্র বাদ দিয়ে ধর্মতন্ত্র চান—এমনটা নয়; বরং তাঁরা একই পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা আর দেখতে চান না। অন্যভাবে বললে, বিষয়টি শুধু মতাদর্শিক নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।

আত্মপরিচয় ও ধর্ম নিয়ে জন-আলোচনা বাড়লেও বেশির ভাগ তরুণের প্রধান চিন্তা এখনো অর্থনৈতিক। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে চাকরির সুযোগ, বাড়তি মূল্যস্ফীতি, ভালো শিক্ষার সুযোগ এবং সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা—এসব বিষয় আদর্শগত বিতর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৫.

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এখন অনেক গভীর। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় তথ্যের বড় অংশই অনলাইন থেকে পায় বা সংগ্রহ করে। ইউটিউবের বক্তা, ফেসবুকের আলোচনা, টিকটক ইনফ্লুয়েন্সার এবং আন্তর্জাতিক খবর—সব মিলিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা গড়ে উঠছে, যা প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

ডিজিটাল মাধ্যম মুসলিম বিশ্ব নিয়ে নানা গল্প, অন্যায়ের অনুভূতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের আলোচনা আরও জোরালো করে তোলে। বাংলাদেশি তরুণেরা ফিলিস্তিনের মতো আন্তর্জাতিক ইস্যু থেকে শুরু করে ইসলামোফোবিয়ার মতো বড় বৈশ্বিক আলোচনাতেও আগ্রহ দেখান।

এটি শুধু বাংলাদেশে নয়; গত ১০ বছরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মানুষ অনলাইনে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে বেশি যুক্ত হয়েছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে একধরনের ‘নেটওয়ার্কভিত্তিক ধর্মীয় আবহ’, যেখানে মানুষের পরিচয় গড়ে ওঠে অনলাইন ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মিলনে।

তবে অনলাইনে ধর্মীয় আগ্রহ বাড়লেই যে তাঁরা চরমপন্থা, সহিংসতা কিংবা গণতন্ত্রবিরোধী পথে যাবেন—এমন নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ তরুণ এখনো ভোটাধিকার ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।

৬.

আত্মপরিচয় ও ধর্ম নিয়ে জন-আলোচনা বাড়লেও বেশির ভাগ তরুণের প্রধান চিন্তা এখনো অর্থনৈতিক। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে চাকরির সুযোগ, বাড়তি মূল্যস্ফীতি, ভালো শিক্ষার সুযোগ এবং সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা—এসব বিষয় আদর্শগত বিতর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অনেক তরুণ অল্পসংখ্যক সরকারি–বেসরকারি চাকরির জন্য কঠিন প্রতিযোগিতায় নামছেন। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা বিশ্বের জীবনধারা ও সুযোগগুলো দেখছেন। ফলে তাঁদের প্রত্যাশাও বাড়ছে। এ কারণে বিদেশে যাওয়া বা অভিবাসন অনেকের কাছে আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার একমাত্র পথ বলে মনে হচ্ছে।

এরকম পরিস্থিতিতে যে রাজনৈতিক দল বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক সমাধান দিতে পারবে (যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার), তরুণদের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন তারাই পাবে। শুধু ধর্মীয় বক্তব্য দিয়ে দুর্বল অর্থনৈতিক বাস্তবতা ঢেকে রাখা যায় না।

আরও পড়ুন

৭.

এবারের নির্বাচনে কয়েকটি সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে:

প্রথমত, পুরোনো বড় দলগুলোর মধ্যে যে কেউ আবার ক্ষমতায় আসতে পারে। কারণ, তাদের শক্তিশালী সংগঠন, দীর্ঘদিনের নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক কাঠামো রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিভাজন তৈরি হলে নতুন জোট বা নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হতে পারে, যেমন ছাত্র–ছাত্রীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া নতুন প্রজন্মের দল।

তৃতীয়ত, যদি নৈতিকতা ও দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তাহলে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো বেশি ভোট পেতে পারে।

তবে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস বলছে, ভোটাররা শেষ পর্যন্ত স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। আবেগের ঢেউ সাময়িকভাবে প্রচারকে প্রভাবিত করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকে সেই শক্তি, যারা সুশাসন দিতে পারে।

৮.

বিদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিকে শুধু ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আর ‘ইসলামপন্থী’ এই দুই ভাগে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যাবে না। বাংলাদেশ একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেখানে ধর্ম সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে এখানে নাগরিক অংশগ্রহণ ও নির্বাচনেরও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

তরুণদের মধ্যে ধর্মীয় চিন্তাভাবনা–অভিব্যক্তির প্রকাশ বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিকে বৃহত্তর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার। এটি অনেক সময় আত্মপরিচয় খোঁজার প্রক্রিয়া, নৈতিক মান নিয়ে উদ্বেগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতি হতাশার প্রকাশ।

এর মানে এই নয় যে এই তরুণেরা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তবে অতিরিক্ত আত্মতুষ্টিও ঠিক নয়। যেকোনো রাজনৈতিক শক্তি—ধর্মভিত্তিক হোক বা ধর্মনিরপেক্ষ—তাদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা বহুত্ববাদ, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনে বিশ্বাস করে।

৯.

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা এই নয় যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বাড়বে নাকি বাড়বে না। আসল প্রশ্ন হলো, দেশের তরুণেরা কি আরও ন্যায়ভিত্তিক, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে?

যদি ধর্মপ্রাণ রাজনীতিবিদেরা গণতান্ত্রিক নিয়ম মানেন, বৈচিত্র্যকে সম্মান করেন এবং সুশাসন নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন, তাহলে তাঁরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বৈধ অংশীদার হিসেবেই অংশগ্রহণ করবেন এবং টিকে থাকবেন। কিন্তু যদি তাঁরা নৈতিকতার নামে কর্তৃত্ববাদী পথে হাঁটেন, তাহলে সামাজিক বিভাজন বাড়তে পারে।

একইভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক নেতাদেরও নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করতে হবে। তরুণদের ধর্মীয় অনুভূতিকে উপেক্ষা করে, আবার একই সঙ্গে দুর্নীতি, বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাকে অগ্রাহ্য করলে শাসকগোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের দূরত্ব আরও বাড়বে।

১০.

এবারের নির্বাচন শুধু নতুন সরকার নির্বাচন করবে না; এটি দেখাবে নতুন প্রজন্ম দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও জাতীয় পরিচয়কে কীভাবে দেখে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোনো দল বা রাজনৈতিক নামের ওপর নির্ভর করবে না, বরং যারা নেতৃত্বে থাকবে, তারা যে মতেরই হোক না কেন—তারা তরুণদের চাহিদা, স্বপ্ন আর প্রয়োজন কতটা পূরণ করতে পারে, সেটাই হবে আসল বিষয়।

  • মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব