চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত স্লোগান ছিল সম্ভবত ‘ভুয়া, ভুয়া, ভুয়া...’। অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে ছাত্র-তরুণেরা যতবার রাস্তায় নেমেছেন, ততবারই তাঁদের কণ্ঠে ‘ভুয়া ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান শোনা গেছে।
আপাত অর্থে অর্থহীন বলে মনে হলেও বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, তার বিরুদ্ধে কিশোর-তরুণদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এ স্লোগান। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ আর রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এ দেশের মানুষ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রতি রাজনীতিবিদদের চূড়ান্ত অবজ্ঞা শেষ পর্যন্ত সামরিক–বেসামরিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্ম দেয়। এই কর্তৃত্ববাদী ধারার রাজনীতির সর্বোচ্চ চূড়া আমরা দেখেছি হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরে।
রাষ্ট্র ও সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠলে তার সবচেয়ে বড় শিকার হতে হয় ছাত্র-তরুণদেরই। কেননা কর্তৃত্ববাদী শাসনের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে স্বজনতোষী অর্থনীতি। এখানে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের শক্তিশালী নেক্সাস গড়ে ওঠে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের হাতেই দেশের মোট সম্পদের বিপুল অংশ কেন্দ্রীভূত হয়।
উন্নয়নশীল দেশে ছোট একটি গোষ্ঠীর হাতে বিপুল সম্পত্তির কেন্দ্রীভবন মানেই সম্পদের পাচার। ফলে একদিকে যেমন ব্যাংক, শেয়ারবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার শূন্য হতে থাকে, অন্যদিকে কাজ হারানো কিংবা কম টাকায় কাজ করতে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
চব্বিশের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল শিক্ষিত তরুণদের অপেক্ষাকৃত সুবিধাবাদী বা অগ্রসর অংশের সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ঘিরে। কিন্তু যত দিন গড়িয়েছে, ততই এ কোটা সংস্কার আন্দোলনে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ভিড় বেড়েছিল। একপর্যায়ে এটা জনগোষ্ঠীর বৈষম্যমুক্তির আন্দোলন এবং গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা থাকা না–থাকার বিষয়টি অনেক বেশি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট। কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী কিংবা শ্রমজীবী তরুণ বা বেকার তরুণদের যে বিপুল মাত্রায় অংশগ্রহণ ছিল, তার মূল কারণটাই ছিল তাঁদের বর্তমান অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।
ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার বহন করা দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের বঞ্চনা ও ক্ষোভ যে কতটা অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ভারতের দিল্লির তরুণদের আন্দোলনই তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। ফলে তরুণদের নাগরিক মর্যাদা, অধিকার ও শোভন কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া শাসকদের উন্নয়নের কোনো গল্পই বিশ্বাসযোগ্য হবে না।
জনমিতির হিস্যায় বাংলাদেশে তরুণদের অংশই সবচেয়ে বেশি। ২০২২ সালের জনশুমারির তথ্য বলছে, ১৫-২৯ বছর বয়সী তরুণের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৫৯ লাখ। এর অর্থ হচ্ছে, প্রায় ২৮ শতাংশই তরুণ। এই তরুণ জনগোষ্ঠী যেকোনো দেশের জন্য বিরাট এক আশীর্বাদ হয়ে আসে।
তবে বাস্তবতা বলছে, আমাদের তরুণেরা ২০-২৫ লাখ টাকায় ‘বডি কন্ট্রাক্টে’ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মরছেন, ইউক্রেনের ড্রোনের আঘাতে একের পর এক তরুণ মারা যাচ্ছেন, অফিস সহকারী পদে চাকরির জন্য বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার কিংবা এমবিএরা প্রতিযোগিতা করছেন।
