জার্মানির এক অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে অতি ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর ডয়চল্যান্ড (এএফডি) অল্পের জন্য একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তবে এতে স্বস্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সাখসেন-আনহাল্ট রাজ্যে তারা এক বিশাল জয় ঝুলিতে পুরেছে।
কয়েক দশক ধরে অতি ডানপন্থীদের এমন ক্রমাগত উত্থান বিষয়টিকে এতটাই স্বাভাবিক বানিয়ে ফেলেছে যে বিশাল কোনো জয় ছাড়া এখন আর তা সংবাদের শিরোনামই হয় না। কিন্তু যে দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘উগ্র চরমপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই দলের ৪৪ শতাংশ ভোট পাওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। জার্মানির ক্ষুদ্র এক রাজ্যে হলেও এটি ইউরোপীয় গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেতের দিন।
সাখসেন-আনহাল্টে (এবং সার্বিকভাবে জার্মানি) হয়তো সাময়িকভাবে পরিস্থিতি চরম অবনতির হাত থেকে বেঁচে গেছে; কারণ, এএফডি নাৎসি আমলের পর জার্মানির প্রথম উগ্র ডানপন্থী রাজ্য সরকার গঠনের লক্ষ্য সরাসরি পূরণ করতে পারছে না। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনেও যে তাদের ভাগ্যের এমন জোর থাকবে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই।
দুই সপ্তাহ পর মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন রাজ্যের নির্বাচন কিংবা আগামী বছর ফ্রান্সের নির্বাচনে পরিস্থিতি কী হবে, তা-ও নিশ্চিত নয়। কোনো দেশই এখন অতি ডানপন্থার চোখরাঙানি থেকে মুক্ত নয়।
আর তার চেয়েও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, কোনো উগ্র ডানপন্থী দল বা রাজনৈতিক নেতাই এখন আর রাজনৈতিক সাফল্যের দৌড়ে পিছিয়ে নেই (আমেরিকা যার বড় প্রমাণ)। সুতরাং আমাদের বিশ্লেষণ ও কৌশলগুলো এখন নতুন করে সাজানোর সময় এসেছে।
সাখসেন-আনহাল্ট তথা পূর্ব জার্মানির এই চিত্র এক চরম বাস্তবতা হলেও এটি পুরো ইউরোপের সাধারণ প্রবণতাকেই প্রতিফলিত করে। পুরোনো মূলধারার প্রধান দলগুলো ধসে পড়ছে, রাজনীতি খণ্ডিত হয়ে পড়েছে এবং অতি ডানপন্থী দলগুলো দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে।
ফলস্বরূপ জোট সরকার গঠন করা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে; বিশেষ করে যদি অতি ডানপন্থীদের ক্ষমতার বাইরে রাখতে হয়। অনেক দেশ, রাজ্য ও শহরেই চরম ডানপন্থীদের আটকাতে সব গণতান্ত্রিক দলকে বাধ্য হয়ে একসঙ্গে সরকার গড়তে হচ্ছে।
এর ফলে তৈরি হচ্ছে অকার্যকর ও অস্থির জোট সরকার, যা জনগণের রাজনৈতিক অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং দিন শেষে উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থন বাড়াতে সাহায্য করছে।
গণতান্ত্রিক দলগুলো যদি সরকার পরিচালনায় অনুপ্রেরণাদায়ক কোনো ইশতেহার তৈরি করতে না পারে, তবে উদারপন্থীরা একসময় ভোটকেন্দ্রমুখী হওয়া বন্ধ করে দেবে। আর তখন অতি ডানপন্থীরা পুরো জনসংখ্যার সংখ্যালঘু অংশ হয়েও ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাবে।
গত রোববারের এই ফলাফল জার্মানির ‘ব্র্যান্ডমাউয়ার’ নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও উসকে দেবে। এই নীতি অনুযায়ী, মূলধারার দলগুলো এএফডির সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোটে যায় না। বলতে গেলে পুরো ইউরোপের মধ্যে জার্মানিই এখন অন্যতম ব্যতিক্রম, যারা অতি ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে এমন রাজনৈতিক বর্জন বজায় রেখেছে।
