বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় কেন ঝুঁকির, কেন সম্ভাবনার

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সব শ্রেণির নাগরিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেনছবি: প্রথম আলো

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) তাদের ব্যাপক বিজয়ের জন্য অভিনন্দন। এই ফলাফল কেবল একটি নির্বাচনী জয় নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। দুই শতাধিক আসন জয়ের মাধ্যমে বিএনপি এখন সংসদে একটি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। এর ফলে অস্থির জোট সরকার বা আইন প্রণয়নে অচলাবস্থার আশঙ্কা ছাড়াই সরকার পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এমন একটি শক্তিশালী জনসমর্থন, যদি সতর্কতা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, তবে নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যে সংঘাতমুখী রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমিত করতেও সহায়তা করতে পারে। তবে স্থিতিশীলতার প্রকৃত পরীক্ষা সংখ্যার ওপর নির্ভর করবে না। বরং এটি নির্ভর করবে বিএনপি কতটা গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে, বিভিন্ন পক্ষের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করে সরকার পরিচালনা করতে পারে, তার ওপর।

নির্বাচনী জনসমর্থন নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। তবে এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে এটি কীভাবে ব্যবহার করা হয় তার ওপর। এই মুহূর্তটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানোর সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারে এবং অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও সহনশীল করে তুলতে পারে। এটি সত্যিকার অর্থে একটি রূপান্তরমূলক মুহূর্ত হবে, নাকি কেবল একটি সাময়িক পরিবর্তন, তা নির্ধারিত হবে আজকের সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে।

এ বিজয় আরও একটি বিষয়ের প্রতিফলন বলে মনে হয়। এটি বিভাজনমূলক রাজনৈতিক বয়ানের প্রতি জনগণের একটি স্পষ্ট প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে ধর্মকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, ১৯৭১ সালের ইতিহাসের বিকৃতি এবং জনপরিসরে নারীদের প্রতি অবমাননাকর বা অপমানজনক ভাষার ব্যবহার—এসবের প্রতি জনগণের অনীহা স্পষ্ট হয়েছে।

অনেক ভোটার যেন এই বার্তাই দিয়েছেন যে তাঁরা মতাদর্শগত কৌশল বা বিভাজনের রাজনীতির পরিবর্তে সুশাসন, অর্থনৈতিক সুযোগ ও মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ চান। যদি বিএনপি এ বার্তা উপলব্ধি করে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্মানজনক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়, তবে জাতীয় রাজনীতির সামগ্রিক চরিত্র আরও ইতিবাচক দিকে অগ্রসর হতে পারে।

আরও পড়ুন

এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা কি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনবে?

একটি শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। এর ফলে বারবার বাধার সম্মুখীন না হয়ে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। স্বল্প মেয়াদে এটি রাজনৈতিক স্থিরতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আনতে পারে। তবে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন আরও কঠিন একটি কাজ। এর জন্য প্রয়োজন আস্থা পুনর্গঠন। নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে নিরপেক্ষ ও ধারাবাহিকভাবে। রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার প্রতিশোধপরায়ণতার মানসিকতা ছাড়া হতে হবে।

বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। একক রাজনৈতিক আধিপত্য সব সময় দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেনি। বরং যখন ক্ষমতা ঐকমত্য গঠনের পরিবর্তে একতরফাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তখন রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে। তাই বর্তমান মুহূর্তটি একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও ঝুঁকি বহন করছে। যদি বিএনপি আধিপত্যের পরিবর্তে সংলাপ, দমনমূলক পন্থার পরিবর্তে সংস্কার এবং সংঘাতের পরিবর্তে পুনর্মিলনের পথ বেছে নেয়, তবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি নতুন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সূচনা করতে পারে। অন্যথায় উপরিভাগে শৃঙ্খলা দেখা গেলেও অন্তর্নিহিত অস্থিরতা থেকে যেতে পারে।

বিএনপি কি অর্থনীতিকে দ্রুত স্থিতিশীল করতে পারবে?

অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ থাকলেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সাধারণত রাতারাতি অর্জিত হয় না। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিবারগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে, কিন্তু তা এখনো সতর্ক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাত দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও খেলাপি ঋণের সমস্যায় জর্জরিত। দেশীয় বিনিয়োগের পরিবেশ অনিশ্চয়তা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতায় প্রভাবিত হচ্ছে। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও বড় একটি উদ্বেগের বিষয়।

সংসদে শক্তিশালী অবস্থান বিএনপিকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ করে দেবে। তারা রাজস্ব শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারে, আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে পারে এবং দীর্ঘদিনের বিনিয়োগবিরোধী কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো সমাধানে উদ্যোগ নিতে পারে। তবে অর্থনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ ধারাবাহিকতা দেখতে চান। তাঁরা নিশ্চিত হতে চান যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিমালার হঠাৎ পরিবর্তন হবে না। প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো বাজারে ইতিবাচক সংকেত দিতে পারে, বিশেষ করে যদি সেগুলো সুসংগঠিত ও বিশ্বাসযোগ্য হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য সময়সাপেক্ষ ও ধারাবাহিক সংস্কার অপরিহার্য।

আরও পড়ুন

চব্বিশের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মুহূর্ত

এই নির্বাচনী বিজয় আরও গভীর একটি সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের নয়, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের সুযোগও তৈরি করেছে। জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাবলির আগে ও পরে যে জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি আরও বিস্তৃত ও মৌলিক কিছু দাবি প্রকাশ করেছিল। জনগণ জবাবদিহি চেয়েছিল। তারা ন্যায়বিচার চেয়েছিল। তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় মর্যাদা ও সম্মান প্রত্যাশা করেছিল। অনেকেই এমন প্রতিষ্ঠান দেখতে চেয়েছেন, যা দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জনস্বার্থে কাজ করবে।

এই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভগুলোয় অর্থবহ সংস্কার প্রয়োজন। সিভিল সার্ভিসকে পেশাদারি ও মেধাভিত্তিক অগ্রগতির মাধ্যমে শক্তিশালী করতে হবে। নিয়োগ ও পদোন্নতি রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতার প্রতি আস্থা ফিরে আসবে। সংসদকেও তার প্রকৃত ভূমিকা পুনরুদ্ধার করতে হবে। এটি হতে হবে বাস্তব আলোচনা, সমালোচনা ও জবাবদিহির একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম। সংসদ কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমে এবং গণতান্ত্রিক বৈধতা শক্তিশালী হয়।

বিচার বিভাগ এই প্রক্রিয়ায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর স্বাধীনতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। আইনি প্রক্রিয়া হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। যখন নাগরিকেরা বিশ্বাস করেন যে বিচার নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের আস্থা বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া একটি শক্তিশালী নির্বাচনী বিজয়ও সাময়িক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে তা দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।

এদিকে জনসাধারণের প্রত্যাশা এখনো অনেক উঁচুতে। এতে যেমন আশাবাদ রয়েছে, তেমনি সতর্কতাও রয়েছে। যদি রাজনৈতিক শক্তি সংঘাত বা প্রতীকী বিতর্কে ব্যয় হয়, তবে জরুরি অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারগুলো উপেক্ষিত হতে পারে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর বা অসম থাকলে জন-অসন্তোষ আবারও বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক অংশীদারেরাও পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। তাঁদের আস্থা নির্ভর করবে কেবল অর্থনৈতিক নীতির ওপর নয়, বরং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার দিকনির্দেশনার ওপর। নতুন সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে। ক্ষমতায় আসার প্রথম কয়েক মাস দীর্ঘমেয়াদি ধারণা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এগুলো সংস্কার ও পুনর্মিলনের প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করতে পারে। আবার সংঘাত ও একতরফা ক্ষমতা প্রয়োগের ধারাও জোরদার করতে পারে।

নির্বাচনী জনসমর্থন নিঃসন্দেহে শক্তিশালী। তবে এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে এটি কীভাবে ব্যবহার করা হয় তার ওপর। এই মুহূর্তটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানোর সুযোগ এনে দিয়েছে। এটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারে এবং অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও সহনশীল করে তুলতে পারে। এটি সত্যিকার অর্থে একটি রূপান্তরমূলক মুহূর্ত হবে, নাকি কেবল একটি সাময়িক পরিবর্তন, তা নির্ধারিত হবে আজকের সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে।

  • সেলিম রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম

  • মতামত লেখকের নিজস্ব