এবারের বিশ্বকাপে ফুটবল যেভাবে ‘পলিবলে’ রূপ নিল

যুক্তরাষ্ট্রের বালোগানকে লাল কার্ড দেখান রেফারি। এ ঘটনায় পরবর্তীতে যা ঘটল তা আগে দেখা যায়নি।এএফপি

গ্রুপ পর্ব ও শেষ ষোলোর মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ নীরবে ফুটবল টুর্নামেন্টের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সূচিতে এখনো লেখা থাকে ফুটবল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাজুড়ে এখন যা চলছে, সেটির জন্য মনে হয় নতুন একটি নাম দরকার। নামটি হতে পারে ‘পলিবল’।

পলিবল একধরনের সংকর খেলা। মাঠে ২২ জন ফুটবলার বল দখলের লড়াই করেন; মাঠের বাইরে প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত, ফেডারেশন কর্মকর্তা ও ক্রীড়া প্রশাসকেরা লড়াই করেন বাকি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। এখানে শেষ বাঁশি খুব কম কিছুরই নিষ্পত্তি করে। আসল সিদ্ধান্ত হয় টেলিফোন লাইনে, ভিসার সারিতে, বন্ধ দরজার বৈঠকে এবং ক্ষমতাবানদের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

ন্যায্যতার খাতিরে বলা দরকার, টুর্নামেন্টটি শুরু হয়েছিল বেশ ভালোভাবেই। প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের বিশ্বকাপ। অঘটন ছিল, গোল ছিল, আবেগ ছিল। প্রথম তিন সপ্তাহে এমন এক অস্বাভাবিকভাবে অরাজনৈতিক আবহও ছিল, যা এই স্বাগতিক বাস্তবতায় অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। কিন্তু তারপর এল সেই লাল কার্ড, যা শুধু একটি ম্যাচ নয়, পুরো টুর্নামেন্টের চরিত্র বদলে দিল।

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগান, দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে জয়ের ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন। নিয়ম অনুযায়ী তাঁর এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা হওয়ার কথা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এ রকম নিষেধাজ্ঞা বহু দলের স্বপ্ন থামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার যা ঘটল, তা আগে দেখা যায়নি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করলেন। অনুরোধ করলেন নিষেধাজ্ঞাটি পুনর্বিবেচনার। এরপর ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি নিজেদের বিধির খুব কম ব্যবহৃত একটি ধারা প্রয়োগ করে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করল। বালোগান বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামলেন। প্রেসিডেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিফাকে ধন্যবাদ জানালেন ‘একটি বড় অন্যায় সংশোধনের’ জন্য। সাংবাদিকদের তিনি আবার আশ্বস্ত করলেন, ইনফান্তিনোকে তিনি কী করতে হবে তা বলেননি; শুধু কী ভাবছেন, সেটিই জানিয়েছেন। পলিবলে অবশ্য এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান খুব সামান্য।

আরও পড়ুন

প্রতিক্রিয়া আসতে দেরি হয়নি। রয়্যাল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন নিজেদের ‘স্তম্ভিত’ বলে জানাল এবং ‘নৈতিকতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার মৌলিক নীতি’ রক্ষার ঘোষণা দিল। বেলজিয়ামের কোচ রায়টিকে তিন মাস দেরিতে আসা এপ্রিল ফুলের কৌতুকের সঙ্গে তুলনা করলেন। এরপর যা হওয়ার ছিল, তা-ই হলো। ফ্রান্স একটি হলুদ কার্ডের বিরুদ্ধে আপিল করল। ইংল্যান্ড একটি লাল কার্ড নিয়ে প্রকাশ্যে ভাবতে শুরু করল। নকআউট পর্বে থাকা প্রতিটি ফেডারেশন বুঝে গেল, ফিফার শৃঙ্খলাবিধির ভেতরে এত দিন অজানা একটি আপিল কক্ষ আছে—ওভাল অফিস।

পলিবলের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক এখানেই। এটি এমনকি যুক্তিসংগত রেফারিং সিদ্ধান্তকেও সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয়। আটলান্টায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মিসরের শেষ ষোলোর ম্যাচটি তারই উদাহরণ। মিসর ১-০ গোলে এগিয়ে। ঐতিহাসিক অঘটনের স্বপ্ন তখন খুব দূরে নয়। এমন সময় তাদের দ্বিতীয় গোলটি বাতিল হয়। ভিএআরে দেখা গেল, গোলের পাল্টা আক্রমণ শুরুর অনেক আগে একটি ফাউল হয়েছিল। খেলার আইনের ভাষায় সিদ্ধান্তটি ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু অনেক বিশ্লেষকের মত হচ্ছে, প্রযুক্তির উদ্দেশ্যকে এখানে ভিন্ন স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা দেরিতে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ গোলে জিতেছে। মিসর কোচ হোসাম হাসান বলেন, তাঁর দলকে ‘অন্যায়ভাবে প্রতারিত’ করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, টুর্নামেন্ট কি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের, বিশেষ করে লিওনেল মেসিকে ধরে রাখতে চেয়েছিল? এক মাস আগে এমন অভিযোগকে হয়তো পরাজিত কোচের ক্ষোভ বলা যেত। কিন্তু বালোগানের ঘটনার পর সেটি অস্বস্তিকরভাবে একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যার মতো শোনায়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আসল ক্ষতি এখানেই: এটি কোনো এক ম্যাচের ফল বদলায় কি না, তার চেয়েও বড় কথা, এটি টুর্নামেন্টের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট করে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও ফিফা সভাপতির উষ্ণ সম্পর্কও নতুন নয়। ইনফান্তিনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে ছিলেন, তাঁর কূটনৈতিক আয়োজনগুলোতেও দেখা গেছে তাঁকে। ডিসেম্বর মাসে তিনি ট্রাম্পকে ফিফার প্রথম শান্তি পুরস্কারও দেন—একটি পুরস্কার, যার জন্ম নিয়ে সমালোচকেরা কম কৌতুক করেননি। এসবের কোনোটিই সরাসরি নিয়মভঙ্গ নয়।

কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান যখন স্বাগতিক দেশের রাজনৈতিক প্রধানের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখেন এবং এরপর শৃঙ্খলাজনিত এক ‘অলৌকিক’ সিদ্ধান্ত স্বাগতিক দলের তারকা খেলোয়াড়ের পক্ষে যায়, তখন নিরপেক্ষতা আর প্রমাণের বিষয় থাকে না; তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসের বিষয়। অথচ বিশ্বকাপের ওপর সেই বিশ্বাসের জন্যই স্পনসররা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো
ফেসবুক

বালোগান-কাণ্ড যদি পলিবলের ব্যঙ্গাত্মক অধ্যায় হয়, তবে ইরানের বিশ্বকাপযাত্রা তার গম্ভীর অধ্যায়। টিম মেলি এসেছে এমন একটি দেশ থেকে, যে দেশ সম্প্রতি এক স্বাগতিক দেশের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে। খেলোয়াড়েরা নিজ দেশে নিহত বেসামরিক মানুষদের স্মরণে পিন পরে মাঠে নেমেছেন। তাদের অনুশীলন ঘাঁটি অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে নিতে হয়েছে। ফেডারেশনের মহাসচিব, সহসভাপতিসহ ১৪ জন ব্যাকরুম কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি বলে জানা গেছে। ইরানি ফেডারেশন একে বলেছে, ‘খেলায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সবচেয়ে খারাপ রূপ।’

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু ঘটনা। ইরানি সমর্থকদের জন্য বরাদ্দ টিকিট ম্যাচের কয়েক দিন আগে বাতিল করা হয়েছে। ইরানি ও আফ্রিকান সাংবাদিকেরা নিজেদের দল কাভার করার জন্য ভিসা পেতে সমস্যায় পড়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাংবাদিক সংগঠন এ নিয়ে খোলাচিঠি দিয়েছে। স্টেডিয়ামে অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতিও নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে ‘বক্সে ডিফেন্সিভ উপস্থিতি’ কথাটি যেন এক নতুন, অনিচ্ছাকৃত অর্থ পেয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট মার্চ মাসেই বলেছিলেন, ইরানের অংশগ্রহণ ‘উপযুক্ত’ হবে না। ইরানের জবাব ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ: কেউ তাদের খেলতে বাধা দিতে পারে না। এটাই হয়তো ছিল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে নীরব অথচ শক্তিশালী প্রতিবাদ।

আরও পড়ুন

এখানেও ভারসাম্যের স্বার্থে স্বীকার করতে হবে, ইরানের খেলোয়াড়েরা শেষ পর্যন্ত ভিসা পেয়েছেন। দলটি সব ম্যাচ খেলেছে। ফিফাও শুরু থেকে বলেছে, ইরান অংশ নেবে। এ কৃতিত্ব টুর্নামেন্টকে দিতেই হবে। কিন্তু সমতল মাঠ শুধু নিয়মমাফিক কাটা ঘাসের পিচ নয়। এক দল যদি যুদ্ধ, ভিসা-জটিলতা ও শূন্য বরাদ্দ আসনের বাস্তবতায় প্রস্তুতি নেয় আর আরেক দল যদি শৃঙ্খলাজনিত বিষয়ে প্রেসিডেনশিয়াল সহায়তা পায়, তাহলে ক্রীড়াগত সমতার দাবি খুব দুর্বল হয়ে পড়ে।