অন্যদিকে ইতালি থেকে সুইডেন—ইউরোপের প্রায় সর্বত্রই অতি ডানপন্থী দলগুলোকে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে এবং মূলধারার রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়েছে।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, ডানপন্থী দলগুলো এই উগ্রপন্থীদের সঙ্গে জোট বাঁধার সময় দাবি করে যে এরা নাকি এখন অনেক ‘নরম’ বা ‘রক্ষণশীল’ হয়েছে। যদিও এ দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, তবু সাধারণ ভোটার, দলীয় কর্মী ও গণমাধ্যমের একাংশের কাছে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে জার্মানির ক্ষেত্রে এই অজুহাত দাঁড় করানো প্রায় অসম্ভব। ইউরোপের সবচেয়ে চরমপন্থী দলগুলোর অন্যতম এএফডি, আর সাখসেন-আনহাল্টসহ যেসব অঞ্চলে এরা বেশি সফল, সেগুলো এএফডির সবচেয়ে উগ্র শাখা হিসেবে পরিচিত। অবশ্য এতেও কিছু ডানপন্থী রাজনীতিক থেমে থাকছেন না; তাঁরা দাবি করছেন যে বামপন্থীদের চেয়ে এএফডি কম ক্ষতিকর।
এমনকি আশঙ্কা করা হচ্ছে, সাখসেন-আনহাল্টে এএফডিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিতে কনজারভেটিভ সিডিইউ পার্টির কয়েকজন আইনপ্রণেতা দল পরিবর্তনও করতে পারেন। রাজনীতির অন্য মেরুতে এএফডিকে নিষিদ্ধ করার দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। আইনিভাবে এটি সম্ভব হলেও সাখসেন-আনহাল্টের বাইরেও এটি এক বিশাল গণ–অসন্তোষের জন্ম দিতে পারে।
দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিই মূল সমস্যাটিকে খুব সংকীর্ণভাবে দেখে। ব্র্যান্ডমাউয়ার বজায় রাখার পেছনের মূল ধারণাটি হলো—একমাত্র বা মূল সমস্যাটি ব্যবস্থার বাইরে অবস্থান করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মূল রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি নিজেই ভেঙে পড়ছে।
এটা সত্য যে এএফডি (এবং সামগ্রিকভাবে অতি ডানপন্থা) উদার গণতন্ত্রের জন্য এক অস্তিত্ব সংকট, কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও সত্যি যে দেশের এক বিশাল ও ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠী মনে করে, মূলধারার নেতারা আর তাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন না। বহু মানুষ এখনো গণতন্ত্র রক্ষা করতে ভোট দিচ্ছেন ঠিকই, তবে তা কোনো দলের পক্ষে নয়, বরং নির্দিষ্ট একটি দলকে আটকানোর জন্য।
পরিস্থিতি আরও শোচনীয়; কারণ, মূলধারার অধিকাংশ রাজনীতিক মেনে নিয়েছেন যে তাঁরা জনগণের কাছে অজনপ্রিয়। তাই তাঁরা নিজেদের ‘কম ক্ষতিকর’ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং অতি ডানপন্থীদের বিরুদ্ধে মানুষকে ভোট দিতে উৎসাহিত করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। শেষ পর্যন্ত এই কৌশল টেকসই হতে পারে না।
গণতান্ত্রিক দলগুলো যদি সরকার পরিচালনায় অনুপ্রেরণাদায়ক কোনো ইশতেহার তৈরি করতে না পারে, তবে উদারপন্থীরা একসময় ভোটকেন্দ্রমুখী হওয়া বন্ধ করে দেবে। আর তখন অতি ডানপন্থীরা পুরো জনসংখ্যার সংখ্যালঘু অংশ হয়েও ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাবে।
