গত সপ্তাহে একটা ঝটিকা সফর দিলাম পশ্চিমের তিনটি জেলায়। প্রথমে খুলনা। তারপর রাজশাহী। শেষে কুষ্টিয়া। পুরো সফরই ছিল ব্রডগেজ ট্রেনে। এই সুযোগে ট্রেন বা রেলগাড়ি নিয়ে কিছু শিবের গীত গেয়ে নিই।
লোকোমোটিভ বা বাষ্পীয় রেল ইঞ্জিন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে দুই ইংরেজ রিচার্ড ট্রেভিথিক ও জর্জ স্টিফেনসন ছিলেন পথিকৃৎ। রিচার্ড ট্রেভিথিক ১৮০৪ সালে বিশ্বের প্রথম সফল বাষ্পীয় লোকোমোটিভ তৈরি করেন। জর্জ স্টিফেনসন ১৮২৫ সালে বিশ্বের প্রথম পাবলিক রেলওয়ের জন্য ‘লোকোমোশন-১’ তৈরি করেন। ইঞ্জিনের নাম ছিল ‘রকেট’। ভারত তখন ইংরেজদের সবচেয়ে বড় ও দামি উপনিবেশ। রীতিমতো কামধেনু।
এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে রেলপথে যাত্রা শুরু হয় ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল। ভারতের প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেনটি বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বাই) বোরি বন্দর থেকে থানে পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটার চলেছিল। এখন যে অঞ্চলটি বাংলাদেশ, এখানে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি দর্শনা (চুয়াডাঙ্গা) থেকে জগতি (কুষ্টিয়া) পর্যন্ত ৫৩ কিলোমিটারের প্রথম রেলপথ চালু করে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর। তারপর তা সম্প্রসারিত হয় অন্যান্য জেলায়।
একসময় কয়লা পুড়িয়ে বাষ্প তৈরি করে সেই বাষ্পে চলত রেলের ইঞ্জিন। কু-উ ঝিকঝিক ঝিকঝিক আওয়াজ তুলে হেলেদুলে চলত ট্রেন। সে ইঞ্জিন এখন আর নেই। কয়লার জায়গা নিয়েছে ডিজেল। রেলকামরায় উঠতে বা নামতে গিয়ে পা পিছলে অনেকেই রেলের চাকায় কাটা পড়ে মারা যায় কিংবা হাড়গোড় ভাঙে। এ নিয়েই হয়তো ছড়াকার লিখেছেন, ‘রেলগাড়ি ঝমাঝম/ পা পিছলে আলুর দম।’
আমাদের দেশে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম যাত্রীবান্ধব ছিল না। রেলকামরার দরজার হাতল ধরে খাড়া ধাতব সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হতো। সম্প্রতি একটি পরিবর্তন হয়েছে। প্ল্যাটফর্ম উঁচু করা হয়েছে। এখন হেঁটেই দরজা দিয়ে ঢোকা যায়। এমনকি হুইলচেয়ার নিয়েও। তারপরও অনেক স্টেশনে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। খোদ রাজধানীর কমলাপুরে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে, যেখান থেকে রেললাইন গেছে পদ্মা সেতুর দিকে। এই প্ল্যাটফর্ম কেন উঁচু করে বানানো হলো না, তা আমার বুঝে আসে না।
কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনটি শহরের মধ্যে। এটির প্ল্যাটফর্মও রয়ে গেছে আগের মতো নিচু। ট্রেনে উঠতে বা ট্রেন থেকে নামতে শিশু, নারী ও প্রবীণদের যে কী কষ্ট হয়, তা না দেখলে বোঝা যাবে না। এই স্টেশনে কয়েকটি ব্যানার দেখলাম। সেখানে লেখা—কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম উঁচুকরণ প্রকল্পের বাস্তবায়ন চাই।