রাজনীতি অবশ্য বিশ্বকাপে নতুন অতিথি নয়। ১৯৩৪ সালেই মুসোলিনি বিশ্বকাপকে নিজের রাজনৈতিক প্রদর্শনীতে পরিণত করেছিলেন। এরপরও নানা সময়ে বিশ্বকাপের গায়ে রাজনীতির ছায়া পড়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের পলিবলকে আলাদা করে এর প্রকাশ্যতা। আগের দিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ অন্তত লুকিয়ে থাকার ভদ্রতা রক্ষা করত। এবার তা সংবাদ সম্মেলন, ফোনকল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের মাধ্যমে ঘটছে।

তাহলে করণীয় কী? উত্তরটি নতুন নয়। ফিফার ২০১৫ সালের কেলেঙ্কারির পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের করাপশন ইন স্পোর্টস ইনিশিয়েটিভ যে কথা বলেছিল, সেটিই এখন আবার প্রাসঙ্গিক: স্বচ্ছতা হচ্ছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরক্ষা আর শিক্ষা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সেই যুক্তি থেকে বর্তমান বিশ্বকাপের জন্য অন্তত পাঁচটি প্রস্তাব করা যায়।

আরও পড়ুন

প্রথমত, ফিফার শৃঙ্খলা সংস্থাগুলোকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করতে হবে। বিচারিক কমিটিগুলোকে সভাপতির প্রভাব থেকে কাঠামোগতভাবে আলাদা রাখতে হবে। কোনো ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত হলে তার লিখিত যুক্তি প্রকাশ করতে হবে। কারণ, ব্যাখ্যা ছাড়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার রায় নয়, সেটি অনুগ্রহ।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি প্রকাশ্য নিবন্ধন থাকতে হবে। মাঠের ঘটনা, রেফারিং বা শৃঙ্খলাজনিত বিষয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের সঙ্গে ফিফা নেতৃত্বের যেকোনো যোগাযোগ কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশ করা উচিত। নইলে স্বচ্ছতার কথা কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়।

তৃতীয়ত, স্বাগতিক দেশের নিশ্চয়তা কার্যকর ও বাধ্যতামূলক করতে হবে। অংশগ্রহণকারী সব দেশের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও টিকিটধারী সমর্থকদের ভিসা ও প্রবেশাধিকার স্বাগতিক হওয়ার শর্তের অংশ হতে হবে। এটি কোনো নির্বাচিত সৌজন্য নয়; এটি টুর্নামেন্টের ন্যায্যতার ভিত্তি।

চতুর্থত, অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য সমান আচরণের নিরীক্ষা দরকার। স্বাধীন সততা ইউনিট টুর্নামেন্ট চলাকালেই মূল্যায়ন করবে, সব ফেডারেশন প্রস্তুতি, চলাচল ও সহায়তার ক্ষেত্রে তুলনাযোগ্য সুযোগ পাচ্ছে কি না। এ প্রতিবেদন ফাইনালের পর স্মৃতিকথায় নয়, ফাইনালের আগেই প্রকাশিত হওয়া উচিত।

পঞ্চমত, সততা শিক্ষা শুধু খেলোয়াড় ও রেফারিদের জন্য যথেষ্ট নয়। ক্রীড়া দুর্নীতিবিরোধী প্রশিক্ষণ এত দিন মূলত মাঠের মানুষদের লক্ষ্য করে হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিয়েছে, পাঠ্যক্রমটি আরও ওপরে তুলতে হবে—ফেডারেশনের প্রধান, ক্রীড়া প্রশাসক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের কাছেও।

২০২৬ বিশ্বকাপ অবশ্য ফুটবলের জন্যই স্মরণীয় থাকবে। গোলগুলো বাস্তব ছিল। আবেগও বাস্তব ছিল। কিন্তু কিছু নিষেধাজ্ঞা যে দর-কষাকষির বিষয় হয়ে উঠেছিল, সেটিও বাস্তব। তাই এ বিশ্বকাপকে আরও একটি কারণে মনে রাখা জরুরি: এটি পলিবলকে অস্বীকার করা অসম্ভব করে তুলেছে। আর যে সমস্যাকে অস্বীকার করা যায় না, তাকে সংস্কারও করা যায়।

ফিফা আগে বাইরের সুপারিশ গ্রহণ করেছে। ২০১৫ সালের পর নিজেদের সংস্কারপ্রক্রিয়ায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রস্তাব থেকেও শিখেছে। এবারও পারে। তার আগপর্যন্ত দর্শকদের দুই সেট নিয়ম পড়া ভালো; খেলার আইন এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার আইন। পলিবলে দেখা যাচ্ছে, নিয়মিতভাবে প্রয়োগ হয় কেবল দ্বিতীয়টিই।

  • রিজওয়ান-উল-আলম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক