প্যারিসের দুই প্রজন্মের সংঘাত কবে থামবে

ফ্রান্সজুড়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন হাজার হাজার বিক্ষোভকারী। তাঁদের বেশির ভাগই তরুণএএফপি

প্যারিসের রাস্তায় কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা বাড়ছিল। শনিবারের বিক্ষোভের দিন আমি ও আমার স্ত্রী ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে শহর ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। বেলা দুইটায় প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে যখন মূল বিক্ষোভ শুরু হয়, তখন আমরা প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে ফন্তেনব্লোর জঙ্গলে হাঁটছিলাম। একসময় ফরাসি রাজাদের শরৎকালীন অবকাশযাপন ও শিকারের জায়গা ছিল এই বন। 

ট্রেনে ফিরে এসে মেট্রোর দিকে হাঁটার সময় বাতাসে কাঁদানে গ্যাসের গন্ধ পেলাম। আমাদের বাসার কাছের মেট্রোস্টেশনটি বন্ধ ছিল। তাই পাশের একটি স্টেশনে নামলাম। সেখানে সিঁড়ির নিচে একদল কিশোর-কিশোরী জড়ো হয়েছিল। তারা করোনাকালের ব্যবহৃত মুখোশ বিলি করছিল। আমরা প্রত্যেকে একটি করে মুখোশ নিলাম। ঠিক তখনই কাঁদানে গ্যাসের মেঘ ছড়িয়ে পড়ল। চোখ জ্বালা করতে থাকায় সবাই হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আবার ট্রেনের দিকে ছুটল।

বিক্ষোভ এড়ানোর কোনো উপায় ছিল না। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ফ্রান্সের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই আন্দোলন শুরু হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তরুণদের মতো ফ্রান্সের অনেক তরুণও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাহীন।

আরও পড়ুন

কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি ও আর্থিক চাপের মধ্যে তাঁদের বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা খারাপ হচ্ছে। কাজের প্রতিকূল পরিবেশে অনেক শিক্ষক ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত। কেউ কেউ অনুপস্থিত থাকলেও তাঁদের জায়গায় অন্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। এদিকে ১৯০০ সালে তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর ফ্রান্সে এবারের গ্রীষ্ম ছিল সবচেয়ে উষ্ণ। তরুণেরা জানেন, ভবিষ্যতে এমন গ্রীষ্ম আরও আসবে, হয়তো আরও ভয়াবহ হবে। অথচ দায়িত্বে থাকা বয়স্ক ব্যক্তিরা এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেমন কিছু করছেন না বলে তাঁদের ধারণা। 

ফ্রান্সে রাজপথের বিক্ষোভ যেন জাতীয় জীবনের নিয়মিত আচার। ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ আইন করে অবসরের বয়স ৬২ থেকে ৬৪ বছর করার পরিকল্পনা ঘোষণা করলে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সংস্কারটি আইনে পরিণত হয় এবং বিক্ষোভ থেমে যায়। তবে অবসরের বয়সসংক্রান্ত সংস্কারের মূল পদক্ষেপগুলো পরে ২০২৮ সাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। 

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালে কাঁদানে গ্যাসের একটি শেল লাথি দিয়ে সরানোর চেষ্টা করছেন মুখোশধারী এক বিক্ষোভকারী। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

এবারের আন্দোলনের সমাপ্তি কোথায়, তা বোঝা যাচ্ছে না। ফরাসি সরকার কোনো বিলের প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে পারে কিংবা পাস করানোর জন্য তাতে পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু আজকের সরকারগুলো তরুণদের প্রত্যাশিত ও প্রাপ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার মতো আইন প্রণয়নে অক্ষম বলে মনে হচ্ছে। 

 ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে। জনমত জরিপে উগ্র ডানপন্থীদের সমর্থন বাড়ছে। যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, এই বিক্ষোভ অতি বামপন্থীদের শক্তি বাড়াবে। ফল যা-ই হোক, মধ্যপন্থী রাজনীতির ভিত্তি আর দৃঢ় থাকছে না। ফ্রান্সে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া আমার জন্য কঠিন, যিনি মনে করেন এই মধ্যপন্থার টিকে থাকা উচিত কিংবা অন্তত যিনি এর টিকে থাকার আশা করেন। তাহলে ফ্রান্সের সামনে কী অপেক্ষা করছে?

