কামাল হোসেনের ‘স্ট্যাটাস’-এর সঙ্গে সংগতি রেখে ছেলে-মেয়েরা অবশ্য পড়ছে সরকারি বিদ্যালয়ে, ‘মিডিয়াম’ বা ‘ভার্সন’ওয়ালা বিদ্যালয়ে নয়। শিক্ষকেরা বিশেষ সদয়। তাঁরা জানেন, স্বল্প আয়ের এই মানুষটির পক্ষে চার-চারটি সন্তানের পড়ালেখার সব খরচ জোগানো প্রায় অসম্ভব। তাই বেতন, পরীক্ষা ফি ইত্যাদিতে ছাড় দেন। এরপরও বই-খাতা-কলমসহ পোশাক ইত্যাদির খরচ সামাল দিতে ‘জান কয়লা’। বললেন বটে ‘জান কয়লা’, তবে কামাল হোসেনের মুখ থেকে হাসি এতটুকু উবে গেল না।

এই হাসতে পারার ক্ষমতা কি তাঁদের জীবনযুদ্ধের জ্বালানি? প্রশ্নটা নিছক তোলা নয়, এর একাধিক ‘কারণ’-এর হদিস পাওয়া গেল কামাল হোসেনের ‘পথের পাঁচালি’তে। যেভাবে পথে পথে ঘুরে গোটা জীবনটাই কাটিয়ে দিচ্ছেন তিনি, তা তো পথেরই গল্প। কিন্তু এ গল্পের যেন ‘শেষ’ নেই; কেননা, পথে নামা আছে, যাত্রাও আছে, কিন্তু কোথাও যেন পৌঁছানো হয় না! তবে কি এটা ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’? হয়তোবা!

অন্তত ৪৫ বছর ঢাকায় থাকেন কামাল হোসেন। ‘অন্তত’ বলা এ কারণে যে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার রাজাপুর গ্রাম থেকে এ মহানগরে আসার সঠিক সাল-তারিখ বলতে পারেন না। দেশ স্বাধীন হওয়ার দুই-তিন বছর পর ঢাকায় আসেন। শুরুর দিকে ঝুড়িতে আচার নিয়ে মাথায় করে এদিক-সেদিক ঘুরে বিক্রি করতেন। বছর কুড়ি হলো দুই চাকার ছোট একটা ঠেলাগাড়ি করেছেন। সেই গাড়িতে পণ্য সাজিয়ে রোজ সকালে বেরিয়ে পড়েন। সারা দিন বিক্রিবাটা শেষে ঘরে ফেরেন রাত সাড়ে ১০টা-১১টা নাগাদ।

দেশের প্রথম সরকারের আমল থেকে উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটন্ত এই সময়ে এসেও কামাল হোসেনের প্রাত্যহিক রুটিনের একচুল এদিক-সেদিক হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আয় কিছুটা করে বেড়েছে বটে, কিন্তু এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাওয়া জিনিসপত্রের দামের সঙ্গে তা মোটামুটি গলায়-গলায় সমানই থেকেছে। ফলে দুই পয়সা জমানোর সামর্থ্য হয়নি, এক ছটাক জমি করা হয়নি। স্বাদ-আহ্লাদ পূরণ তো দূরের কথা, দুটো দিন বসে খাওয়ার ‘কপাল’ও হয়নি।

কামাল হোসেন যা বললেন, তা আরও খারাপ পরিস্থিতিই নির্দেশ করে। আচার তৈরির অন্যতম উপাদান বিটলবণ ৫৫-৬০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ১২০ টাকা কেজি। এক কেজির চিনির দাম অন্তত ৯০ টাকা। ৫০০ টাকা কেজি শুকনা মরিচের দাম। ফলে আয় আরও কমছে, যদিও খাদ্য-খাওয়া থেকে ব্যবহার্য—সব জিনিসের দাম বাড়তি।

কামাল হোসেন যেভাবে আচার বেচে কোনোমতে টিকে আছেন, তার ‘গালভরা’ নাম অনানুষ্ঠানিক খাত। যেখানে শ্রমিকের মানসম্মত মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি, বিশ্রাম, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, কল্যাণ কার্যক্রম—এসবের বালাই নেই। অবস্থা এমন যে মহান মে দিবসেও কাজ না করলে পরদিন উপোস থাকতে হয়! অর্থাৎ কাজ করলে দুই গাল ভাত খাওয়া, না করলেই নাই।

মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার দৌড়ে বাংলাদেশ, মাথাপিছু আয় আড়াই হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। তবে এ সময়েও দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৯০ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাত। এ হিসেবে কামাল হোসেন সংখ্যাগরিষ্ঠের দলে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা জানতে চাইলে উত্তর দিলেন, ‘হুনছি হয়তো… আমাগো কি এসব ভাবার সময় আছে!’ মুখে হাসিটা আগের মতোই ছড়ানো রইল। ‘আম্লীগ সরকার ক্ষমতায় হেইডা জানি’ বলে পরিস্থিতি একটু সামাল দিতে চাইলেন বুঝি! ভোট দেন? ‘আগে তো দিছি…তয় অ্যাহন আর ভোট দেওন লাগে না!’ আবারও হাসি।

এক কামরার জন্য ভাড়া দেন সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। ছেলে-মেয়েরা খাটে ঘুমান, তাঁরা বুড়ো–বুড়ি মেঝেতে রাত পার করে দেন। ঘরে টিভি নেই। কখনো পত্রপত্রিকায় চোখ বুলানো হয় না। চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়ার ফুরসত নেই। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথা জানতে চাইলে উত্তর দিলেন, ‘হুনছি হয়তো… আমাগো কি এসব ভাবার সময় আছে!’ মুখে হাসিটা আগের মতোই ছড়ানো রইল। ‘আম্লীগ সরকার ক্ষমতায় হেইডা জানি’ বলে পরিস্থিতি একটু সামাল দিতে চাইলেন বুঝি! ভোট দেন? ‘আগে তো দিছি…তয় অ্যাহন আর ভোট দেওন লাগে না!’ আবারও হাসি।

কামাল হোসেন বলছিলেন, বয়সের কারণে এখন খুব বেশি দূরে যান না। রাজধানীর হাজারীবাগের সোনাতন গড় এলাকায় ভাড়া থাকেন সপরিবার। তাঁর ঘোরাঘুরি মূলত ওই এলাকায় ‘সীমিত’। তাঁর জীবনও যে ‘সীমিত’, কামাল হোসেনের হাসিমাখা মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই!

  • হাসান ইমাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
    [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন