ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি যে কারণে অবাস্তব নয়

অর্থনীতিকে গতিশীল করতে প্রতিবছর অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার মানসম্পন্ন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।গ্রাফিক্স: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

কয়েক দিন আগের কথা। বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক ও ভয়েস ফর রিফর্ম আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য রেখেছিলেন এই কলামের সহলেখক জ্যোতি রাহমান।

মূল নিবন্ধে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারে। একই আলোচনায় অধ্যাপক রাশেদ আল তিতুমীর তাঁর নিবন্ধে ২০৩৪ সালের কথা উল্লেখ করেন। তিনি এ বিষয়ে ২০২৩ সালে প্রকাশিত তাঁর একটি গ্রন্থেও লিখেছিলেন।

সম্প্রতি ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা নতুন করে জোরালো হয়েছে। এর প্রধান কারণ বিএনপি তাদের নির্বাচনী পরিকল্পনায় ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ট্রল হচ্ছে।

তবে যাঁরা অর্থনীতি নিয়ে ভাবেন, তাঁদের কাছে বিষয়টি দলীয় বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দল–মতনির্বিশেষে দেশের জন্যই এ লক্ষ্য অর্জনের বাস্তব সম্ভাবনা ও শর্তগুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৫১৯ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ অর্থবছরে বাস্তব প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৭ থেকে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ ধরা হয়েছে ৪ দশমিক ৮ থেকে ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশের রাজস্ব জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ভিয়েতনাম বা ভারতের তুলনায় এটি অনেক কম। এই অনুপাত ১৪–১৫ শতাংশে উন্নীত না হলে রাষ্ট্রের পক্ষে বড় পরিসরে অবকাঠামো, শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।

বর্তমান গতিতে এগোতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি ৭০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। সেখান থেকে ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো কাগজে–কলমে অসম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি ও টাকা–ডলারের বিনিময় হারের পরিবর্তন ধরলে ২০৩৪ সালের লক্ষ্য সংখ্যার হিসাবে অর্জনযোগ্য বলেই মনে হতে পারে।

কিন্তু টেকসই অর্থনীতির প্রশ্নে সংখ্যার এই হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রকৃত অর্থে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি হতে হলে আজকের দামে সেই আকারে পৌঁছাতে হবে।

এ জন্য বাংলাদেশকে টানা এক দশক গড়ে ৮ শতাংশ বাস্তব প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। ইতিহাস বলছে, এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ। বর্তমানে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের নিচে নেমে আসায় এ লক্ষ্য আরও দূরে সরে যাচ্ছে।

বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা

বাস্তবে জিডিপি বাড়ে মূলত তিনটি উপাদান একসঙ্গে শক্তিশালী হলে। সেগুলো হলো বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা। বাংলাদেশ বর্তমানে এই তিন ক্ষেত্রেই চাপের মুখে। ২০২৬ সালে দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। ফলে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানো ও বৈদেশিক ঋণের সুদের হার বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই নতুন সরকারকে অর্থনীতি পরিচালনা করতে হবে।

সবচেয়ে বড় বাধা বিনিয়োগ। উচ্চ সুদের হার, নীতিগত অনিশ্চয়তা, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণে মানসম্পন্ন বেসরকারি বিনিয়োগ কার্যত স্থবির। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে এফডিআই কিছুটা বেড়েছে। এ সময়ে ৮৬৫ মিলিয়ন ডলার এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

তবু সামগ্রিকভাবে এফডিআই জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৪ থেকে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। এটি ভিয়েতনাম বা ভারতের তুলনায় অনেক কম। বিএনপির প্রস্তাবনায় এই অনুপাত ২ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ আসে বিশ্বাস থেকে। আর সেই বিশ্বাস তৈরি হয় নীতির ধারাবাহিকতা, শাসনব্যবস্থার মান ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে। অর্থনীতিকে গতিশীল করতে প্রতিবছর অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার মানসম্পন্ন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

এখানেই রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন। বাংলাদেশের রাজস্ব জিডিপি অনুপাত বর্তমানে প্রায় ৭ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ভিয়েতনাম বা ভারতের তুলনায় এটি অনেক কম। এই অনুপাত ১৪–১৫ শতাংশে উন্নীত না হলে রাষ্ট্রের পক্ষে বড় পরিসরে অবকাঠামো, শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।

প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কৃষিতে কাজ করলেও জিডিপিতে এর অবদান ১৩–১৪ শতাংশ।

জনমিতির সুবিধা, কিন্তু দক্ষতার ফাঁক

বাংলাদেশের জনমিতিক কাঠামো একটি বড় সুযোগ। প্রতিবছর ২০ লাখের বেশি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কর্মক্ষম জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৮ শতাংশ। এ সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত থাকবে। কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে এ জনসংখ্যা সুবিধা নয়; বরং বোঝায় পরিণত হবে। যুব বেকারত্ব ইতিমধ্যে ১১–১২ শতাংশে পৌঁছেছে। মূল সমস্যা দক্ষতার অভাব।

ভোকেশনাল ও দক্ষতা উন্নয়ন খাতে ব্যয় জিডিপির শূন্য দশমিক ১ শতাংশের কম। শিক্ষায় বরাদ্দ ২ শতাংশের নিচে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ১ শতাংশের কম। মানসম্মত শিক্ষা ও সুস্বাস্থ্য ছাড়া উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, নারী শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ১০ শতাংশ বাড়লে দীর্ঘ মেয়াদে জিডিপি ২–৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

যা সংস্কার না করলে জিডিপি বাড়বে না

কিছু খাত সংস্কার না করলে জিডিপিতে বড় লাফ সম্ভব নয়। প্রথমত, শিল্প খাত। বাংলাদেশের রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর। এই একমুখী কাঠামো দিয়ে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়া কঠিন। কারণ, এই খাতে ভ্যালু অ্যাডেড সীমিত ও বৈশ্বিক ঝুঁকি বেশি। ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, ফার্মাসিউটিক্যালস ও অ্যাগ্রো প্রসেসিংয়ে উৎপাদনশীলতা না বাড়লে শিল্প খাত থেকে বড় প্রবৃদ্ধি আসবে না।

দ্বিতীয়ত, কৃষি। প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কৃষিতে কাজ করলেও জিডিপিতে এর অবদান ১৩–১৪ শতাংশ। আধুনিক সেচ, কোল্ডস্টোরেজ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারসংযোগ উন্নত না হলে কৃষি শ্রমশক্তি কম উৎপাদনশীলই থেকে যাবে।

তৃতীয়ত, সেবা খাত। জিডিপির অর্ধেকের বেশি এখান থেকে আসে। কিন্তু এর বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক ও কম উৎপাদনশীল। আইটি, সফটওয়্যার, আউটসোর্সিং, লজিস্টিকস, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে মানোন্নয়ন ঘটাতে পারলে এখান থেকেই বড় প্রবৃদ্ধি আসতে পারে। অথচ গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতেও বড় চ্যালেঞ্জ আছে। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতিবছর জিডিপির ৯–১০ শতাংশ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমানে তা ৬–৭ শতাংশে সীমিত। জ্বালানিনিরাপত্তা অনিশ্চিত। নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো ৩ শতাংশের নিচে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বড়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতে, এর প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে জিডিপি ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

ব্যাংক, নীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতি

প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপেক্ষিত কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জট। দুর্নীতি সরাসরি প্রবৃদ্ধি কমায়। দুর্নীতির আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। একই সঙ্গে সিদ্ধান্তহীন প্রশাসন বিনিয়োগের বড় শত্রু হয়ে উঠেছে। ফাইল ঘোরে, কিন্তু সিদ্ধান্ত আসে না। এ অনিশ্চয়তার খরচ অনেক সময় মূল বিনিয়োগের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়।

ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য করপোরেট বন্ড বাজার প্রায় অনুপস্থিত। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা কেবল জিডিপির আকার নয়, প্রশ্নটা বৈষম্য, শাসনব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার।

ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি যেন কেবল ধনীদের ক্লাব না হয়। ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, কঠিন সংস্কার ছাড়া বড় অর্থনীতি গড়া যায় না।

ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে তাই কেবল অর্থনৈতিক নীতি নয়, প্রয়োজন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিপ্লব। ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত বলে দেয়, তারা কঠিন সংস্কার করে শুধু বিনিয়োগের পরিবেশই নয়, শিক্ষা, প্রশাসন ও সুশাসনের ভিত শক্ত করেছে। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একটি ‘সংস্কার এজেন্ডা’ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা।

আরও পড়ুন

যেখানে রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সমাজ ও নাগরিক সমাজ এক টেবিলে বসবে। ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন কেবল একটি দলীয় লক্ষ্য নয়; বরং এটি জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। সংস্কার মানেই কিছু স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রশ্নটি তাই টেকনিক্যাল নয়, প্রশ্নটি রাজনৈতিক অর্থনীতি—আমরা কি খারাপ সমীকরণ থেকে বেরিয়ে আসার সাহস রাখি?

কোন কিছু পেতে হলে স্বপ্ন দেখা লাগে, পরিকল্পনা নেওয়া লাগে। এ স্বপ্ন এখন কেবল একটি দলীয় লক্ষ্য নয়; বরং এটি জাতীয় অস্তিত্বের অংশ। এখন দরকার যথাযোগ্য পরিকল্পনা ও শক্ত হাতে বাস্তবায়ন। নইলে আমরা সংখ্যায় বড় হব, কিন্তু বাস্তবে একটি ধীর, বৈষম্যমূলক ও ভঙ্গুর অর্থনীতিতেই আটকে থাকব। যার পেছনে ছুটতে গিয়ে আমরা জনগণের আজকের চাহিদা, যা দাম সহনীয় রাখা, চাকরি সৃষ্টি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হব।

  • জ্যোতি রাহমান অর্থনীতিবিদ, আইএমএফের পরামর্শক

  • সুবাইল বিন আলম ইকোনমিক গ্রোথ টেকনিক্যাল স্পেশালিস্ট

    *মতামত লেখকদ্বয়ের নিজস্ব