মমতা তো নেই, তিস্তায় বাংলাদেশ ন্যায্য হিস্যা কি পাবে

ভারতের পানি প্রত্যাহারে শুকনো মৌসুমে তিস্তা নদীফাইল ছবি

তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তির প্রতিশ্রুতি কে না দিয়েছেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ তাঁদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রসচিব—সবাই তিস্তার পানিচুক্তি হবে মর্মে আশ্বস্ত করেছেন। নরেন্দ্র মোদি অনেকবারই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বাধা ছিল পাশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিও পরিস্থিতির কারণে আশ্বাস দেননি তা নয়।

যাহোক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর মুখ্যমন্ত্রী নেই। ফলে সেই অজুহাত আর ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার যে দলীয়, সেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবার কি তবে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তিতে সম্মত হবেন? নাকি মমতার পথে হাঁটবে বিজেপি সরকার?

২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি এবং ছিটমহল বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল এদিনে। ভারতের কংগ্রেস–দলীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এই চুক্তির জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। আসার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও। দুই দেশের চুক্তিবিষয়ক সব আয়োজন সম্পন্ন। মনমোহন সিংকে আগেই বরণ করেছিল ঢাকা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঢাকা বরণ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।

তিস্তায় ন্যায্য হিস্যার পানিতে চুক্তি হলে বাংলাদেশ কেবল পানি পাবে, তিস্তা বাঁচবে—বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং দুই দেশের দূরত্ব কমতে পারে অনেকটাই।

অতি অকস্মাৎ খবর পাওয়া গেল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঢাকা আসছেন না। এমনকি তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তিস্তা পানিবণ্টন এবং ছিটমহল বিনিময় চুক্তিতে তাঁর দ্বিমত আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের যদি দ্বিমত থাকে, তাহলে আগেই জানাতে পারতেন। কিন্তু তা জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। মনমোহন সিং এ নিয়ে কোনো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাননি। বাংলাদেশের পক্ষেও জোরালো কোনো প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হয়নি। নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ছিটমহল বিনিময় চুক্তি হলেও তিস্তাচুক্তি ঝুলেই আছে।

১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিস্তায় অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি ছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী তিস্তার পানির ৩৯ শতাংশ ছিল ভারতের, বাংলাদেশের ছিল ৩৬ শতাংশ এবং বাকি ২৫ শতাংশ ছিল নদীর জন্য। ২০১১ সালে নতুন করে তিস্তা চুক্তির উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এর মাত্র তিন বছরের মাথায় ২০১৪ সালে আমরা দেখলাম ভারত তিস্তার পানি একতরফা প্রত্যাহার করতে শুরু করল।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় ২০১৪ সালে প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হচ্ছিল এই পানিতে। হঠাৎ পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেচ প্রকল্পের আওতায় থাকা জমি ফেটে চৌচির হতে থাকে। কৃষকের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। রোপণ করা ধান ঘরে তুলতে পারেননি কৃষকেরা। আমরা অনেকে এই ক্ষতিপূরণ চেয়েছিলাম। সরকার ছিল চুপচাপ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এই পানি আগ্রাসী কাজের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষে কোনো প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। বরং বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাসদসহ অনেক রাজনৈতিক দল ব্যারাজ পর্যন্ত লংমার্চ করেছে।

১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন অনুযায়ী উজানের দেশ ভাটির দেশকে না জানিয়ে পানি প্রত্যাহার দূরের কথা, নদীর পানিতে এমন কোনো কাজই করতে পারে না যে কারণে ভাটির দেশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি উজানের দেশ আন্তসীমান্ত যেকোনো নদীর পানিতে লাভজনক কিছু করলে ভাটির দেশ সেই লাভের অংশীদার হবে।

আরও পড়ুন

ভারত-বাংলাদেশ কোনো দেশ এই কনভেনশনে অনুসমর্থন করেনি। ভারত করতে চায় না। কারণ, এতে পানিনীতি একতরফা হতে পারবে না। আর বাংলাদেশ এটাতে স্বাক্ষর করে না—কারণ, ভারত এতে ক্ষুণ্ন হতে পারে। ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন ২০১৪ সালে ভিয়েতনাম ৩৫তম দেশ হিসেবে অনুসমর্থন করার পর কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ এখন চাইলেই অনুসমর্থন করে ভারতের পানি প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাইতে পারে।

তিস্তার পানি একতরফা প্রত্যাহার করার কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের যথেষ্ট অবনমন হয়েছে। তিস্তার পানি প্রত্যাহার করার মাধ্যমে সেচকাজে ভারতের যেটুকু লাভ হয়, সম্পর্কের অবনমন সেই তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। বরং তিস্তা ইস্যুতে উভয় দেশ লাভবান হতে পারত।

তিস্তা নদীতে বাংলাদেশ সরকার নিজেদের অংশে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। ভারত যদি একতরফা পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে, তাহলেও বাংলাদেশকে নিজ দেশীয় ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। পানি পাওয়া না–পাওয়ার সঙ্গে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার উপায় নেই।

তবে নদীকে বাঁচিয়ে রাখতে সেখানে পানির প্রবাহ সচল রাখা চাই। সেই প্রবাহ যতটা প্রাকৃতিক হবে, ততটাই ভালো। তিস্তায় ন্যায্য হিস্যার পানিতে চুক্তি হলে বাংলাদেশ কেবল পানি পাবে, তিস্তা বাঁচবে—বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং দুই দেশের দূরত্ব কমতে পারে অনেকটাই।

বিজেপি এখন প্রাদেশিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ এবং কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল। ফলে কেন্দ্রের সঙ্গে প্রদেশের আর দ্বিমত হওয়ার সুযোগ নেই। আমরা যদি দেখি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হচ্ছে, তাহলে বুঝব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কারণে তিস্তা চুক্তি হয়নি। আর যদি দেখি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরে যাওয়ার পরও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হচ্ছে না, তাহলে বুঝতে হবে মুখ্যমন্ত্রী মমতার নাম ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র। বাংলাদেশকে ভারত কী চোখে দেখে, তা বোঝা যাবে তিস্তার পানিচুক্তি হওয়া না–হওয়ার ঘটনায়।

  • তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক