রাজনীতি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, রাজনীতি শুধু ক্ষমতা নয়; রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি হলো জনগণের উপলব্ধি। রাজনীতিবিদেরা যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সার্বক্ষণিক বুঝতে চেষ্টা না করেন, তাহলে তাঁদের ক্ষমতা ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।
কিছু দেশ আছে, যাদের গণতান্ত্রিক বনিয়াদ খুবই শক্ত। সেসব দেশে একটি দল সরকার গঠন করে নিজেদের মতো দেশ চালায়। পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ তাদের ভুল বা খারাপ কাজের বিচার করে। আমাদের হলো অস্থির দেশ, আমাদের শক্ত কোনো গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। জনগণও খুব তাড়াতাড়ি ফল আশা করে এবং অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত পাল্টায়। সরকারি দল যদি জনগণের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি বিপদে পড়বে।
আমাদের দেশের হাজারো সমস্যা। জনগণ ধরে নিয়েছিল সংসদ বসলে সংস্কার ও সনদ নিয়ে অতি দ্রুত সিদ্ধান্ত সম্পন্ন করবে এবং এরপর রাজনীতিবিদেরা সংসদে দেশের সমস্যা নিয়ে কাজ করবেন। তারা দেড় বছর ধরে শুনে আসছে বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে, দেশে গুম-খুন হবে না, মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে কথা বলার জন্য কমিশন হবে। কোথায় এসব এখন?
বিএনপি বলছে সবই হবে, তাদের আরেকটু চিন্তাভাবনা করতে হবে। এ যেন ‘গাধার নাকের ডগায় মুলা ঝুলিয়ে’ যতটুকু যাওয়া যায়। তারপর গাধাও পরিশ্রান্ত হবে, মুলাও পচে যাবে, সংস্কারের কথাও সবাই ভুলে যাবে। তারপর আবার নির্বাচন হবে। কী ধরনের নির্বাচন হবে? সেটা জানতে আরও চার বছর অপেক্ষা করতে হবে।
একটা দেশে নির্বাচন ও সংসদ গঠনের মূল উদ্দেশ্য যেকোনো সমস্যা সংসদে আলোচনা করে সংসদীয় রীতিনীতির মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এর সমাধান করা। যে অল্প কয় দিন এই সংসদ চলছে, তাতে মনে হচ্ছে রীতিনীতির কোনো বালাই নেই। সরকারি দল তাদের দুই-তৃতীয়াংশের সুযোগ নিয়ে সবকিছু একতরফাভাবে চাপিয়ে দিচ্ছে আর বিরোধী দল প্রতিদিনই আরেকটা জুলাইয়ের হুমকি দিচ্ছে। আমরা কি ইতিহাস থেকে কিছুই শিখব না?
একটা কথা বিএনপিকে বুঝতে হবে, এই দেশের জনগণ সরকারি দলকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখে। যেকোনো রাজনৈতিক বিতণ্ডায় জনগণের সহানুভূতি অনেকটা বিরোধী দলের দিকে থাকে। তার কারণটাও সোজা। একটা দল যখন সরকার গঠন করে, তাদের মন্ত্রীরা বড় গদিওয়ালা চেয়ার পান সত্য, কিন্তু তার সঙ্গে দেশের সব সমস্যার মালিকও তাঁরা বনে যান। চাকরি নেই, তেল নেই, বিদ্যুৎ নেই—সবই সরকারের দোষ। সংস্কার নেই, সেটাও নিশ্চয় সরকারের দোষ। এই সবকিছু নিয়ে যখন জাতীয় বিতর্ক হয়, সরকারি দল থাকবে আত্মরক্ষামূলক, জনগণ বিরোধী দলকেই বেশি হাতে তালি দেবে।
এর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিএনপি সরকারের দুটি উপায় আছে—১. জনগণের চাওয়ার ভিত্তিতে সংস্কারগুলো নিয়ে কাজ করা অথবা ২. একটা ‘পালিত বিরোধী দল’ তৈরি করা। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে দ্বিতীয়টা বোধ হয় সম্ভব নয়।
নির্বাচন শেষ। নির্বাচনের সময় যে বিষয়গুলো নিয়ে জামায়াতের প্রচুর সমালোচনা হয়েছে, যেমন একাত্তরের ভূমিকা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, মেয়েদের স্বাধীনতা—এগুলো এখন যেন আর আলোচনার বিষয় নয়। আলোচনার বিষয় এখন ইস্যুভিত্তিক। সংস্কার হবে কি না, গুম বন্ধ করা কেন অগ্রাধিকার নয়, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অধ্যাদেশগুলো কেন রহিত হবে?
সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার যখন বলেন ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অভিশাপ’ কিংবা সাংবাদিক সোহরাব হাসান যখন বলেন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু করা নয়’ কিংবা আলোকচিত্রশিল্পী ও অধিকারকর্মী শহিদুল আলম যখন বলেন ‘গদি পরিবর্তন হলেও ব্যবস্থার পরিবর্তন না হলে সুফল পাওয়া যায় না’—এসব কথা অবশ্যই কোনোভাবে জামায়াতের রাজনীতিকে সমর্থনের জন্য নয়।
টিআইবির পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান আরও খোলাখুলি বলেছেন, বিএনপি সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। টিআইবির বক্তব্য কি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য?
