২০২৬ কি চীনের টেকসই রূপান্তরের সূচনা ঘটাতে যাচ্ছে

সেমিকন্ডাক্টর চিপের একটি সার্কিট বোর্ডের ওপর চীনের পতাকা ও ‘মেড ইন চীন’ লেখাসংবলিত একটি ইলাস্ট্রেশন। চিপপ্রযুক্তিতে চীনের স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টাকেই এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছেছবি : রয়টার্স

চীনা রাশিচক্র অনুযায়ী ২০২৬ সাল হলো ‘আগুন-ঘোড়ার বছর’। ঘোড়া শক্তি ও গতির প্রতীক। আর আগুন বলতে বোঝায় তীব্রতা ও উদ্দীপনা। এই দুটি একসঙ্গে হলে তা সামনে এগিয়ে যাওয়ার জোরালো ইঙ্গিত দেয়। তবে চীনা প্রবাদ বলে, আগুন-ঘোড়াকে খেয়াল রাখতে হয়—দৃঢ়তা যেন বেপরোয়া আচরণে রূপ না নেয়। ঠিক তেমনই, এই বছরে চীনের অর্থনৈতিক নীতির মূল চ্যালেঞ্জ হবে সামঞ্জস্য আর গতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা।

সাধারণ হিসাবে দেখলে ২০২৫ সালে চীনের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে বাণিজ্য উত্তেজনা শুরু হলেও উৎপাদন খাত স্থিতিশীল ছিল, আর রপ্তানি বেড়েছে। টানা পঞ্চম বছর আবাসন খাতে মন্দা চললেও বড় কোনো আর্থিক সংকট এড়াতে পেরেছে দেশটি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৫ শতাংশ।

আরও পড়ুন

এই তথ্যগুলো দেখায়, চীনা অর্থনীতি এখনো যথেষ্ট সহনশীল। এর পেছনে আছে গভীর কাঠামোগত শক্তি। বিশ্ব উৎপাদন খাতের মোট মূল্য সংযোজনের প্রায় ৩০ শতাংশই আসে চীন থেকে। বৈদ্যুতিক যান, ব্যাটারি, সৌর প্যানেল ও নানা উন্নত শিল্প উপকরণে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে আধিপত্য বজায় রেখেছে।

চীনের আরেকটি বড় শক্তি হলো পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্র যখন শুল্ক বাড়ায় ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কড়া করে, তখন চীনা রপ্তানিকারকেরা ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও গ্লোবাল সাউথের দিকে পণ্য পাঠানো বাড়ায়। জটিল পরিবহন সমস্যাও তারা সামলে নিয়েছে।

চীনের নেতারা বাস্তবতার ভিত্তিতে সংযত কৌশল নিচ্ছেন। এটা ঠিক সিদ্ধান্ত। তবে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যদি তাঁরা বর্তমান ভারসাম্যহীনতাকে স্থায়ী করে ফেলেন, তাহলে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে।

তবে সহনশীলতা মানেই গতি নয়। চীনের অর্থনীতিতে এখনো গুরুতর ভারসাম্যহীনতা আছে, যা প্রবৃদ্ধিকে আটকে রাখছে। চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত এখন ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। এটা গর্বের বিষয় মনে হলেও আসলে এটি দেখায় যে দেশের ভেতরের ভোক্তা চাহিদা দুর্বল, আর সেই ঘাটতি পোষাতে চীনকে এখনো বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যপতন বা ডিফ্লেশন। টানা তিন বছরের বেশি সময় ধরে উৎপাদক পর্যায়ে দাম কমছে। এর মূল কারণ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা, যা ঘরোয়া চাহিদার অভাবের লক্ষণ। ডিফ্লেশন চীনা পণ্যের রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়ালেও এতে কোম্পানির লাভ কমে যায় এবং ঋণের বোঝা ভারী হয়।

ভূরাজনীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। চীনের শক্তিশালী রপ্তানি খাত এখন উল্টো করে কৌশলগত ঝুঁকি হয়ে উঠছে। ইউরোপসহ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে টানাপোড়েন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ‘পরিচালিত’ হলেও পুরোপুরি মীমাংসা হয়নি। উপরন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ দেখিয়েছে—চীনের ঘনিষ্ঠ কোনো দেশকে লক্ষ্য করলেও তার প্রভাব চীনের ওপর পড়তে পারে। এসব ক্ষেত্রে চীন তার অংশীদারদের পুরোপুরি রক্ষা করতে পারে না।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের কৌশলগত পরিবেশে বড় প্রভাব রাখে। তাই চীনের ভূরাজনৈতিক স্বাধীনতা যতটা শক্তিশালী মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। তাইওয়ানের সঙ্গে একীকরণ প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলেও যেকোনো সামরিক সংঘাতের মূল্য হবে অত্যন্ত চড়া।

সি চিন পিংয়ের আরেকটি লক্ষ্য হলো, ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনকে একটি ‘মাঝারি উন্নত’ অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। কিন্তু বর্তমান আয়ের স্তরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ মেয়াদে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা খুবই কঠিন। জাপান ও এশিয়ান টাইগাররা (দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং ও সিঙ্গাপুর) ভিন্ন জনসংখ্যাগত ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উন্নতির শীর্ষে পৌঁছেছিল। চীনের নেতৃত্ব যে এখন সংখ্যার বদলে গুণগত লক্ষ্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটাই প্রমাণ করে তারা বাস্তবতা বুঝছে। পুরোনো প্রবৃদ্ধি মডেল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

চীনের নেতারা বাস্তবতার ভিত্তিতে সংযত কৌশল নিচ্ছেন। এটা ঠিক সিদ্ধান্ত। তবে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যদি তাঁরা বর্তমান ভারসাম্যহীনতাকে স্থায়ী করে ফেলেন, তাহলে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতার বিনিময়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হবে। অর্থনীতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এখনই সাহসী, বুদ্ধিদীপ্ত ও নমনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

  • লি জং-হোয়া কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিষয়ক সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত