‘দাদার থন মাত্র এক নম্বর কম পেয়েছি’

অথচ সরকার শুয়ে পড়া শান্ত রোগীকে নিয়ে স্থিতিশীলতার গীতিবন্দনায় লিপ্ত।

‘অঙ্ক পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছ’—এমন এক প্রশ্নের উত্তরে গ্রামের এক চতুর বালক জবাব দিয়েছিল, ‘দাদার থন মাত্র এক নম্বর কম পেয়েছি।’ শুনলে মনে হবে অবস্থা খুব একটা মন্দ নয় বা কিছুটা সন্তোষজনক। কিন্তু খবর নিয়ে দেখা গেল যে দাদাই অঙ্কে পেয়েছে মাত্র ‘এক’! বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতির স্কোর অনেকটা সে রকম।

কিন্তু কৃতিত্ব দাবির বেলায় সরকারে থাকা উপদেষ্টারা ‘টিপিক্যাল পলিটিশিয়ান’কেও ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। অর্থ উপদেষ্টা বলছেন, এত দিন পর অর্থনীতি স্থিতিশীলতার স্বাদ পেয়েছে, যদিও সামান্য কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ব্যর্থতা ঢাকার জন্য সরকার বলছে, গত সরকার এই অর্থনীতিকে একেবারে ভঙ্গুর অবস্থায় ফেলে গেছে। ভালো কিছু দেখা গেলে বুঝতে হবে এর কৃতিত্ব গত দেড় বছরের সুবর্ণ যুগের। খারাপ কিছু দেখা গেলে এর জন্য গত ১৫ বছরের শাসন দায়ী।

এই আত্মসাফাই প্রতিযোগিতা অর্থনীতির বেলায় বেসামাল হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতি ‘গাজা–তুল্য’ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, জাতি সভ্যতার দিকে যাচ্ছে, দেশ ১০ বছরে সিঙ্গাপুর হবে, পৃথিবীই আমাদের দরজায় এসে ধরনা দেবে কিংবা আমরা দর্শক থেকে খেলোয়াড় হয়ে বিশ্বমাঠে নামছি—ইত্যাকার বচনসুধা অর্থনীতির সংকটাবস্থা নিয়ে উপহাস মাত্র।

দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ যখন তলানিতে, পুঁজিবাজারে চলছে ঋণাত্মক রিটার্ন, ব্যাংক খাত নতুন মাত্রায় খেলাপিতে নিমজ্জিত, রেকর্ডসংখ্যক কলকারখানার দরজা বন্ধ, রপ্তানি নিম্নমুখী, জিডিপির প্রবৃদ্ধি যখন কোভিড–কাল বাদে তিন দশকে সর্বনিম্ন, বেকারত্ব যখন প্রকট ও মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশে অনমনীয়, তখন এই অবস্থাকে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বলে গর্ব করা যায় না। এ হচ্ছে আওয়ামী আমলের শেষবেলায় শুরু হওয়া সংকটের বৃহত্তর ও প্রকটতর রূপ।

পরিকল্পনা কমিশনের ‘স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫’ প্রতিবেদনে দাবি করা হলো যে অর্থনীতিতে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা এসে গেছে। মিডিয়ায় যাঁরা অর্থনীতি বা ফাইন্যান্সের দায়িত্বে আছেন, তাঁরা এই দাবির কোনো যাচাই–বাছাই না করেই ছাপিয়ে দিলেন যে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা এসে পড়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কয়েকজন অর্থনীতিবিদও এই খোয়াবে আক্রান্ত। তাঁরা সরকারকে সামষ্টিক স্থিতিশীলতার ‘ক্রেডিট’ দিচ্ছেন। বালক–বালিকারাও আজকাল জানে কী করে কোনো অজানা বিষয়ের গুগল সার্চ করতে হয়। সেখানে যদি আমরা ‘হোয়াট ইজ কল্ড ম্যাক্রোইকোনমিক স্ট্যাবিলিটি’ লিখে সার্চ দিই, তাহলে আমরা যা পাব তা বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে মিলবে না।

অর্থশাস্ত্র বলছে যে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা হচ্ছে এমন এক অবস্থা, যেখানে থাকবে নিম্ন ও সুস্থির মূল্যস্ফীতি, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও প্রায় পূর্ণ বিনিয়োগ। এখানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের একটি অনুমেয় বা ‘প্রেডিক্টিবল’ পরিবেশ থাকবে। এর পাশাপাশি এখানে থাকবে স্বাস্থ্যকর বহির্বাণিজ্য এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য বা ‘ম্যানেজেবল’ ঋণ; থাকবে সার্বিক উত্থান–সক্ষমতা বা ‘রিজিলিয়েন্স’ ও সামাজিক কল্যাণের অবস্থা বা ‘ওয়েল-বিয়িং’। এর কোনোটিই কি এখন বিদ্যমান? তাহলে সামষ্টিক স্থিতিশীলতাও কি ‘অটো পাস’ করল?

২০০০-২০২৩ কালপর্বে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেন্ড ধরলে বলতেই হবে যে বাংলাদেশ গত আড়াই বছরে নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়ে গেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭-২০০৯ অর্থবছরগুলোতেও এই ছয় ভাগের ‘ট্রেন্ড গ্রোথ’ ধরে রাখতে পেরেছিল, যা এই সরকার স্পষ্টতই পারেনি। এর মূল কারণ তারা সামাজিক নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিত করেছিল।

হঠাৎ দু-একটা সূচকের সাদৃশ্য পেলেই তাকে সামষ্টিক স্থিতিশীলতা বলে না। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভে শুধু ২৮ বিলিয়ন ডলারের স্থিতিই সামষ্টিক স্থিতিশীলতার সার্বিক গ্যারান্টি দেয় না। এই সরকার ক্ষমতায় এসে প্রায় সাড়ে ২০ বিলিয়ন ডলার হাতে পায়। সেটিকে ১৬ মাসে ২৮ বিলিয়নে টেনে তোলার জন্য সরকার কিছুটা বাহবা নিতেই পারে।

কিন্তু এই সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলারের বাড়তি অঙ্কের প্রায় পুরোটাই এসেছে প্রবাসীদের অর্জিত রেমিট্যান্স থেকে, যা স্বাস্থ্যকর বহির্বাণিজ্যের পরিচয় দেয় না। পুঁজিপণ্য ও মধ্যবর্তী দ্রব্যের আমদানিতে ব্যাপক কষানি দিয়ে এই বর্ধিত রিজার্ভ অর্জনের তৃপ্তি অর্জন করা হয়েছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ হয়েছে বহুলাংশে ম্লানতর।

২০২৩–২০২৪ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকার পুঁজিপণ্যের আমদানি কমিয়ে ফেলেছিল শতকরা ২৪ শতাংশ, যা নিয়ে অর্থনীতিবিদেরা সমালোচনা করেছিলেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪–২০২৫ অর্থবছরে এই আমদানি কমিয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। এখন পর্যন্ত ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর কালপর্বে এটি কমেছে প্রায় ১৭ শতাংশ। একই কালপর্বে মধ্যবর্তী দ্রব্যের আমদানি কমেছে ১৬ শতাংশ ও পেট্রোলিয়াম আমদানি কমেছে ১১ শতাংশ। এগুলো অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করেছে।

অথচ সরকার শুয়ে পড়া শান্ত রোগীকে নিয়ে স্থিতিশীলতার গীতিবন্দনায় লিপ্ত। সম্প্রতি অর্থ উপদেষ্টা ব্যাংকিং অলম্যানাক (ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে গবেষণাগ্রন্থ) প্রকাশ উপলক্ষে বললেন তাঁদের পরিচালনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি উত্থান–সক্ষমতা ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে।

উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে কোনগুলোর অগ্রগতি দেখে তিনি এই মন্তব্য করলেন, বোঝা গেল না। ঝুঁকিমুক্ত সঞ্চয় থেকে সুদ পাওয়া যায় ১০ শতাংশ। সেই বিচারে ঝুঁকিপূর্ণ পুঁজিবাজার থেকে কমপক্ষে ২০ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া উচিত। অথচ এক বছরে রিটার্ন এল ঋণাত্মক ছয় ভাগ, যা উত্থান–সক্ষমতার সাক্ষ্য দেয় না।