বিএনপিকে সংস্কারের গুরুত্বটা বুঝতে হবে। বাংলাদেশের বিচার বিভাগ আর কত দিন শাসক দলের হাতিয়ার হয়ে কাজ করবে? শুধু মুখে বললে চলবে না, বিএনপিকে তাদের কাজকর্মে সংস্কারের অগ্রাধিকারটা বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। অনেকেই মনে করছেন, বিএনপি সংস্কার নিয়ে অনেক অগ্রাধিকারযোগ্য বিষয় কার্পেটের তলায় ধামাচাপা দিচ্ছে। তাতে জনগণের সন্দেহ বাড়ছে, সুশীল সমাজও বিপদের আশঙ্কা তুলছেন।
এটা সত্য, বিএনপি একসময় জুলাই সনদে অনেক কিছুতে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল। কিন্তু সংস্কারগুলো যে প্রয়োজন, তা তারাও স্বীকার করেছে। এটাও ঠিক, তারা গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটকে সমর্থন দিয়েছিল। নির্বাচনের আগে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘১২ তারিখে দ্বিতীয় ব্যালট পেপারটিতে দয়া করে “হ্যাঁ”-এর পক্ষে রায় দেবেন।’
নির্বাচনের সময় নিঃশর্তে সমর্থন করে, এখন পিছিয়ে গিয়ে জামায়াতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার তুলে দিয়ে বিএনপি বড় ভুল করছে। এটা এখন শুধু সংস্কারের প্রশ্ন নয়, এখন এটা বিএনপির জন্য রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ইউনূস সরকারের সনদ প্রক্রিয়া বা গণভোট নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে। সনদের সবকিছুতে সবার সম্মতি ছিল না। কিছু কিছুতে জামায়াত দ্বিমত বা ডিসেন্ট দিয়েছে, আবার বিএনপিও ডিসেন্ট দিয়েছে অনেকগুলোতে। তাই ডিসেন্টগুলোকে অগ্রাহ্য করে এটাকে ঐকমত্য বলে গণভোটে দেওয়া ছিল একটা খুব বাজে সিদ্ধান্ত। আবার যে গণভোটের সনদে তাদের নোট অব ডিসেন্টগুলো ছিল না, ‘হ্যাঁ’ ভোট নিঃশর্তভাবে সমর্থন করাও ছিল বিএনপির কৌশলগত বড় ভুল।
তবে এখন এগিয়ে যেতে হবে। প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা করে সরকারি দলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জামায়াত সংস্কার নিয়ে বিতণ্ডা জিইয়ে রেখে লাভবান হতে চেষ্টা করবে। সংসদে এক-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে তারা সংস্কার কমিটিতে অর্ধেক আসন চাইছে। বিএনপি যত গড়িমসি করবে, চাপ আরও বাড়বে।
এনসিপি সম্ভবত পরবর্তী জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া বলেছেন, ‘গণভোটের রায় যদি আপনারা (সরকার) না মানেন, তাহলে এই সরকারকে আমরা সেদিন থেকেই অবৈধ সরকার বলা শুরু করব। আমরা এটার জন্য সময় নেব না।’ এরপর যদি ‘অবৈধ সরকারকে’ হটানোর আন্দোলন শুরু হয়? আমাদের দেশে আন্দোলনের এই চক্র আর কতকাল চলবে?
শুধু সংবিধানের সংস্কার করে কি স্বৈরশাসন বন্ধ করা যাবে? সংবিধানবিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘স্বৈরশাসনের দোষ সংবিধানের নয়, অপব্যবহারকারীদের।’ এ কথা অবশ্যই সত্য। তবে বিএনপি এই যুক্তি দিয়ে সংস্কারগুলো এড়িয়ে যেতে পারবে না। কারণ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতারা ও পরবর্তী সময়ে এনসিপি গঠন করা তরুণেরা মনে করেন, সব দোষ সংবিধানের। বিএনপিও তাদের সঙ্গে একমত হয়েছে। এখন সংস্কারের দাঁড়ি-কমা ও শব্দচয়ন নিয়ে যত কালক্ষেপণ করবে, ততই বিএনপিকে অজুহাতবাজ দেখাবে।
সংস্কার নিয়ে বিতণ্ডা আরও সম্প্রসারিত হওয়ার আগে বিএনপিকে সনদ ও সংস্কার নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে এবং নতুন উদ্যোগ নিয়ে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। কতগুলো সংস্কার জনগণ খুব সহজেই বোঝে। যেমন মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন, গুম প্রতিরোধ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। বিএনপি এই বিষয়গুলোকে পেছনে ঠেলে শুধু তাদের বিরোধীদেরই রাজনৈতিক হাতিয়ার তুলে দেয়নি, তাদের অনেক শুভার্থীকেও অসন্তুষ্ট করেছে।
বিএনপি এখন উদ্যোগ নিয়ে এই বিষয়গুলোকে আবার সামনে তুলে আনতে পারে এবং কালক্ষেপণ না করে এগুলোকে আইনে রূপ দিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করতে পারে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিএনপির দ্বিমত থাকবে কেন? বিচার বিভাগের স্বাধীনতা যদি বিগত বছরগুলোতে থাকত, তাহলে শেখ হাসিনার সময় বিএনপির নেতা-কর্মীদের এতভাবে জেল-জুলুম খাটতে হতো না। শেখ হাসিনার তিন-তিনটা নির্বাচনও কোর্টে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ত। বিচার বিভাগই অনেক দুঃশাসনের প্রতিকার করতে পারত।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
