ট্রেনের এক্সট্রা বগিতে কেন দ্বিগুণ ভ্যাট

প্রতিবার ঈদের ছুটিতে যাত্রীচাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে ট্রেনে বাড়তি বগি যুক্ত করা হয়।ফাইল ছবি : প্রথম আলো

ঈদের ছুটিতে যাত্রীর পকেট থেকে দেড়-দুই গুণ বাড়তি বাসভাড়া নেওয়াটা স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। বাসমালিকদের যুক্তি হলো ঈদের ছুটিতে যাত্রী থাকে একমুখী। ফিরতি যাত্রায় বাসের আসনগুলো প্রায় ফাঁকা থাকে।

আইনগতভাবে বাড়তি ভাড়া বৈধ না হওয়ায় অনেক পরিবহন কোম্পানি বাড়তি ভাড়া নেয় ঠিকই কিন্তু টিকিটে আগের ভাড়ার অঙ্কই বসিয়ে দেয়। যদিও বেশির ভাগ বাস কোম্পানিই আইনের তোয়াক্কা করে না, তাদের এসব লুকোচুরিরও বালাই নেই। নামী কোম্পানির বাস ছাড়া বিভিন্ন চলাচলকারী বাসের অনেক কর্মী যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কে ‘ঈদ সালামি’, ‘বকশিশ’ বা ‘বোনাস’ হিসেবে মনে করেন।

বেসরকারি খাতের বাসের ওপর না হয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই কিংবা পুরো পরিবহন সিন্ডিকেট না হয় সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হওয়ায় কখনোই ভাড়ানৈরাজ্য বন্ধ করা হয় না। তাই বলে ঈদযাত্রায় ট্রেনের টিকিটে বাড়তি ভাড়া নেবে রেলওয়ে? এবার পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়ে সেই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

ট্রেনের টিকিট অনলাইনে যাওয়ার পর এমনিতেই নাগরিকদের ক্ষুদ্র একটি অংশই শুধু রাষ্ট্রীয় গণপরিবহনের এই সেবাটা পান। ১০ দিন আগে ট্রেনের টিকিট ছাড়া হয়, কিন্তু কিছু কিছু রুটে টিকিট ছাড়ার মাত্র দুই–তিন মিনিটের মধ্যে সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। এ রকম একটি রুট ঢাকা-কক্সবাজার। তবে এবার ভাগ্যক্রমে নির্ধারিত যাত্রার দিনের চার দিন আগে কয়েকটা টিকিটে সবুজ সিগন্যাল পাওয়া গেল। কিন্তু টিকিট কাটতে গিয়ে দেখা গেল, এটা এক্সট্রা বগি, নির্ধারিত ভাড়ার ওপরে ৩০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। ট্রেনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বগিগুলোর ক্ষেত্রে ভ্যাট হচ্ছে ১৫ শতাংশ।

রেলওয়ের যুক্তি হলো, অতিরিক্ত বগি যুক্ত করতে কোচ প্রস্তুত রাখা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত ব্যয় হয়। সে কারণেই এক্সট্রা বগিতে এক্সট্রা ভ্যাট। কিন্তু একই ট্রেন, একই গন্তব্য, একই শ্রেণির আসনে কোনো যুক্তিতেই দ্বিগুণ ভ্যাট হতে পারে না

প্রতিবার ঈদের ছুটিতে যাত্রীচাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে ট্রেনে বাড়তি বগি যুক্ত করা হয়। এবারও ঈদযাত্রা ও ফিরতি যাত্রার কথা বিবেচনায় নিয়ে ৩ মে থেকে ৭ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন রুটে বাড়তি বগি যুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে যেমন শোভন কোচ ছিল, আবার এসি কোচও। রেল মন্ত্রণালয় ঈদযাত্রায় ট্রেনে অতিরিক্ত বগি যুক্ত করাকে যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে তাদের অবদান হিসেবে ফলাও করে দেখাতে আগ্রহী। প্রশ্ন হচ্ছে, রেলওয়ে যাত্রীসেবার জন্য ট্রেনে যে অতিরিক্ত বগি যুক্ত করছে, সেখানে দ্বিগুণ ভ্যাট দিতে হবে?

আগে মূল বগি ও এক্সট্রা—ট্রেনের সব যাত্রীর ক্ষেত্রে এসি বগির জন্য ১৫ শতাংশ ও নন-এসি বগির জন্য ১০ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৭ মার্চ বিগত আওয়ামী লীগ আমলে এক প্রজ্ঞাপনে বাড়তি কোচের যাত্রীদের ভ্যাট বাড়িয়ে এসি ৩০ শতাংশ ও নন-এসি ২০ শতাংশ করা হয়।

আরও পড়ুন

রেলওয়ের যুক্তি হলো, অতিরিক্ত বগি যুক্ত করতে কোচ প্রস্তুত রাখা, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত ব্যয় হয়। সে কারণেই এক্সট্রা বগিতে এক্সট্রা ভ্যাট। কিন্তু একই ট্রেন, একই গন্তব্য, একই শ্রেণির আসনে কোনো যুক্তিতেই দ্বিগুণ ভ্যাট হতে পারে না। এটা অবশ্যই বৈষম্যমূলক নিয়ম। অনেক সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংগঠন তাদের প্রয়োজনে ট্রেনের বগি রিজার্ভ করে। এসব ক্ষেত্রে সারচার্জ আরোপ করাটা স্বাভাবিক।

রেলওয়ে বিশ্বজুড়ে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও অপেক্ষাকৃত সস্তা গণপরিবহন হিসেবে স্বীকৃত। গত ১৫ বছরে রেলওয়েতে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে, প্রায় এক হাজার কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। এত বিপুল বিনিয়োগের পরও রেলওয়েকে বিপুল লোকসানের বৃত্ত থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়নি। রেলওয়ের এই অদক্ষতা ও অপচয়ের সমাধান হিসেবে বারবার করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফায় ট্রেনের ভাড়া বেড়েছে। কখনো একলাফে ৫০ শতাংশ, কখনো ভ্যাট আরোপ, কখনো রেয়াতি-সুবিধা প্রত্যাহারের মাধ্যমে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সরাসরি না বাড়িয়ে পন্টেজ চার্জ সেতুর মাশুল বাড়িয়ে ট্রেনভাড়া বাড়িয়েছে। ঈদযাত্রায় এক্সট্রা বগিতে দ্বিগুণ ভ্যাট ভাড়া বাড়ানোর একটি কৌশল। এভাবে নানাভাবে ভাড়া বাড়ানোর ফলে এখন অনেক রুটে আন্তনগর ট্রেনের ভাড়া  একই রুটের বাসের ভাড়ার কাছাকাছি বা বেশি।

অপচয় ও অদক্ষতার বোঝা জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার এই সহজ কৌশল থেকে রেলকে বের করে আনবে কে?

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী