যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) প্রতিবছর বিশ্বের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর র্যাঙ্কিং প্রকাশ করে। ২০২৬ সালে কিউএস গ্লোবাল র্যাঙ্কিং অনুযায়ী এশিয়ার সেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নেই। এশিয়ায় মোট ১ হাজার ৫২৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১৩২তম। এ ছাড়া সেরা ২০০ তালিকায় বাংলাদেশের আরও দুটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে—নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ১৪৯তম এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ১৬৫তম। প্রশ্ন হলো, র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকার কারণ কী?
র্যাঙ্কিং করা হয় কিছু সুনির্দিষ্ট সূচক বা মানদণ্ডের ভিত্তিতে। এর মধ্যে আছে একাডেমিক কার্যক্রম, শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার সংখ্যা ও এর প্রভাব, নতুন উদ্ভাবন ও প্রয়োগ, কর্মক্ষেত্রে স্নাতকদের দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কৃতিত্ব, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি, ইন্ডাস্ট্রি ও অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ, আন্তর্জাতিক খ্যাতি, গবেষণা নেটওয়ার্ক, গবেষণা-প্রবন্ধের সাইটেশন, পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক-কর্মকর্তার সংখ্যা, বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী বিনিময় হার ইত্যাদি।
কিউএস ছাড়াও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের র্যাঙ্কিং প্রকাশ করে থাকে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আছে টাইমস হায়ার এডুকেশন, ওয়েবমেট্রিক্স, সাংহাই র্যাঙ্কিং ইত্যাদি। টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি শিক্ষা-সাময়িকী, যাদের সর্বশেষ প্রকাশিত ২০২৫ সালের র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের কোনোটি নেই। র্যাঙ্কিং করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটে তথ্য সংগ্রহ করে। তাই কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা তার অন্তর্গত বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও বিভাগ যদি সেখানকার পড়াশোনা, সুযোগ–সুবিধা, গবেষণা, অর্জন এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত অনলাইনে নিয়মিতভাবে আপডেট না করে, তবে র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়বে।
র্যাঙ্কিংয়ে আসার জন্য কিংবা তালিকায় ওপরে ওঠার জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা ও গবেষণার বিভিন্ন সূচকে মান বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটগুলোকে সমৃদ্ধ করতে হবে এবং নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে।
তা ছাড়া র্যাঙ্কিং করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ—কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান কেমন, পাঠদানের পদ্ধতি ও উপকরণ কতখানি প্রযুক্তিনির্ভর, শিক্ষকদের যোগ্যতা ও দায়িত্ববোধ কোন স্তরের, পরীক্ষা ও মূল্যায়নপ্রক্রিয়া কোন ধারার, কর্মক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কতটুকু—এ রকম একগুচ্ছ প্রশ্ন সামনে রেখে জরিপ চালানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী, আগে পাস করে যাওয়া শিক্ষার্থী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা শিল্পকারখানার কর্মকর্তা ও নিয়োগকর্তা এই জরিপে অংশ নেন। তাঁদের অভিমত বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ও ভাবমূর্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও লেখালেখির মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য দেখতে হয় অন্য গবেষক বা প্রতিষ্ঠান সেগুলো কীভাবে, কতটুকু ব্যবহার করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন ভালো হলে সেগুলো অন্য গবেষকের এবং অন্য প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ তৈরি করে। এভাবে গবেষণাপত্রের সাইটেশন বা ব্যবহার-সংখ্যা হিসাব করে তার উপযোগিতা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে আমাদের গবেষণা ও লেখালেখি অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হারায়, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালগুলো প্রায় ক্ষেত্রে নির্ধারিত বৈশিষ্ট্য ও মান অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। তা ছাড়া বিশ্বের নামীদামি জার্নালে বাংলাদেশের শিক্ষকদের গবেষণাপত্র প্রকাশের হারও সংখ্যার দিক থেকে অনেক কম।
আন্তর্জাতিক সংযোগ, সমন্বয় ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ নেই কিংবা বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তোলার মতো যথেষ্ট সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তা ছাড়া কোনো প্রকল্প বা গবেষণা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আন্তবিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে না পারার ব্যর্থতা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পিছিয়ে রাখছে। একই সঙ্গে গবেষণার অর্থায়ন, অবকাঠামোগত অবস্থা এবং বিবিধ সুযোগ-সুবিধা র্যাঙ্কিংয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
সুতরাং র্যাঙ্কিংয়ে আসার জন্য কিংবা তালিকায় ওপরে ওঠার জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা ও গবেষণার বিভিন্ন সূচকে মান বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটগুলোকে সমৃদ্ধ করতে হবে এবং নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইনেই টাকা জমা দেওয়া, ফরম পূরণ করাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজের সুযোগ রাখতে হবে। এ ছাড়া বিশেষভাবে নজর দিতে হবে গবেষণার দিকে। গবেষণার শুধু সংখ্যা বা পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, গুণগত মান বাড়াতে হবে, প্রচারের ব্যবস্থাও করতে হবে। আর বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আগ্রহ বাড়ানোর জন্য প্রশাসনিক ও একাডেমিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ ও সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েরই আলাদাভাবে কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল বা প্রাতিষ্ঠানিক গুণমান নিশ্চিতকরণ কেন্দ্র থাকা দরকার। এই কেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রম তৈরি করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন দুর্বলতা যাচাই করে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য কাজ করবে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না; এই কেন্দ্র শিক্ষক প্রশিক্ষণের কাজও করবে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্বও থাকবে কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেলের।
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানদণ্ড নির্ধারণ ও তদারকির কাজ করে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় রক্ষা, শিক্ষার মান নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া কিংবা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগ খোলার ব্যাপারে অনুমতি প্রদান করা ইউজিসির কাজের অন্তর্গত। এই সক্ষমতা থেকে ইউজিসি বছরের কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর র্যাঙ্কিং প্রকাশ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাদের আগেই কিছু সূচক বা মানদণ্ড ঠিক করতে হবে; এই সূচক অনুযায়ী নম্বর বা স্কোরের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রম নির্ধারিত হবে। এভাবে দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নের ব্যাপারে আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব।
তারিক মনজুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