দারিদ্র্য বৃদ্ধির উল্টোগমন মানে কি কল্যাণ বৃদ্ধি? ঋণ নিয়ন্ত্রণে সরকার বেসামাল। ২০২৫–এর নভেম্বর পর্যন্ত ব্যক্তি খাতে ঋণ বৃদ্ধি যেখানে প্রায় সোয়া ৬ শতাংশ, সেখানে সরকার নিজেই নিজের ঋণ বাড়িয়েছে ২৬ শতাংশ, যা তার বেসামাল ঋণ ব্যবস্থাপনা প্রমাণ করে। সাত ভাগের মতো জাতীয় কর-জিডিপি হার এখন হিসাবের তলানিতে।

সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয় কমালেও সরকার কমাতে পারেনি এর পরিচালন ব্যয়। তাই ব্যাংকের টাকায় ভাগ বসাচ্ছে কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে টাকা ছাপাতে বাধ্য করছে। সংজ্ঞা সঠিক করায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে বটে। কিন্তু এর বাইরেও শুধু এই সরকারের আমলেই খেলাপি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি হারে, যা এখন মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ স্পর্শ করেছে।

এই বিস্ফোরিত খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার উপসর্গ নয়। এটি ঝুঁকির হুমকি। ব্যাংকিং, রাজস্ব ও বাণিজ্য—এই তিন খাতের টালমাটাল অবস্থা কখনোই সামষ্টিক স্থিতিশীলতার সাক্ষ্য দেয় না। স্থিতিশীলতা থাকলে বিনিয়োগ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কথা। প্রকৃত মজুরি ও ভোগ বাড়বে। এগুলোর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও অন্ধের হাতিদর্শনের মতো সরকার সামষ্টিক স্থিতিশীলতা আবিষ্কার করেছে, যা সাধারণ মানুষের বা সদ্য চাকরিচ্যুত লাখো শ্রমিকের কাছে এক নিদারুণ রসিকতা মাত্র। 

আরও পড়ুন

বিশ্বব্যাংকের মতে, চলমান ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। সরকার ও সরকারের প্রতি মমতাময় অনেক অর্থনীতিবিদ এটিকে ‘রিকভারি’ বা ‘নবজাগরণ’ বলে ফেলেছেন। এটি এখনো নিম্ন প্রবৃদ্ধি, যা একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য স্থিতিশীলতার যোগ্য দাবিদার নয়।

২০০০-২০২৩ কালপর্বে বাংলাদেশের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেন্ড ধরলে বলতেই হবে যে বাংলাদেশ গত আড়াই বছরে নিম্ন প্রবৃদ্ধির ফাঁদে পড়ে গেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭-২০০৯ অর্থবছরগুলোতেও এই ছয় ভাগের ‘ট্রেন্ড গ্রোথ’ ধরে রাখতে পেরেছিল, যা এই সরকার স্পষ্টতই পারেনি। এর মূল কারণ তারা সামাজিক নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিত করেছিল।

পক্ষান্তরে অন্তর্বর্তী সরকার সামাজিক সুরক্ষাকে গৌণ করে রাষ্ট্র সংস্কারের নামে বহুমুখী বয়ানে ব্যাকুল হয়েছে। অধিক সন্ন্যাসীতে গাঁজন নষ্ট হয়ে গেছে। অর্থনীতি এখানে মুখ্য মনোযোগ পায়নি। আসেনি স্থিতি।

শীর্ষ পর্যায়ের উপদেষ্টারা বিদেশে গিয়ে গরিবপ্রীতি প্রদর্শন করে পরাশক্তিগুলোর সামরিক ব্যয়ের সমালোচনা করেছেন, অথচ তাঁরাই যুদ্ধবিমান কেনার চিন্তা করছেন। পৃথিবীর কোনো উন্নয়নশীল দেশ সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে কখনো ‘ইমার্জিং ইকোনমি’ হতে পারেনি।

আশির দশকে পাকিস্তানের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় সাত শতাংশ, তা এখন নামতে নামতে চার ভাগে ঠেকেছে। দেশের কৌশলগত চরিত্র কী হবে—এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা একটি নির্বাচিত সরকারের। এর আগের চারটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কেউই এই সরকারের মতো এতটা বিভ্রান্ত ছিল না। কর্তাদের মনোজাগতিক স্থিরতাও একটি দেশের সামষ্টিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত।

  • ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ড-এ অর্থনীতির অধ্যাপক

    *মতামত লেখকের নিজস্ব