গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ভোটাধিকার, আইনের শাসন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি এতই সর্বজনীন যে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে এর সংজ্ঞা উল্টে যায় না। যাঁরা নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা দাঁড় করান, তাঁরা ‘হাওয়া’ ছবির গানের মতো ‘সাদা সাদা কালা কালা’কে বারবার সামনে আনেন। ওই গানেও না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস আছে।
আমাদের মনে হয়, সংবাদপত্র ও বেসরকারি টেলিভিশনে মানুষ এত বেশি অর্জনের কথা দেখেছে এবং শুনেছে যে তাতেই বরং সাম্প্রতিককালে বড় ধাক্কা খেয়েছে তারা। সেটি রিজার্ভ কমা হোক কিংবা জ্বালানিসংকটে বা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে।

ওবায়দুল কাদের যেদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাঁর দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করছিলেন, সেদিনই মন্ত্রিসভার আরেক সদস্য পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক এক সেমিনারে বলেছেন, ‘দুর্নীতি দেশের উন্নয়নকে ম্লান করে দিচ্ছে।’ তাঁর ভাষায়, ‘আমার সামনে একজন দুর্নীতি করে বেশি সুবিধা নেবে, রাস্তার কাজ অর্ধেক করে টাকা নিয়ে যাবে, দুর্নীতির কারণে আমি আমার প্রাপ্য পাচ্ছি না——এসব বিষয় কেন সংসদে সোচ্চার কণ্ঠে শুনতে পাই না, তা বুঝতে পারি না।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি মন্ত্রী, তবু সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে সংবাদ শুনতে চাই, কীভাবে দুর্নীতি কমানো যায়। উন্নয়ন খুবই উপাদেয়, যদি সেটাকে দুর্নীতিমুক্ত করা যায়।...নির্বাচিত হয়েও অনেকে ভাগ-বাঁটোয়ারার সঙ্গে জড়িত, এটা অস্বীকার করা যাবে না। সুন্দর ও মানসম্মত জীবনের জন্য দুর্নীতিমুক্ত দেশ প্রয়োজন।’

প্রতিমন্ত্রী যাঁদের সম্পর্কে এসব মন্তব্য করেছেন, তাঁরা তো বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ক্ষমতাসীন দলের সদস্য। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা সোজাসাপটা কথা বলে পার পেয়ে যান। কিন্তু সাংবাদিকেরা বললেই, লিখলেই তাঁদের গায়ে নানা তকমা লাগানো হয়। তথ্যপ্রমাণসহ ক্ষমতাধরদের দুর্নীতি-অনিয়মের খবর প্রকাশের কারণে অনেক সাংবাদিককে নিগৃহীত হতে হয়, সংবাদমাধ্যমে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন একটি আইন, যাতে কারও বিরুদ্ধে মামলা ঠুকলেই চৌদ্দ শিকের ভেতর যেতে হবে।

দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা আছে। সরকার তার মতো করে সমাধানের চেষ্টাও করছে। সরকারের নীতিকৌশলের সঙ্গে কেউ দ্বিমত করতে পারেন, কিন্তু সরকার নিষ্ক্রিয়, এ কথা কেউ বলছেন না। কিন্তু সমস্যা হলো  আগামী নির্বাচন নিয়ে যে রাজনৈতিক সংকট আছে, সেটি সরকার স্বীকার করছে না।

ওবায়দুল কাদের আরও বলেছেন, ‘আমাদেরও ভুল আছে। তারপরও আমরা দেশের জন্য কাজ করছি।’ তাঁর এই কথার সঙ্গে কেউ দ্বিমত করবেন না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। বাজেটের অঙ্ক সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই সরকারের আমলে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। সরকারের এই অর্জন তো কেউ অস্বীকার করছে না।

কিন্তু এই উন্নয়নের সুযোগে যে একশ্রেণির মানুষ আঙুল ফুলে বটগাছ হয়েছেন, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন, সেসবও তো মিথ্যা নয়। এগুলো বলতে গেলেই সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতারা বেজার হন। তাঁরা কথায়-কথায় বিএনপি আমলের দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসের উদাহরণ দেন। বিএনপির আমলে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার হয়েছে বলে আওয়ামী লীগ আমলেও সেটি জায়েজ হয়ে যায় না। বিএনপির আমলে কত টাকার দুর্নীতি হয়েছে, কত টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে আর আওয়ামী লীগ আমলে কত টাকার দুর্নীতি ও পাচার হয়েছে, সেই তুলনাই করছে মানুষ।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে একটানা প্রায় চৌদ্দ বছর। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সালে দিনবদলের সরকার গঠন করে তারা। আজ ১৪ বছর পর আওয়ামী লীগ নেতারা কি হলফ করে বলতে পারবেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দিন বদল হয়েছে? হয়নি। দিনবদল হয়েছে কতিপয়ের। এমনকি দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে ঝগড়া–বিবাদ, মারামারি, কাটাকাটি, তার পেছনেও আছে পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব। এত বড় দল, এত নেতা-কর্মী। সবাই তো ক্ষমতার হিস্যা পাননি। পাওয়া সম্ভব নয়।

আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখানোর কথা বলেছিল। ১৪ বছর পরও তারা কেন জঙ্গিবাদ দমন ছাড়া অন্য কোনোটিতে সফল হতে পারল না? রাজনৈতিক কৌশল হোক আর আন্তর্জাতিক চাপে হোক, যেখানে সরকার কঠোর ছিল, সেখানে সফল হয়েছে। অন্যান্য ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা আছে। সরকার তার মতো করে সমাধানের চেষ্টাও করছে। সরকারের নীতিকৌশলের সঙ্গে কেউ দ্বিমত করতে পারেন, কিন্তু সরকার নিষ্ক্রিয়, এ কথা কেউ বলছেন না। কিন্তু সমস্যা হলো  আগামী নির্বাচন নিয়ে যে রাজনৈতিক সংকট আছে, সেটি সরকার স্বীকার করছে না। আজ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতারা যেসব যুক্তি দিচ্ছেন, অতীতে বিএনপির মন্ত্রী-নেতারাও একই যুক্তি দিতেন। মানুষ সে সময় যদি বিএনপির যুক্তি গ্রহণ না করে থাকে, তাহলে আজ আওয়ামী লীগের যুক্তি মানবে কেন? বিএনপি ১ কোটি ২০ লাখ ভুয়া ভোটার করে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। পারেনি। আওয়ামী লীগ সর্বাধিক স্বচ্ছ ভোটার তালিকা করার পরও কেন সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারল না, সেই প্রশ্নের জবাবের মধ্যেই নির্বাচনী সংকটের সমাধান আছে।

বাংলাদেশে বিরোধী দল কখনো বড় সমস্যা তৈরি করে না, সমস্যা তৈরি করে ক্ষমতাসীনেরা। ৫১ বছর ধরেই জনগণ এটা দেখে আসছে। আর কত কাল দেখতে হবে? আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষায় অমুক দল সন্ত্রাসী, তমুক দল জঙ্গিবাদী হলেও জনগণের ভোটাধিকার হরণ করার যুক্তি থাকতে পারে না।
রাজনীতিতে এই সাদা সাদা কালা কালা যে খেলা চলছে, এ থেকে জনগণ কবে মুক্তি পাবে?

  • সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্মসম্পাদক ও কবি