আপাতত শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো পুরোপুরি সুস্পষ্ট নয়। বয়স্ক অনেক বিক্ষোভকারী জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় যেমন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাঁদের কথাতেও সেই সুর শোনা গেছে। 

আরও পড়ুন

হয়তো একদিন এই বিক্ষোভকে বয়স্কদের দাবি ও তরুণদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সংঘাতের সূচনা হিসেবে দেখা হবে। দীর্ঘদিন ধরে শ্রেণি, জাতীয় পরিচয়, ধর্ম কিংবা পরিচিতিভিত্তিক বিভাজনকে কেন্দ্র করে রাজনীতি সংগঠিত হয়েছে। এখন কি বয়সই রাজনীতির প্রধান বিভাজনরেখা হয়ে উঠবে? যদি তা-ই হয়, তাহলে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে ক্ষমতা ও সুযোগ কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে, তা নিয়ে আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে।

তরুণদের রাজনীতি অবশ্য নতুন কিছু নয়। ১৯৬৮ সালে প্যারিসের রাজপথে ব্যারিকেড গড়ে যাঁরা আন্দোলন করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা এখনো বেঁচে আছেন, তাঁরা সবাই আজ পেনশনভোগী। বর্তমানে ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হয় পেনশন-সংক্রান্ত অবদানে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে পেনশনের খরচ অন্তর্ভুক্ত করার পদ্ধতির কারণেও এই অনুপাত এমন হতে পারে। তারপরও অঙ্কটি তাৎপর্যপূর্ণ। 

বিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্রের অন্যতম বড় অর্জন হলো বার্ধক্যে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সেই অর্জন অক্ষুণ্ন রেখে তরুণদের জন্য সম্মানজনক ভবিষ্যতের সুযোগ কীভাবে তৈরি করা যায়? 

সরকারি ঋণ বাড়ছে, ঋণ গ্রহণ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। ফলে ফ্রান্সের পক্ষে তার কল্যাণরাষ্ট্রের ব্যবস্থা আর বহন করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দেশটি কেমন কল্যাণরাষ্ট্র চায় এবং কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে চায়।

বিংশ শতাব্দীর গণতন্ত্রের অন্যতম বড় অর্জন হলো বার্ধক্যে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। সেই অর্জন অক্ষুণ্ন রেখে তরুণদের জন্য সম্মানজনক ভবিষ্যতের সুযোগ কীভাবে তৈরি করা যায়? 

প্রশ্নগুলো শুধু পেনশনের অধিকার ও শিক্ষায় ব্যয়ের মধ্যে কে কতটা পাবে, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার মান, বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানের মতো বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িত। 

বাড়ি ফেরার পথে সাঁ-মার্তাঁ খালের ওপরের সেতুগুলোতে মুখোশ পরা কিশোরদের কয়েকটি দল দেখলাম। তারা সেতুর ওপর বসে পা ঝুলিয়ে জ্বলন্ত আবর্জনার পাত্র দেখছিল।

আরও পড়ুন

১৮৪৮ সালের বিপ্লবের জুন দিবসগুলোর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও এই খালের সেতুগুলোর ভূমিকা ছিল। তখন প্যারিসের শ্রমিকেরা জাতীয় রক্ষীবাহিনীসহ সরকারের অন্যান্য বাহিনীর মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই সময়ের রাজনৈতিক বিভাজন ছিল ভিন্ন। আমাদের সময়ের বিভাজনগুলো কেবল এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। 

● জোনাথন লেভি প্যারিসের সায়েন্স পো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