ইংরেজিতে একটি প্রবাদ রয়েছে—মৃত ঘোটককে নিয়ে কান্নাকাটি করতে নেই। অর্থাৎ অতীতের ভুলের জন্য বেশি অনুতাপ বা আলোচনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অর্থনীতির বেলায় এটি সত্য নয়। এখানে খুঁজে দেখতে হয়, কী কারণে ঘোড়াটি মারা গেল। ভবিষ্যতে যেন এভাবে আর কোনো ঘোড়া না মরে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বেন বারনানকের মূল গবেষণার বিষয় ছিল, সেই কবে ঘটে যাওয়া তিরিশের মহামন্দা। তিনি সেই জ্ঞান ব্যবহার করে ২০০৮–এর বিশ্ব আর্থিক সংকট কাটিয়েছিলেন।
টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ২০০৯-এর ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ বানিয়েছিল। একইভাবে সামনে অর্থনীতির জন্য কী করণীয়, তা বুঝতে হলে প্রথমেই দেখতে হবে কী কারণে এক উদীয়মান ব্যাঘ্র হঠাৎ উচ্চ রক্তচাপ ও ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হলো।
বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য তো বটেই, ম্যাক্রো অর্থনীতিও ভালো বোঝেন। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে আমার দায়িত্ব পালনকালে একাধিকবার তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছে বিভিন্ন ফোরামে। কী কী ভুল নীতিতে অর্থব্যবস্থার ক্ষতি হচ্ছে, তা তিনি তুলে ধরতেন।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে তাঁর পরম অসন্তোষ ছিল। এর মূলে তিনি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে দায়ী করতেন। তিনি দাবি করতেন যে বিএনপি সরকার অর্থ মন্ত্রণালয়ে অবস্থিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বা এফআইডি বিলুপ্ত করেছিল। ২০০৯–এর পর আওয়ামী সরকার তা পুনরুজ্জীবিত করিয়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের মহোৎসব আরও বাড়িয়েছে। তাঁর এই দাবি আজ তাঁর দায়িত্বে পরিণত হলো।
গত দেড় বছরে অর্থনীতির অধিকাংশ সূচক ক্রম-অবনতিশীল হয়ে পড়েছিল। ইউনূস সরকার শেষকালে বিদেশি-স্বার্থরক্ষক নানা চুক্তি করে গেছে। বোঝা যাচ্ছিল যে নতুন সরকার শুরুতেই একটা খাদের মধ্যে পড়বে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন না করেই নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে ইউনূস সরকারের উদ্দীপনা শুরু হয়। এটি ছিল অনাগত সরকারের জন্য একটা ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখার কাজ। দেড় বছরে ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ইউনূস তা মোকাবিলা করতে একটি কমিশন পর্যন্ত গঠন করেননি। বেতন বৃদ্ধির যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। কিন্তু সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্নে হতদরিদ্রের অন্নসংস্থান অনেক বেশি জরুরি।
গত দেড় বছরে একটি জাতীয় দৈনিকের তথ্যমতে, ৩২৭টি কলকারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কাজ হারিয়েছেন দেড় লক্ষাধিক শ্রমিক। ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৬০ হাজারে পৌঁছেছে। ২০২৩ সালের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৯০ হাজার। ২০২৬–এর জানুয়ারি পর্যন্ত আরও কয়েক লাখ বেকার এই কাফেলায় শরিক হয়েছেন। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি কয় দিন আগে এক সেমিনারে বলেছেন যে মুদ্রানীতি কঠোর করায় গত ৬ মাসে ১২ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছেন।
যাঁরা অন্তত চাকরিতে আছেন, তাঁদের বেতন বৃদ্ধি যেমন প্রয়োজন, তার চেয়েও মানবিকভাবে বেশি জরুরি হচ্ছে ইউনূস জমানায় বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো খোলা এবং চাকরি হারানো মানুষগুলোর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তাঁদের পরিবারগুলোর খাবার জোটানো ন্যায্যতার প্রশ্ন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভাতা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। তবে জরুরি অবস্থায় অনেকটা ত্রাণসামগ্রীর মতো ভাতা দিতেই হয়। ৩০ লাখ মানুষ কেন নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়ল, সেটি নিয়ে গবেষণা পরে করা যাবে। তার আগে এই অরক্ষিত গোষ্ঠীর ন্যূনতম খাদ্যসংস্থান ও নতুন করে কাজ হারানো মানুষদের জন্য কিঞ্চিৎ ভাতা–ব্যবস্থাই হবে মানবিক ও ন্যায্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থমন্ত্রীর প্রথম করণীয়।
