কৃষকের কাছে কৃষির চাবি ফেরত দেবে কে

দেশের জন–উৎপাদন খাতের নাভিবিন্দু হলেও কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাকে রাষ্ট্র কখনোই কেন্দ্রীয় বিবেচনায় নেয়নি। কৃষি ও কৃষক নিয়ে লিখেছেন পাভেল পার্থ

হালচাষ শেষে লাঙল কাঁধে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন কৃষক। রানীরপাড়া, গাবতলী, বগুড়াছবি: সোয়েল রানা

নির্বাচনের আগে টলটলে কুয়াশার ভেতর ঘুরছিলাম রূপাভুই, লামাগাঁও, বাঙ্গালভিটা, বাসাউড়া, মুঝরাই গ্রামে। রামসার জলাভূমি হিসেবে ঘোষিত সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের ‘হাটিবান্ধা’ গ্রাম এগুলো। বসতির জন্য উঁচু জায়গা কম, বর্ষায় প্লাবিত চারধার, তাই একের পর এক ঘরগুলো জটলা বেঁধে ‘হাটিবান্ধা’ গ্রাম তৈরি হয়।

লোকায়ত স্থাপত্য এবং সামাজিক ঐক্যের এক ঐতিহাসিক নমুনা এসব গ্রাম; কিন্তু হাওরের গ্রামগুলো সব চুরমার হয়ে খসে পড়ছে। ‘বর্ষায় নাও (নৌকা), হেমন্তে পাও (পদব্রজ)’ যোগাযোগের ধারা বদলেছে। কমছে জমিন, উধাও হচ্ছে জলা। বিলগুলোও ক্রমেই বন্যার পলিতে পেট ভারী হয়ে উঁচু হয়ে উঠেছে। মাছ ধরার নামে কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি, রাসায়নিক বিষ কিংবা ইলেকট্রিক শক দিয়ে মাছের বংশ বিনাশ করা হচ্ছে।

রাতা, বইয়াখাওড়ি, লাখাই, হাতিবান্ধা, সকালমুখী, সমুদ্রফেনা, কালি বোরোর মতো গভীর পানির ধানগুলোও হয়েছে নিখোঁজ। গৃহস্থের ঘর আজ বীজশূন্য। কোম্পানির হাইব্রিড বীজ, সিনথেটিক সার, বিষ আর যন্ত্র ব্যবসার কবলে বন্দী হয়েছে হাওরের কৃষি।

নিখোঁজ হয়েছে নল-নটার বন, হিজল-করচবাগ। উজানের মেঘালয় পাহাড় থেকে নামা ঢল ও বালুতে তলিয়ে যাচ্ছে ফসলের মাঠ, বিছরাখেত, বিল ও গোচারণভূমি। গ্রামে কমছে রোজগার ও আয়ের পথ। দলে দলে হাওর ছাড়ছেন মানুষ। কাজ নিচ্ছেন পাথরখনি, ইটের ভাটা বা দূর শহরের দিনমজুরিতে।

হাওর থেকে ফিরে টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনে যাই। মান্দি-কোচ অধ্যুষিত এ অঞ্চলের আচিক নাম ‘আবিমা’, মানে মাতৃগর্ভভূমি। মধুপুরের আনারস জিআই সনদ পেয়েছে। মিজি সাংমা মধুপুরে আনারস আবাদ শুরু করেছিলেন। মিশ্র ফসলের সেই চাষের ঐতিহ্য রাষ্ট্র সুরক্ষিত রাখেনি। বাণিজ্যিক বাগানের কারণে এই গড়াঞ্চল আজ করপোরেট বিষের ভাগাড়। পাশাপাশি ১৯৫০ সালে জুম আবাদ নিষিদ্ধ, ১৯৬২ জাতীয় উদ্যান, ২০০৪ ইকোপার্ক, রাবার ও আগ্রাসী গাছের বাগান, মিথ্যা বন মামলা, উচ্ছেদ নোটিশ, বিমানবাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জ নানাভাবে এই বনাঞ্চল এবং এখানকার বাসিন্দাদের এক দুঃসহ যন্ত্রণার ভেতর রেখেছে। মধুপুর থেকে যাওয়া হয় রাজশাহী, পানিশূন্য যে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিবঞ্চনার জন্য আত্মহত্যা করেছেন কৃষক।