প্রতিবছর শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন ২২-২৩ লাখ তরুণ। এর মধ্যে দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে বড়জোর ১২-১৩ লাখ তরুণের। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৩ লাখ তরুণের চলনসই বেতনে চাকরি হয়। বাকি তরুণদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে দুর্দশা, হতাশা, বেকারত্ব আর কম আয়ে জীবন চালানোর সংগ্রাম।
প্রতিবছর ৮-৯ লাখ তরুণকে কাজের খোঁজে বিদেশে পাড়ি দিতে হয়। বৈধ পথে যাঁরা যেতে পারেন, তাঁরা ভাগ্যবান। বড় একটি অংশকে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে দালাল ধরে বিদেশে যেতে হয়। অবৈধ পথে যাওয়ায় তাঁদের অনেকে ক্রীতদাসের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হন। দেশ ছাড়তে মরিয়া মধ্যবিত্তরাও। বিদেশে শিক্ষার জন্য ব্যয় আর উচ্চশিক্ষার বাজেট এখন প্রায় সমান।
দেশে কাজের সুযোগ কতটা নাজুক, সম্প্রতি প্রথম আলোয় প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন থেকে তার একটা পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়। প্রথম খবরটি পাবনার। খবরটি বলছে, গত বছরের ২৫ অক্টোবর অফিস সহায়কের ১৮টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। জাতীয় বেতন স্কেলে এই পদ ২০তম গ্রেডের। আগে পদটির নাম ছিল এমএলএসএস এবং যোগ্যতা ছিল অষ্টম শ্রেণি পাস, পদটি পিয়ন পদ হিসেবে পরিচিত। চাকরিপ্রার্থীদের কেউ বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার, কেউবা এমবিএ কিংবা অন্যান্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাস। এই পদে যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ১৭ জনই উচ্চশিক্ষিত।
দ্বিতীয় খবরটি হচ্ছে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের তৃতীয় শ্রেণি পদে চাকরির জন্য আবেদন করেছেন ১২ লাখ ৩৪ হাজার ৪০৯ জন। নেওয়া হবে ৩১২ জনকে। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে লড়বেন ৩ হাজার ৯৫৬ জন। জাতীয় বেতনকাঠামোর ১৬তম গ্রেডের এই পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি হলেও অধিকাংশ আবেদনকারী স্নাতক অথবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।
প্রশ্ন হচ্ছে, অফিস সহায়ক কিংবা পিয়ন কিংবা তৃতীয় শ্রেণির চাকরির জন্য উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা কেন এত মরিয়া? সরকারি চাকরি মানেই নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা—উত্তর হিসেবে এটা আংশিক সত্য। বাকি সত্যিটা হলো দেশে কাজের সুযোগ ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে বৈষম্যমুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ছাত্র-তরুণেরা জীবন বাজি রেখে গুলির সামনে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তরুণদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই নতুনভাবে দেশকে গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নভাবনা ও নীতিনির্ধারণে তরুণেরা কোথায়? অভ্যুত্থানের পর দুটি বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।
বাজেটে তরুণদের জীবনমান পরিবর্তনে তাঁদের জন্য কাজের সুযোগ, সম্মানজনক চাকরি তৈরি করার নীতি কতটা প্রতিফলিত হয়েছে? অন্তর্বর্তী আমলে কাজের সুযোগ বাড়েনি; বরং শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ায় নতুন করে কাজ হারিয়েছেন অসংখ্য মানুষ। বিএনপি সরকার বন্ধ কারখানা খুলতে প্রণোদনা দেওয়াসহ কর্মসংস্থানের জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেটা বিপুল যে চাহিদা, তার বিপরীতে কি যথেষ্ট?
ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার বহন করা দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণদের বঞ্চনা ও ক্ষোভ যে কতটা অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ভারতের দিল্লির তরুণদের আন্দোলনই তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। ফলে তরুণদের নাগরিক মর্যাদা, অধিকার ও শোভন কাজের সুযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া শাসকদের উন্নয়নের কোনো গল্পই বিশ্বাসযোগ্য হবে না।
পিয়ন বা অফিস সহকারীর চাকরির জন্য উচ্চশিক্ষিত তরুণদের লড়াই বলে দিচ্ছে শাসকদের সামনে পথ একটিই। শাসনব্যবস্থা আর অর্থনীতিতে গণতন্ত্র আনা।
মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
মতামত লেখকের নিজস্ব