এমন ইশতেহার তৈরির জন্য রাজনীতিক, গণমাধ্যম ও ভোটার—সব পক্ষকেই বাস্তবমুখী হতে হবে। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় বড় অতি ডানপন্থী দলের উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে কোনো একক দলের পক্ষে তাদের পছন্দসই নীতি শতভাগ বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।
সোশাল ডেমোক্র্যাট, ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট কিংবা গ্রিন পার্টি—কারোরই নিজস্ব একক এজেন্ডা বাস্তবায়নের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।
তবে এই মুহূর্তে সেটি মূল চিন্তার বিষয় হওয়াও উচিত নয়। অতি ডানপন্থীরা যখন একা বা জোটের প্রধান শক্তি হিসেবে সরকার গঠনের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগতভাবে উদার গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে সব গণতান্ত্রিক দল একমত হতে পারে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিকদের উপলব্ধি করতে হবে যে আজকের মূল লড়াইটি ক্ষমতা বা দলীয় স্বার্থের জন্য নয়, বরং গণতন্ত্র রক্ষার জন্য। এর জন্য একদিকে যেমন অতি ডানপন্থার বিরুদ্ধে লড়তে হবে, অন্যদিকে তেমনি গণতন্ত্রকে ভেতরে থেকে শক্ত করতে হবে।
এর মানে শুধু বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করা, সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা সমাজে অন্তর্ভুক্তি ও সহনশীলতা বৃদ্ধি করা নয়। এর অর্থ হলো উগ্র ডানপন্থীদের ভোট না দেওয়া অধিকাংশ ভোটারের নানা উদ্বেগ ও চাহিদার কথা শোনা।
অর্থাৎ মূলধারার রাজনীতিকদের কেবল অপরাধ ও অভিবাসন নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না; আবাসন সংকট নিরসন, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এবং ইউরোপীয় সংহতি জোরদার করার মতো বিষয়গুলোতেও নজর দিতে হবে; পাশাপাশি এই মুহূর্তে বা অদূর ভবিষ্যতে নিজের সব দাবি পূরণ হবে না—এ বাস্তবতাকে মেনে নিতে হবে।
অবশ্য অনেক দেশেই সাখসেন-আনহাল্টের মতো অতি ডানপন্থীরা সরকার গঠনের এত কাছাকাছি পৌঁছায়নি। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে ২০২১ সালের নির্বাচনে এই রাজ্যে এএফডির ভোট ছিল ‘মাত্র’ ২০ শতাংশ, যেখানে এখন পুরো ইউরোপে অতি ডানপন্থীদের গড় সমর্থন প্রায় ২৫ শতাংশ।
সহজ কথায়, হাতে আর বেশি সময় নেই। হাঙ্গেরি বা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে তাকালে বোঝা যায়, অতি ডানপন্থীরা একবার ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইটা কত কঠিন ও অসম হয়ে পড়ে।
অতএব গণতান্ত্রিক রাজনীতিকদের উপলব্ধি করতে হবে যে আজকের মূল লড়াইটি ক্ষমতা বা দলীয় স্বার্থের জন্য নয়, বরং গণতন্ত্র রক্ষার জন্য। এর জন্য একদিকে যেমন অতি ডানপন্থার বিরুদ্ধে লড়তে হবে, অন্যদিকে তেমনি গণতন্ত্রকে ভেতরে থেকে শক্ত করতে হবে।
অতি ডানপন্থীদের নিষিদ্ধ করে কিংবা তাদের স্বাভাবিকীকরণ করে—কোনোভাবেই এই লক্ষ্য অর্জিত হবে না। ভয় দেখিয়ে বা বিচ্ছিন্ন রেখে গণতন্ত্রকে রক্ষা করা যায় না।
এর জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক নেতা, সাধারণ নাগরিক এবং সাংবাদিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা; যেখানে সবাইকে প্রদর্শন করতে হবে বাস্তবতা, সংযম ও দৃঢ়তা। আর সেই লড়াইয়ের সঠিক সময় এখনই।
ক্যাস মুডে জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।