ঋণ করে একের পর এক মেগা প্রজেক্ট বানানোর খ্যাতি আছে আমাদের। এসব প্রজেক্ট যে সরকারের আমলে নেওয়া হয়, সেই সরকারের প্রধানকে আমরা দেবতার সারিতে বসিয়ে দিয়ে বলি, তিনি এটি করেছেন, তিনি না থাকলে উন্নয়ন হয় না ইত্যাদি। অল্প বাজেটের ছোটখাটো কাজ তাঁদের নজরে পড়ে না। অথবা এমনও হতে পারে, জায়গাটির রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব কম। কুষ্টিয়া কি তেমন শহর? এই শহর ও তার আশপাশের অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বেশ কয়েকজন, যাঁদের নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি—লালন সাঁই, কাঙাল হরিনাথ, গগন হরকরা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মীর মশাররফ হোসেন।
শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি আর ছেঁউড়িয়ায় লালনের সমাধি তো রীতিমতো সাংস্কৃতিক তীর্থ। জায়গা দুটি যেন অসুরদের দখলে চলে যাচ্ছে। এগুলো ঘিরে যেসব স্থাপনা তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে, সেসবের মধ্যে না আছে কোনো পরিকল্পনা, না আছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। গুদামঘরের মতো কতগুলো কংক্রিটের বাক্স তৈরি হয়েছে। কোনো স্থাপনা তৈরি না করে আশপাশে যদি শুধু গাছপালা, ফুলের বাগান আর সবুজ চত্বর থাকত, তাহলে তার মধ্যে আমরা অপার্থিব সুখ খুঁজে পেতাম। মুশকিল হলো, কর্তাদের মগজে-মননে সব সময় কিলবিল করে ইট-পাথর-রড-সিমেন্ট আর বালু। ইদানীং রডের বদলে দেওয়া হচ্ছে বাঁশ।
সারা দেশ যদি ব্রডগেজে মুড়ে দেওয়া যায়, তাহলে রেলযাত্রায় রীতিমতো বিপ্লব ঘটে যাবে। কিন্তু দেশে সড়ক পরিবহন লবি খুব শক্তিশালী। তারা কিছুতেই রেলপথকে লাভজনক হতে দিচ্ছে না। তারপর আছে কৃষকের হাজার হাজার বিঘা জমি কেড়ে নিয়ে জেলায় জেলায় বিমানবন্দর করার আবদার। অথচ রেলব্যবস্থা উন্নত করলে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানের চাহিদা অনেক কমে যাবে।
লালনের সমাধির পাশেই বানানো হয়েছে একটা বেঢপ মিলনায়তন। কুঠিবাড়ির ঢিল ছোড়া দূরত্বে তৈরি হয়েছে গেস্টহাউস। পাশের খোলা চত্বরে গজিয়ে উঠেছে গানবাজনা আর ভাষণ দেওয়ার জন্য একটা মঞ্চ। এসবের কোনো দরকার ছিল না। কার উর্বর মাথা থেকে যে এসব উদ্ভট জিনিস বেরিয়ে আসে!
অবশ্য এসব বেশি দিন সহ্য না-ও করতে হতে পারে। যেভাবে একশ্রেণির সিপাহসালার শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে মাজারের পর মাজার ভাঙছে, লালনের সমাধি কত দিন টেকে বলা মুশকিল। আর রবি ঠাকুর! তাঁকে যে কবে র-এর এজেন্ট আর স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে তাঁর সাধের কুঠিবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়, কে জানে! কিছুদিন আগে ঢাকায় তো তার একপশলা মহড়া হয়ে গেল!
