ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে ৩০ এপ্রিল, ২৫ কার্যদিবসে। এই অধিবেশনে অনেকগুলো বিল পাস হয়েছে, অনেক বিতর্ক হয়েছে; কিন্তু এই মুহূর্তে জনজীবনের জ্বলন্ত সংকট নিয়ে কথা কমই হয়েছে বলে ধারণা করি। উদাহরণ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জ্বালানিসংকট, হামের প্রাদুর্ভাব, হাওরে বন্যার পানিতে ফসল ভেসে যাওয়া, বেকারত্ব ও নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির কথা বলা যায়।
বরং সংসদ অধিবেশনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক আদেশ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈধতার প্রশ্ন, সংসদ সদস্যদের এক না একাধিক শপথ নেওয়া, গণভোট বড় না জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইত্যাদি নিয়ে। বিরোধী দল শুরুতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করলেও পরে তাঁর ভাষণের ওপর আলোচনায়ও সক্রিয় অংশ নিয়েছে।
সরকারি দল সম্ভবত চেয়েছে, বিরোধী দল জনজীবনের সমস্যা নিয়ে কম কথা বলুক। এ কারণে শুরুতেই বিরোধী দলকে সেসব বিষয় নিয়ে ব্যস্ত রেখেছে, যা নিকট বা দূরবর্তী অতীত। তারা বিরোধী দলের দুর্বলতাটি ভালো করে জানে। এ কারণে আলোচনাটি অতীতবন্দী করে রাখতে সচেষ্ট থেকেছে এবং অনেকটা সফলও হয়েছে। প্রকৃতার্থে সরকারি দল সেসব বিষয়েই আলোচনা দীর্ঘ করেছে, যেখানে তাদের জবাবদিহির প্রশ্ন কম। আর যেসব বিষয় তাদের জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর, সেসব বিষয় ‘হবে’ ‘করব’ বলে দ্রুত শেষ করে দিয়েছে।
তবে সব ক্ষেত্রে এটা হয়নি। যেসব ক্ষেত্রে উভয়েই রাজনৈতিকভাবে লাভজনক মনে করেছে, সেখানে তারা পরস্পর হাতে মেলাতে দ্বিধা করেনি। যেমন উপজেলা পরিষদে এমপি সাহেবদের জন্য ‘আলাদা কক্ষ’, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার যখন এই অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেছিলেন, তাঁরা আইন করে কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী নন। কিন্তু এখন তাঁরা সেই অধ্যাদেশেই সায় দিলেন।
সরকারি দল যেদিন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব এনেছিল, সেদিন বিরোধী দল সংসদ অধিবেশন বর্জন করেছিল এই দোহাই দিয়ে যে ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের রাষ্ট্রপতিকে তারা গ্রহণ করতে পারে না। অবিলম্বে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। তাদের এই রাজনৈতিক অবস্থান শেষ পর্যন্ত অটুট থাকেনি। অধিবেশনের শেষ দিন যখন রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবে ভোটাভুটি হলো, বিরোধী দল ক্ষীণকণ্ঠে ‘না’ ধ্বনি দিলেও বর্জন করেনি। ধন্যবাদ প্রস্তাবটি সহজেই পাস হয়ে যায়।
সংসদের রেওয়াজ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এবং বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিয়ে থাকেন। ধারণা করাই যায়, সেই ভাষণ ক্ষমতাসীন দল রচিত। অতীতে আবদুর রহমান বিশ্বাস, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদও ক্ষমতাসীন দল রচিত ভাষণ জাতীয় সংসদে পড়েছেন এবং তা নিয়ে বিস্তর আলোচনাও হয়েছে।
এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তিনি সরকারি দলের লিখিত ভাষণ পড়া শেষে নিজের মন্তব্যও জুড়ে দিতেন। বলতেন, গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি ও বিরোধী দলকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা দেখাতে হবে।
বর্তমান সংসদে যাঁরা বিরোধী দলে আছেন, তাঁরা গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য দাবি করছেন। বিএনপির ৩১ দফা ও জুলাই সনদেও এই ভারসাম্যের কথা আছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে যখন সংসদে তোতা পাখির মতো সরকারি দলের লিখিত ভাষণ পড়তে হয়, তখন ভারসাম্য হবে কী করে? বিরোধী দলের কেউ এ প্রশ্ন তুলেছেন বলে মনে পড়ে না। ভবিষ্যতে যদি কোনো গবেষক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ সংসদ দেওয়া ভাষণ বিশ্লেষণ করেন, তিনি কী চিত্র পাবেন? আমাদের দেশে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস ও গণতন্ত্র বিচারও বদলে যায়।