দ্বিতীয় করণীয় হবে, রাজস্ব বাড়ানোর সর্বাত্মক কর্মসূচি শুরু করা। রাজস্বের বর্ধমান রক্তহীনতাই অর্থনীতিতে বিরাজিত আরও দশটি রোগের কারণ। অর্থ খাতে ইউনূস সরকার কোনো উল্লেখযোগ্য সংস্কারে হাত দেয়নি। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মোতাবেক রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরকে শুধু দুই খণ্ড করে দিয়েই ভেবেছে সংস্কার হয়ে গেল। এতে কুফল বেড়েছে। অর্থমন্ত্রী রাজস্ব আদায়ের জন্য একটি আলাদা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। রাজস্ব প্রদানকে একটি জাতীয় কর্তব্যের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে এর নেতৃত্বে চাই যোগ্য একজন গণপ্রতিনিধি। এই কাজ একজন আমলা বা একাডেমিক দিয়ে সম্ভব নয়।
অর্থমন্ত্রীর তৃতীয় করণীয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে গভর্নরকে একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় ক্ষমতা প্রযুক্ত করা। বিগত জ্ঞানী-গুণী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এই কাজটি করে গেলে স্মরণীয় হয়ে থাকতেন। সদিচ্ছা তাঁর ছিল না। আওয়ামী অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিত তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে এই স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে নানা বাহানা করেছেন। সেই একই রোগ যে ড. সালেহউদ্দিনের বেলায়ও চাড়া দেবে, তা প্রত্যাশিত ছিল না। কারণ, তিনি নিজেও গভর্নর ছিলেন। এই স্বায়ত্তশাসন একই সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ে অবস্থিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অকালপ্রয়াণ ঘটাবে। এই তৃতীয় করণীয়র বেলায় আমরা অর্থমন্ত্রী জনাব চৌধুরীর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারি। কারণ, তিনি অনেক আগে থেকেই এটি বলে আসছেন। তা ছাড়া বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই স্বাধিকারের কথা বলা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর চতুর্থ করণীয় হবে পুঁজিবাজারের পুনরুদ্ধারের একটি কমিশন গঠন করা। ব্যাংক খাতে আজ খেলাপি ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ। এই দুর্ভোগের মূল কারণ শিল্পপতি ও বণিকদের পুঁজি বিকাশে বড় বড় ঋণের উপস্থিতি। এগুলো সংগ্রহ করার কথা ছিল পুঁজিবাজার থেকে। এর গভীরে রয়েছে একটি দুর্বল পুঁজিবাজার এবং এখানকার কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়া। সবল ইকুয়িটি বাজার গড়ে না ওঠার কারণে পুঁজিবাজারের বিপদ চেপেছে ব্যাংকের ওপর। ওদিকে দুর্বল রাজস্বের কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের থাবা পড়েছে ব্যাংকের ওপর। এই দুই রক্তচোষার কবলে পড়ে ব্যাংক খাত ডুবন্ত হয়ে অর্থব্যবস্থার ‘ষোলো আনাই মিছে’ করে দিচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর পঞ্চম করণীয় হবে উন্মাতাল সরকারি ঋণের লাগাম টেনে ধরা, যা একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমানোর কাজটিও নিশ্চিত করবে। এ জন্য এখন থেকেই একটি মিতব্যয়ী বাজেটের খসড়া তৈরি করা আবশ্যক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক উচ্চ সুদহার বেশি দিন বজায় রাখতে পারবে না। মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য একদিকে ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির হার প্রায় সোয়া ৬ ভাগ, যা স্মরণকালের সর্বনিম্ন।
অন্যদিকে অদক্ষ ইউনূস সরকার পরিচালন ব্যয় কমাতে পারেনি। এই অল্প সময়ে সরকারের ঋণ বাড়িয়েছে শতকরা প্রায় ২৬ ভাগ। সরকারি ঋণবৃদ্ধির হার বার্ষিক আনুপাতিক হিসাবে আওয়ামী সরকারের চেয়েও বেশি করেছে মৌখিকভাবে মিতব্যয়ী অন্তর্বর্তী সরকার। এই অপব্যয় না কমালে মূল্যস্ফীতি কমবে না। আওয়ামী সরকারের শেষ ‘দরবেশ যুগ’ ও ইউনূস সরকারের পুরো দেড় বছরের ‘মব যুগ’ অর্থনীতিকে একটা কঠিন জায়গায় ফেলে গেছে সত্য। কিন্তু এই পঞ্চকরণীয় সঠিকভাবে অর্জন করতে পারলে দেড় বছরেই অর্থনীতিকে আবার দাঁড় করানো কঠিন হবে না।
● ড. বিরূপাক্ষ পাল যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ডে অর্থনীতির অধ্যাপক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