খুলনায় ছিলাম দুই রাত। এক সন্ধ্যায় গেলাম রূপসা নদী দেখতে। এটি বন্দর এলাকা। অনেক কার্গো জাহাজ আশপাশে নোঙর করে আছে। নদীর তীর ঘেঁষে প্লাস্টিকের চেয়ার-টুলে বসে আছেন অনেকেই। কেউ স্থানীয়, কেউ এসেছেন বাইরে থেকে। এখানে প্রায় সবাই আসেন চটপটি-ফুচকা খেতে। তবে জায়গাটি মোটেও পর্যটকবান্ধব নয়। রাস্তা থেকে নদীর তীরে নামতে গিয়ে পা পিছলে আমার তো হাড়গোড় ভাঙার উপক্রম হয়েছিল। অথচ রাস্তার ঢালে তীর ঘেঁষে দশ-বারো হাত খোলা চত্বর রেখে একটা ওয়াকওয়ে বানিয়ে দিলে এটি হয়ে উঠতে পারে সান্ধ্যভ্রমণের একটি চমৎকার স্পট।
রাজশাহী শহরের পাশে পদ্মাপারে ‘টি-বাঁধ’ নামের যে গ্রোয়েনটি তৈরি করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড, সেটি ওই শহরের একটি ফুসফুস বলা যেতে পারে। নগরবাসী বিকেল হলেই সেখানে যান হাওয়া খেতে। সেখানেও আছে অসংখ্য ভেন্ডার। চটপটি-ফুচকা-আইসক্রিমের পসরা সাজিয়ে বসে আছে তারা। রূপসাপারে এমনটি করা যায়।
রাজশাহী শহরটি আসলেই সুন্দর। বাংলাদেশের যেকোনো জেলা শহরের সঙ্গে তুলনা করলেই রাজশাহীর স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়বে। বোঝা যায়, এই শহরের দেখভাল যাঁরা করেছেন, তাঁদের মধ্যে সৌন্দর্যবোধ ছিল। শুধু টাকা ঢাললেই হয় না। রুচি লাগে।
ফিরে আসি রেলভ্রমণে। পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে এই প্রথম রেলযাত্রা। ওদিকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দিয়েও প্রথমবার যাওয়া-আসা। সে এক আশ্চর্য অনুভূতি। আমি হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কথাই ভাবছি। আঠারো শ মিটারের এই সেতু তৈরির কাজ শেষ হয় ১৯১৫ সালে। বানাতে ছয় বছর লেগেছিল। শত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো অটুট। এটিকে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং মনুমেন্ট বলা যেতে পারে।
একসময় কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি-আসামে ট্রেন যেত হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ওপর দিয়ে। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর এই রুট বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ভারত তৈরি করে পদ্মার বুক চিরে ফারাক্কা বাঁধ। এটি শুধু বাঁধ নয়; এটি ফর-ইন-ওয়ান। এর ওপর দিয়ে গেছে সড়ক ও রেললাইন। এখানে তৈরি হয় জলবিদ্যুৎ। সেই সঙ্গে আছে পদ্মা থেকে পানি সরিয়ে নিয়ে ভাগীরথীতে চালান করে দেওয়ার ব্যবস্থা। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে।
আমরা শুকনো মৌসুমে পানি পাই কম, বর্ষায় পাই বেশি। ফারাক্কা বাঁধকে আমরা বলি মরণফাঁদ। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় রাখার জন্য ব্রিটিশ আমলেই এটি নিয়ে চিন্তাভাবনা হয়েছিল। তখন হিন্দুস্তান-পাকিস্তান ছিল না। পরিপ্রেক্ষিত ছিল ভিন্ন। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ভারতমুক্ত করার কারণে এই বাঁধ তৈরি ভারতের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি হয়ে পড়েছিল। এটাকেই বলে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ।
যাহোক, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, যমুনা সেতু আর পদ্মা সেতু বাংলাদেশকে একটি দেশ বানিয়ে দিয়েছে। আগে এ রকম ছিল না। ছিল পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ। ভূগোলে না হলেও আমাদের চিন্তায়। এই সেতুগুলো আমাদের একসূত্রে গেঁথে দিয়েছে। আমরা এখন অনেক কম সময়ে দেশের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় চলে যেতে পারি।
ঢাকা থেকে খুলনা-রাজশাহী-কুষ্টিয়া ঘুরে এসেছি। পুরো সফরই হয়েছে রেলগাড়িতে। এত আরামের যাত্রার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। সারা দেশ যদি ব্রডগেজে মুড়ে দেওয়া যায়, তাহলে রেলযাত্রায় রীতিমতো বিপ্লব ঘটে যাবে।
কিন্তু এখানে একটি সমস্যা আছে। দেশে সড়ক পরিবহন লবি খুব শক্তিশালী। তারা কিছুতেই রেলপথকে লাভজনক হতে দিচ্ছে না। তারপর আছে কৃষকের হাজার হাজার বিঘা জমি কেড়ে নিয়ে জেলায় জেলায় বিমানবন্দর করার আবদার। অথচ রেলব্যবস্থা উন্নত করলে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানের চাহিদা অনেক কমে যাবে।
ইংরেজদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রেই আমরা পেয়েছি রেলপথের সিংহভাগ। এখন প্রয়োজন অনেক ইঞ্জিন, অনেক কোচ, ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, যাত্রীসেবার মান বাড়ানো। জনস্বার্থেই এখানে বিনিয়োগ দরকার।
মহিউদ্দিন আহমদ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
