বাংলাদেশের উন্নয়নের অদৃশ্য সমস্যা

একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একই সঙ্গে স্থানিক। এ বাস্তবতা উপেক্ষা করলে উন্নয়ন অসম, অকার্যকর ও অটেকসই হয়ে পড়বে। বাংলাদেশের উন্নয়নের অদৃশ্য সমস্যা নিয়ে লিখেছেন শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান

বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে ২০২৫-২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে জিডিপির ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি, জিডিপির ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, সবুজ ও সুনীল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির খাতভিত্তিক সংস্কার ও সম্প্রসারণ ঠিক করা হয়েছে।

জিডিপির আকার বর্তমানে ৪৯৫ দশমমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৪২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩৪ সাল থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বিগত বছরগুলোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বর্তমান সরকারের উদ্যোগের অভিনবত্ব হবে বস্তুনিষ্ট তথ্যভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নযোগ্যতার সংস্কারসাধন।

২.

অর্থনৈতিক এই পরিকল্পনাকাঠামো প্রণয়নের জন্য শুধু খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে কাজ শুরু করা যৌক্তিক মনে করা হলেও কতটুকু কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে যে মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো ‘স্থানিক অন্ধত্ব’।

অর্থাৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করা হয়েছে, কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘কোথায়’ ও ‘কীভাবে’ উন্নয়ন ঘটবে, এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর উপেক্ষিত থেকেছে। ফল আমরা আজ চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি—অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আঞ্চলিক বৈষম্য ও পরিবেশগত চাপ। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর আজ সেই ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে দেশের বহু অঞ্চল উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। এই অসমতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি করছে। অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জনের জন্য কোথায় কোন ধরনের বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিয়ে আসতে পারে, তার বাস্তবায়ন কর্মকৌশল নির্ধারিত হয় ‘সমন্বিত স্থানিক’ পরিকল্পনায়।

স্থানিক পরিকল্পনা বাদ দিয়ে বা পেছনে রেখে বা বিচ্ছিন্ন রেখে যদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকাঠামো ঠিক করা হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খুব বেশি সফলতা অর্জন করতে পারবে না, সেটা প্রমাণিত। তাই পরিকল্পনার অধিক্ষেত্র, পরিকল্পনাপদ্ধতি ও বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ করতে শুধু অর্থনৈতিক নয়, অত্যাবশ্যকভাবে স্থানিক পরিকল্পনার বিষয়টিও যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়ে সম্পৃক্ত করতে হবে।

৩.

২০৩৪ সালের মধ্যে যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার আসলেই ট্রিলিয়ন ছড়িয়ে যায়, তাহলে ধরে নেওয়া যায়, ২০৫০ সালের মধ্যে সেটা ৩ ট্রিলিয়নে পৌঁছাবে এবং প্রক্ষেপণ অনুযায়ী তখন বাংলাদেশে জনসংখ্যা হবে প্রায় ২২ দশমিক ৫ কোটি। তাহলে যদি ধরে নেওয়া যায় ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানের তুলনায় ৭–৮ গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং বর্তমান জনসংখ্যার আকারের সঙ্গে যোগ হবে আরও প্রায় ৫ কোটি মানুষ; তাহলে বড় ধরনের প্রশ্ন আসে, কোথায় হবে এই অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ এবং কোথায় থাকবে এই ২২ দশমিক ৫ কোটি জনগণ? কীভাবেই–বা সংস্থান হবে তাদের বাড়িঘর, হাটবাজার, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, অফিস–আদালত, অবকাঠামো, খেলার মাঠ, পার্কসহ অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা ব্যবস্থা?

২০৫০ সাল নাগাদ তো আমাদের দেশের আয়তন বেড়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই! বর্তমান দেশের আয়তনের ৬০ শতাংশ এলাকাকে কৃষিজমি হিসেবে গণ্য করা হয়, শুষ্ক মৌসুমে জলাভূমি ২০ শতাংশ এবং বনভূমির পরিমাণ হলো ১২ শতাংশ, যেখানে ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের মানদণ্ড অনুযায়ী বনভূমি থাকা উচিত ছিল ২৫ শতাংশ। তাহলে এই ৯২ (৬০+২০+১২) শতাংশ ব্যতিরেকে বাকি ৮ শতাংশ এলাকায় কি ২০৫০ সাল নাগাদ বর্ধিত জনগোষ্ঠীসহ ৭–৮ গুণ বড় অর্থনৈতিক বিস্তারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সুবিন্যস্ত করা সম্ভব?

আরও পড়ুন

সুতরাং বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমি পরিকল্পিত ব্যাবহারের বিকল্প নেই। সারা দেশব্যাপী নদ–নদী, খাল–বিল, জলাশয়, উত্তর–পূর্বের হাওর–বাঁওড় অঞ্চল, উত্তর–পশ্চিমের বরেন্দ্র অঞ্চল, দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চলের আলাদা আলাদা ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্টের কারণে জনমানুষের জীবনধারাও হয়েছে বৈচিত্র্যময়। হাইড্রোলজিক্যাল সিস্টেম বিবেচনায় পুরো বাংলাদেশকে ৮টি হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে এবং কৃষি উৎপাদনব্যবস্থার নিরিখে ভাগ করা হয়েছে ৩০টি অ্যাগ্রো-ইকোলজিক্যাল জোনে।

এ ছাড়া রয়েছে প্রাণপ্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য সুন্দরবনসহ বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা। এই বৈচিত্র্য বিবেচনায় নিয়ে অর্থনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হলে সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়ন ছাড়া সম্ভবপর নয়।

পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারসাধন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক কৌশল কমিটির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তারা যদি শুধু অর্থনৈতিক সূচক নির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তাদের রিপোর্ট হয়তো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু যদি তারা সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামো তৈরি করতে পারে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিপথ বদলে দিতে পারবে।

৪.

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ বদ্বীপ হিসেবে পরিগণিত এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত দেশের তালিকায় প্রথম দিকে অবস্থিত। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ইত্যাদির সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হয় আমাদের দৈনন্দিন জীবন। উপরন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন; ইতিমধ্যে জলবায়ুর প্রভাবের কারণে কারণে সৃষ্টি হয়েছে নানাবিধ প্রতিকূলতা। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাসহ লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে কৃষি উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাত ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসের পরিকল্পনা (এনডিসি ৩.০) প্রণয়ন করে থাকলেও এর বাস্তবায়নপ্রক্রিয়ায় তিনস্তরবিশিষ্ট সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার বিষয়টি এখনো যথোপযুক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বদ্বীপ পরিকল্পনা; জাতীয় পানিসম্পদ পরিকল্পনা; ভৌত অবকাঠামো পরিকল্পনা; শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক পরিকল্পনা; পরিবহন ও জ্বালানিবিষয়ক পরিকল্পনা; পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক পরিকল্পনা এবং নীতিকৌশলগুলোকেও বিচ্ছিন্নভাবে না রেখে স্থানিক পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
বৈশ্বিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেছে

বাংলাদেশের ভূপ্রাকৃতিক বাস্তবতা, আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিত এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে ধারাবাহিকভাবেই অনিশ্চয়তার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এই অনিশ্চয়তা মোকাবিলার জন্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিকল্পনা হালনাগাদ করতে হয় এবং পরিকল্পনা মূলত একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবেই বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত।

৫.

বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা যতটুকু না অর্থনৈতিক, ঠিক ততটাই ‘স্থানিক’। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই প্রণয়ন করতে হবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা, মধ্যমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন কর্মসূচি। সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা মানে হলো দেশের উন্নয়নকে সঠিক জায়গায়, সঠিকভাবে এবং সবার জন্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনা। স্থানিক পরিকল্পনায় নির্ধারিত হয় কোন ধরনের উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ কোন এলাকায়, কীভাবে ও কতটা হবে। তাই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও স্থানিক পরিকল্পনা বিচ্ছিন্নভাবে হলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভবপর হবে না।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনার ধারণা দেওয়া থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি গৃহীত সব অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে স্থানিক পরিকল্পনার সঙ্গে, দুর্বল করে রাখা হয়েছে নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ পরিকল্পনা চর্চার জায়গাগুলোকে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য গড়ে ওঠেনি আইনি ভিত্তি, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।

আশার কথা হলো, ৮ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা বিল, যেটি অনুমোদিত আইন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে এবং এর আওতায় সারা বাংলাদেশের জন্য জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা, আঞ্চলিক স্থানিক পরিকল্পনা ও স্থানীয় পর্যায়ে স্থানিক পরিকল্পনা চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

৬.

বাংলাদেশে পরিকল্পনা প্রণয়ন হয়ে থাকে মূলত বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে বা তথাকথিত পরামর্শকের মাধ্যমে। উদ্যোগী সংস্থা মনে করে নেয়, সাধারণ জনমানুষের প্রয়োজনীয়তা ও জন–আকাঙ্ক্ষা ওনারাই জানেন। কতিপয় কর্মশালায় নিজস্ব চেনাজানা কিছু মানুষের সঙ্গে তথাকথিত মতবিনিময়কে ‘স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন’ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে থাকেন। বাস্তব অর্থে এই পরিকল্পনার সঙ্গে সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার কোনো সুযোগ তৈরি হয় না।

কিন্তু পরিকল্পনার প্রক্রিয়া যতটুকু কারিগরি, ঠিক ততটুকুই রাজনৈতিক; গণতান্ত্রিক চর্চা যতটুকু না নির্বাচনে অবাধ ভোট দেওয়ার মধ্যে ঠিক হয়, ততটুকুই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রকৃত গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনায় এবং যেকোনো উন্নয়নকৌশল ও কর্মকাণ্ডে স্থাপিত হয় সব মহলের মালিকানা। এটা নিশিত করা না হলে জনগণের সরকার হয়ে পরে আমলা ও প্রশাসননির্ভর, একসময় হয়ে যায় জনবিচ্ছিন্ন এবং জন্ম হয় স্বৈরতন্ত্রের।

আরও পড়ুন

যেকোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহারকে সমন্বিত পরিকল্পনায় রূপান্তর এবং সে মোতাবেক উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্র প্রস্তুত নয়, এটা বলাই যায়; প্রস্তুত নয় বর্তমান পরিকল্পনা কমিশন, মন্ত্রণালয়, অধীনস্থ দপ্তর ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো।

৭.

বর্তমান সরকারের উচিত হবে দীর্ঘদিনের জমাকৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কারসাধনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। পরিকল্পনা প্রণয়ন যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ, তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পুনর্গঠন; যে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা করবে বেসরকারি খাতসহ সব মহলের সঙ্গে। তাহলেই উন্নয়ন হবে টেকসই এবং পাওয়া যাবে প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বাধীন প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা এবং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে আমাদের

পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারসাধন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
অর্থনৈতিক কৌশল কমিটির জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তারা যদি শুধু অর্থনৈতিক সূচক নির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে তাদের রিপোর্ট হয়তো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু যদি তারা সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বাস্তবায়নযোগ্য কাঠামো তৈরি করতে পারে, তাহলে সেটি বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিপথ বদলে দিতে পারবে।

শেষ পর্যন্ত একটি বিষয় পরিষ্কার—বাংলাদেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি একই সঙ্গে স্থানিক। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করলে উন্নয়ন অসম, অকার্যকর ও অটেকসই হয়ে পড়বে।

  • শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান মুখ্য সমন্বয়ক, স্থানিক পরিকল্পনা এবং সহসভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)
    *মতামত লেখকের নিজস্ব