সংসদ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গণতন্ত্রকে সফল করতে সরকারি ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। সংসদ যতই সার্বভৌম হোক না কেন, সরকার সফল না হলে সংসদও সফল হতে পারে না। সংসদ নেতা নিজের চেয়ারের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘দেখলে মনে হয় এই চেয়ারে বসতে আরাম। কিন্তু এই চেয়ারটিতে বসলে মনে হয়, প্রতি মুহূর্তে আগুনের তাপ আসছে।’
সংসদ নেতা অবশ্য আগুনের তাপটি কোথা থেকে আসছে সেটা স্পষ্ট করেননি। সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তৃতা–বিবৃতিতে মনে হয় না, তাঁরা খুব তাপ ছড়াতে পেরেছেন। বরং তাঁরা সরকারি দলের ‘আক্রমণ’ ঠেকাতেই বেশি সময় ব্যয় করেছেন। বিরোধী দল প্রথম দিকে কিছুটা আক্রমণাত্মক থাকলেও শেষ দিকে রক্ষণাত্মক ভূমিকা পালন করেছে।
সে ক্ষেত্রে আগুনের তাপটি বিরোধী দল থেকে আসার সম্ভাবনা কম। তাপটি আসার সম্ভাবনা আছে সরকারি দলের পক্ষ থেকেই। সংসদে নয়। সরকারে। নির্বাচনের আগে বিএনপি জনগণকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো যদি পূরণ করতে না পারে, জনজীবনের সমস্যা যদি আরও প্রকট হয়, চেয়ারে আগুনের তাপ বাড়বে; যদি সরকার দলীয় নেতা-কর্মীদের মাস্তানি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, খুনখারাবি রোধ করতে না পারে, তাহলে আগুনের তাপ বাড়বে।
সংসদ নেতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, তিনি জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে চান না, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে চান; কিন্তু গত আড়াই মাসে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তে সাময়িক জনতুষ্টির বিষয়টিই অগ্রাধিকার পেয়েছে। কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলেছে। আমরা যখন এসব কথা বলছি, তখন এটাও মনে রাখছি যে সরকারের বয়স তিন মাসও হয়নি। এরই মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ জ্বালানিসংকট প্রকট করে তুলেছে।
সংসদ নেতার ভাষণের আগে বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান কথা বলেন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অধিক বরাদ্দের দাবি জানান। তাঁর এ দাবি, অবশ্যই সমর্থনযোগ্য। একটি দেশের গোটা জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করতে হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই।
কিন্তু বিরোধী দলের নেতা যখন ইতিহাস ইতিহাসের জায়গায় রেখে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেন, তখনই খটকা লাগে। তিনি বাহাত্তরের সংবিধানকে সম্মান না জানাতে জিয়াউর রহমানের দোহাই দিয়েছেন। জিয়াউর রহমান বাহাত্তরের সংবিধানের খোলনলচে বদলাননি। চতুর্থ সংশোধনীর আগের জায়গায় নিয়ে গেছেন। এর অর্থ বাহাত্তরের সংবিধানকে অস্বীকার করা নয়। তবে শফিকুর রহমান একটি কারণে জিয়াউর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন, বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। জিয়া সামরিক ফরমানবলে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন।
শফিকুর রহমান তাঁর ভাষণে সাতচল্লিশকে স্মরণ করেছেন, একাত্তরকে নয়। বলেছেন, ‘সাতচল্লিশ এই ভূখণ্ড দিয়েছে।’ কিন্তু তাঁর জানার কথা, সাতচল্লিশ ভূখণ্ড দিলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এ দেশের মানুষের ওপর যে ঔপনিবেশিক শাসন চাপিয়ে দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সাতচল্লিশকে অস্বীকার করেই একাত্তর এসেছে। ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে সাতচল্লিশকে স্মরণ করব; কিন্তু আত্ম ও মননে ধারণ করব একাত্তরকে। যাঁরা সাতচল্লিশ ও একাত্তরের ফারাক বোঝেন না, তাঁদের ইতিহাস বিচার যে দেশের গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষের সঙ্গে মিলবে না, এটা হলফ করে বলা যায়।
এ কারণেই ইতিহাসকে ইতিহাসের জায়গায় রেখে নয়, ইতিহাসের ফয়সালা করেই আমাদের ভবিষ্যৎ পথনকশা তৈরি করতে হবে।
সোহরাব হাসান কবি ও সাংবাদিক
মতামত লেখকের নিজস্ব