মাঘের শেষে যাই সুন্দরবনে, এই উপকূলে বাড়ছে লবণাক্ততা এবং জীবিকা হারিয়ে ইটের ভাটায় বিক্রি হচ্ছেন কৃষক। দেশজুড়ে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা আজ আর কৃষকের হাতে নেই। কৃষক আজ নিওলিবারেল–ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত খাদ্যবাজারের এক বন্দী মজুরমাত্র। চাষাবাদ থেকে বিপণন, কোথাও কৃষকের পছন্দ ও সিদ্ধান্ত নেই। জমি, জলা, প্রাণসম্পদ, পদ্ধতি কিংবা উপকরণ—সবই ক্ষমতার বলয়ে জিম্মি।

কৃষি ও কৃষকের মুক্তির অমীমাংসিত প্রশ্ন

এই ভূগোল কৃষিমুক্তি লড়াইয়ের ময়দান; কিন্তু পাগলপন্থী, নানকার, টংক, তেভাগা বা ভানুবিল কৃষক বিদ্রোহের আওয়াজ ক্রমেই রাষ্ট্র ও এজেন্সি দ্বারা বিচূর্ণ ও বিক্ষত হয়েছে। ১৯৪১–৪২ সালে প্রকাশিত কৃষিকথা সাময়িকীতে কৃষি ও কৃষকের দুর্গতি ও বঞ্চনার কথা আছে। ১৯৬৪ সালে পাবনায় প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনের ভাষণে মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘কৃষকেরা দুনিয়ার লোকের আহার জোগান; অথচ সমাজে কৃষকের স্থান নাই।’

দেশের জন–উৎপাদন খাতের নাভিবিন্দু হলেও কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাকে রাষ্ট্র কখনোই কেন্দ্রীয় বিবেচনায় নেয়নি। কোনো রেজিমেই কেন কৃষি ও কৃষকের মুক্তির প্রশ্নটা প্রধান রাজনৈতিক বয়ান হয়ে উঠল না? অথচ দল-মত-পক্ষ-বিপক্ষ সবাইকেই বাঁচার জন্য খেতে হয়। আমরা কী খাই, তা কীভাবে কোথা থেকে আসে, সেই খাবারে কত কিসিমের বিষ-দখল-লুণ্ঠন-বঞ্চনা-দুর্নীতি কি মুনাফার ক্ষত লেগে থাকে—সেসব প্রশ্ন এখনো আমাদের সংস্কার, দিনবদল কিংবা রূপান্তরের মৌলিক রাজনৈতিক জিজ্ঞাসা হয়ে ওঠেনি।

আরও পড়ুন

উপনিবেশবিরোধী লড়াই, মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি জীবন দিয়েছেন দেশের কৃষিমজুর বা কৃষক পরিবারের মানুষেরা। জুলাই অভ্যুত্থানে বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুত্ববাদী রাষ্ট্র সংস্কারের গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল। কিন্তু কৃষি ও কৃষকের মুক্তির প্রশ্ন কোথাও অন্তর্ভুক্ত হলো না। বহু সংস্কার কমিশন হলো অথচ রাষ্ট্র কৃষি-ভূমি-খাদ্যব্যবস্থা সংস্কারের জন্য কোনো কমিশন গঠন করল না।

আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, অন্তর্বর্তী সরকার কৃষি ও কৃষকের সপক্ষে দাঁড়াবে। কৃষক আত্মহত্যার কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডকে প্রশ্ন করবে; বরং বিদেশ থেকে সংহারি কৃষিবিষ আমদানিকে সরকার আরও সহজ করল, বহুজাতিক কোম্পানির কৃষিবাণিজ্যের আরও বৈধতা দিল। জনসম্মতি ছাড়া দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তির নামে খাদ্য ও কৃষি পরিসর দখলে মার্কিন পণ্যগিরির বৈধতা দেওয়া হলো। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার জমিনে প্রশ্নহীন বৈষম্য ও বিপদের দাগ রেখেই শেষ হলো সংস্কারের আশাজাগানো এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ। কৃষি ও কৃষকের মুক্তির প্রশ্ন এই কৃষিনির্ভর দেশে অমীমাংসিতই রইল।

আরও পড়ুন

‘সংস্কারের’ ব্যানারের ভাষা কি কৃষকের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পর এই ভূগোল আবার হাজারো আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এক নয়া ময়দানে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের আগে দেশের নানা এলাকায় ঘুরতে ঘুরতে বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ বা সরকারি অফিসের সামনে ইন্টেরিমের টানানো কিছু প্লাস্টিক ব্যানার চোখে পড়েছিল। রাষ্ট্রের সংস্কারের সপক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য সরকারি প্রচারণা। বড় বড় অক্ষরে লেখা ‘দেশের চাবি আপনার হাতে’।

সরকারি এই আহ্বান আশার বুদ্‌বুদ তৈরি করলেও গ্রামে বহুজন আমায় প্রশ্ন করেছেন এই ‘আপনারা’ কারা? এর ভেতর কি দেশের কৃষক, জেলে, বনজীবী, জুমচাষি, ভূমিহীন, কৃষিমজুর কিংবা নানামুখী খাদ্য উৎপাদকেরা আছেন?

দেশের চাবি যদি জনগণের কাছে থাকে, তবে কৃষির চাবি কৃষকের কাছে থাকার কথা; কিন্তু তা কৃষকের কাছে নেই। ষাটের দশকেই সবুজ বিপ্লব নামের বৈশ্বিক প্রতারণার মাধ্যমে কৃষকের হাত থেকে সেই চাবি ছিনতাই করে জিম্মি করা হয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানি, এজেন্সি, বহুপক্ষীয় ব্যাংক, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা, মিডিয়া কিংবা বিদ্যায়তন নানাভাবে এই ‘নিওলিবারেল’ কৃষিদখলকে বৈধতা দিয়েছে।

কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা এবং কৃষকসমাজ এখনো পরাধীন। কৃষিজমি প্রতিদিন দখল হচ্ছে। ‘আধুনিক কৃষি’র নামে বহুজাতিক কোম্পানির উপকরণনির্ভর বৈষম্যমূলক কৃষিব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত ও বৈচিত্র্যবিমুখ ‘খাদ্যপণ্য’।

রাষ্ট্রই এই হন্তারক কৃষিপ্রক্রিয়াকে জারি রেখেছে। পা ফাটিয়ে, মাথা ঘামিয়ে কৃষির উৎপাদন খরচের প্রায় বেশির ভাগটাই চলে যাচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি এবং তার দেশীয় সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কাছে। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে আছে ‘নিওলিবারেল হেজিমনি’। নির্বাচিত সরকার কি কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার এই ‘হেজিমনি’ চুরমার করে দাঁড়াবে? কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাবিষয়ক প্রস্তাবিত, প্রকাশ্য, আড়াল কিংবা গুম হওয়া সব জনবয়ান ও বিবরণের প্রতি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা মনোযোগী হবেন, বিশ্বাস রাখি।

হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া আধা পাকা ধান কাটতে ব্যস্ত কৃষক
ছবি : প্রথম আলো

কৃষি ও কৃষকের সপক্ষে কী ছিল ইশতেহারে

নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব অঙ্গীকার করেছে, তা পূরণের জন্য এখনই সক্রিয় হওয়া জরুরি। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা অপেক্ষাকৃত তরুণ দলটির কৃষিভাবনা দিয়ে শুরু করা যাক। ‘তারুণ্য ও মর্যাদার ইশতেহার’ শিরোনামে ২৪ দফার ইশতেহার ঘোষণা করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা খাদ্যনিরাপত্তা ও খাদ্যসার্বভৌমত্ব অর্জনে এক দীর্ঘমেয়াদি, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই কৃষিনীতি অবলম্বনের ঘোষণা দেয়। পানি, মাটি, বীজ ও শ্রমকে কৃষিনীতির চার মূল উপাদান ধরে একক ফসলনির্ভরতা কমিয়ে তারা জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি, শস্য আবর্তন ও সংরক্ষণ কৃষিকে গুরুত্ব দিয়েছে। দেশি বীজ গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিতরণের অঙ্গীকার করেছে।

‘জনতার ইশতেহার’ শিরোনামে ঘোষিত ২৬টি অগ্রাধিকারের ভেতর আত্মনির্ভরশীল কৃষির অঙ্গীকার করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ কৃষি খাতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কৃষিপণ্যের বিপণনে সিন্ডিকেট ভাঙার ঘোষণা দিয়েছে। কৃষিকে লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে ‘কৃষিবিপ্লবের’ অঙ্গীকার করেছে তারা। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তাদের ২২ দফার ইশতেহারে মধ্যস্বত্বভোগী নির্মূল, ভাতের অধিকার, সুদমুক্ত ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমানো, দুর্নীতিমুক্ত বাজার গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছে।

গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাকে এক শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। কৃষির উৎপাদনশীল রূপান্তর, কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ, কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, খাদ্যসার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব কৃষি, অঞ্চলভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা, নদী ও জলাশয় পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছে গণসংহতি তাদের ইশতেহারে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শিরোনামের ৫১ দফার ইশতেহারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কৃষি খাতের মৌলিক রূপান্তরের জন্য অঙ্গীকার করে। আত্মনির্ভর, জলবায়ুসহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক এক আধুনিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলাকেই তাদের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে তারা। কৃষক কার্ড, কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ফসলের ন্যায্যমূল্য, কৃষিজমি সুরক্ষা, কৃষিবিমা, শস্যবিমা, পশুবিমা, মৎস্যবিমা, কৃষি-উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম, অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপণ্য উৎপাদন, খাল খনন, হাওরে ইজারা প্রথা বাতিল, জৈব কৃষি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব কৃষির ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।

ইশতেহারগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবুজ বিপ্লব প্রকল্পের চাপিয়ে দেওয়া চলমান ‘অধিক উৎপাদন দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকে বহু রাজনৈতিক দলই সরে এসেছে। তাদের ইশতেহারে স্পষ্ট বা অস্পষ্টভাবে এক নিরাপদ ও ন্যায্য কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার আওয়াজ পাওয়া যায়। এনসিপি ও গণসংহতি সরাসরি ‘খাদ্যসার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠার সপক্ষে।

সরকারি দল বিএনপি স্পষ্টভাবে ‘কৃষককেন্দ্রিক আত্মনির্ভর’ কৃষিব্যবস্থার অঙ্গীকার করেছে, যা এক সার্বভৌম মর্যাদার কৃষিদর্শনকে হাজির করে। তাহলে এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করলেই কি কৃষকের হাতে আবারও ফেরত আসবে কৃষির চাবি? নিশ্চয়ই নয়; কারণ এই চাবি ফেরতের লড়াই এক ধারাবাহিক রূপান্তরপ্রক্রিয়া। কৃষকের আয়নায় রাষ্ট্রের কৃষিচিন্তাকে গড়ে তোলার ভেতর দিয়ে এই চাবি ফেরতের কাজটি সহজ করে তুলতে পারেন বিজয়ী সংসদ সদস্যরা।

ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রে পানি তুলে চাষাবাদ।
ফাইল ছবি

ভাতের থালাকে প্রশ্ন করুন

বাংলাদেশ জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা (২০১৭) জানায়, তাদের ভর্তি ক্যানসার রোগীর প্রায় ৬৪ শতাংশই কৃষির সঙ্গে জড়িত। আধুনিক কৃষির নামে বাণিজ্যিক খাদ্য উৎপাদনপ্রক্রিয়া আমাদের থালায় প্রতিদিন হাজির করছে বিষাক্ত ঝুঁকিপূর্ণ খাবার।

মাটি, পানি, বীজ, বায়ু, বাজারসহ কৃষকের চারধার নিরাপদ না হলে আমাদের ভাতের থালাও নিরাপদ হবে না। পাশাপাশি কাঠামোগত বৈষম্য, অন্যায্য বণ্টন ও বাজারব্যবস্থা, যুদ্ধ ও অস্ত্রবাণিজ্য, জ্বালানি বিতর্ক, প্রবেশাধিকার, মিথ্যা অভিযোজন প্যাকেজ, মেধাস্বত্ব তর্ক, নীতি সমন্বয়হীনতা, দুর্বল মনিটরিং কাঠামো, বহুজাতিক আগ্রাসন, পরিবেশগত বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছু নানাভাবে খাদ্যব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। কৃষির চলমান ঝুঁকি আরও তীব্র ও অসহনীয় হয়ে উঠছে জলবায়ুগত নানা সংকটের কারণে। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার এমনতর বহুমুখী খবরদারি আড়াল বা জায়েজ করে আমাদের ভাতের থালা কোনোভাবেই নিরাপদ ও ন্যায্য হতে পারে না।

বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর একটি লেখায় দেখিয়েছেন, হাইব্রিড বীজ কীভাবে দেশীয় কৃষির ক্ষতি করছে। বাংলাদেশের কৃষি অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

আশা করি, এই কৃষিদর্শন তিনি এখনো ধারণ করেন। তাঁর ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় এলাকায় আমন মৌসুমে কালো নুনিয়া, সাদা নুনিয়া, দুধিয়া, কলম, কাকুয়া, নোহাজাং, পানাস, পানাতি, বচি, কাইসালি, পোড়াবিন্নি, মালশিরা ধানের আবাদ হতো। আউশ মৌসুমে পাথরনুটি, জামিরস, ছাইতানডুমুর, কাতারভাদই কিংবা কাজলি ধানের আবাদ হতো। কালো নুনিয়া ও কাইল্যাজিরা সুগন্ধি। মুড়ি ভালো হয় কাশিয়াবিনি, পানাস ও দুধিয়া কলমের। পিঠা ভালো মালশিরা, অঘনঢেপী ও পানাসের। এসব ধান জলবায়ুসহিষ্ণু ও স্থানীয় প্রতিবেশ-উপযোগী। কৃষকের কৃষি ছিনতাই করে বহুজাতিক কোম্পানিনির্ভর বিষাক্ত বিপজ্জনক যে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা আমরা বহাল রেখেছি, তা বিএনপি–ঘোষিত ‘কৃষককেন্দ্রিক জলবায়ুসহিষ্ণু আত্মনির্ভর’ কৃষিদর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আশা করব নিরাপদ ও ন্যায্য কৃষির লক্ষ্যে দেশের সব প্রান্তের সর্বজনের মতামত ও অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে সরকার দ্রুত নানা মেয়াদি তৎপরতা গ্রহণ করবে। ৩০টি প্রতিবেশ অঞ্চলে অন্তত একটি করে ‘কৃষককেন্দ্রিক জলবায়ুসহিষ্ণু আত্মনির্ভর’ কৃষিগ্রাম গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে উঠবে কৃষকের বীজঘর। নতুন প্রজন্মের জন্য কৃষক পরিচয় হয়ে উঠবে আকাঙ্ক্ষার। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার মুক্তির লক্ষ্যে ভাতের থালাকে পাঠ করবার জনভাষ্য জোরালো হবে।

  • পাভেল পার্থ লেখক ও গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব