ভূমিধস বিজয় মানে সবকিছু পেয়ে যাওয়ার অধিকার নয়

নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটের পরই দেখি যে নির্বাচনে বিজয়ী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। বিশেষ করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে একটি ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাদের নির্বাচিত করে।

এ বিজয় তাদের এতটাই শক্তিশালী করেছিল যে তারা ধীরে ধীরে একটি কর্তৃত্ববাদী দানবীয় ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছিল। যে ব্যবস্থায় মানুষ তার ভোটাধিকার হারায়, গুম-খুন, বিচারহীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব, আমাদের মতো শিক্ষকদের সারাক্ষণ একটি রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখার মতো বিষয়গুলো যেন খুবই রুটিনমাফিক কাজ ছিল। তাদের নানা গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এতটা জনপ্রিয় একটি রাজনৈতিক দল ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তার তলানিতে চলে যেতে বাধ্য হয়।

এই গণতন্ত্রহীন প্রক্রিয়া থেকে আমাদের ফেরত আসতে একটি দীর্ঘ সময় লেগেছে এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অনেক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে টেকসই একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের সুযোগ আমাদের সামনে এলেও তার সুফল আমরা নিতে পারিনি।

আমরা চাই না এবারের গণতান্ত্রিক রূপান্তর আমাদের হাতছাড়া হোক। বিগত সরকারের ক্ষমতার চূড়ান্ত কেন্দ্রীকরণের দুষ্টচক্রের মতো ব্যবস্থা আমরা আর দেখতে চাই না। আমরা চাই বিএনপি এমন গণবিরোধী শাসনব্যবস্থা থেকে দূরে থাকুক এবং আমাদের জন্য একটি সুখকর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসুক।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে আমাদের মধ্যে এক আকাশচুম্বী প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার; কিন্তু সেটি আমরা না পারলেও অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত যে তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক একটি নির্বাচন করতে পেরেছে, সেটি আমরা বলতে পারি।

আরও পড়ুন

গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে যেমন আকাশচুম্বী প্রত্যাশা দেখেছি, বোধ করি তেমনই প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে হচ্ছে। বিএনপি সেই প্রত্যাশার চাপ কতটা পূরণ করতে পারবে সেটা সময়ই বলে দেবে; কিন্তু তাদের যে বিগত আওয়ামী কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার  ব্যর্থতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যাশার চাপ না নিতে পারার অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিএনপি তাদের ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করবে সে প্রত্যাশা তো আছেই, তারপরও তাদের শাসনব্যবস্থায় সচেতনভাবে ইতিহাস থেকে শিক্ষার প্রতিফলন রাখতে হবে, যেন তারা দেশ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

কেননা আমাদের মতো দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মধ্যে এমন ভাবনা শুরু হয়, তারা যেহেতু সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই তাদের কর্মকাণ্ডে কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলা যাবে না। এভাবে তাদের মধ্যে একধরনের ঔদ্ধত্য ও দাম্ভিকতা তৈরি হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কারভাবে জনগণের ম্যান্ডেটকে অবমূল্যায়ন ও অস্বীকার করে। ঠিক সে কারণেই আমরা প্রত্যাশা করব, বিএনপি যেন জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় রেখে আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে একটি শক্তিশালী রূপ প্রদান করে, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা আমাদের গ্রাস না করতে পারে এবং আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রা থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।

নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রীয় সব সিদ্ধান্তের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা থেকেই মূলত কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী মনোভাব শুরু হয়, যে বিষয়গুলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিএনপিকে সচেতনভাবে মাথায় রাখতে হবে।

অনেক সময় আমরা দেখি যে তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচিত সরকারের পাশাপাশি নিজেদের জনগণকে নৈতিকতার মানদণ্ডে পরিণত করে। এই নৈতিকতার মানদণ্ড বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ঝুঁকি বয়ে নিয়ে আসতে পারে, যেখানে অন্য দলের ভাবনাকে খারিজ করে দেওয়া হয়।

এভাবে একটি দলই রাষ্ট্রীয় পরিসরে সব সময় গুরুত্বের জায়গায় থাকে, যা অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভেদ তৈরি করে, যা বিএনপির ক্ষেত্রে ঘটুক আমরা চাইব না।

এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল তাঁর বিখ্যাত বই, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইটস ক্রিটিকস-এ বলেন, ভোটে জেতা মানেই একটি রাজনৈতিক দল সবকিছুর অধিকার পেয়ে গেল, বিষয়টি তেমন নয় এবং এর মধ্য দিয়ে সে যা ইচ্ছা তাই করার ম্যান্ডেট পায় না। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে, যা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা বিএনপিকে ভবিষ্যতের দেশ পরিচালনায় মাথায় রাখতে হবে।

আরও পড়ুন

কেননা নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রীয় সব সিদ্ধান্তের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা থেকেই মূলত কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী মনোভাব শুরু হয়, যে বিষয়গুলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিএনপিকে সচেতনভাবে মাথায় রাখতে হবে।

বিএনপির জনপ্রিয়তার সাম্প্রতিক ঊর্ধ্বগতি আমরা দেখতে পাই তারেক রহমানের দেশে ফেরত আসার পরপরই। আমরা ধারণা করতে পেরেছিলাম যে বিএনপি ধীরে ধীরে একটি জনপ্রিয় দল হিসেবে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের নির্বাচনের ফলাফল তাদের জনপ্রিয়তাকেই নির্দেশ করে।

এমন জনপ্রিয়তা যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য কাম্য হলেও, এটি যে বিএনপির জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কেননা তারা প্রায় দুই দশক ধরে ক্ষমতার বাইরে।

তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন ও জনপরিসরে তাদের দৃশ্যমান জনপ্রিয়তা ইতিবাচক হলেও এ ধরনের জনপ্রিয়তা যেন আবার একটি স্বৈরাচারী চরিত্র গড়ে না দেয় সেদিকে বিএনপির নজর রাখতে হবে। স্বৈরাচারী চরিত্র তৈরি হলেই সেখানে একটি শোষণমূলক ব্যবস্থা তৈরি হয়, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ও সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থ নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণমানুষের অধিকার ও স্বার্থ উপেক্ষা করা হয়।

আরও পড়ুন

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজ দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রচলিত চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার প্রচলন করা খুব জরুরি একটা বিষয়। এর সঙ্গে সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা আমরা দেখেছি, সে জায়গা থেকে গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনী ব্যবস্থার কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে জনগণের আস্থা হারিয়ে যাবে না।

এর মধ্য দিয়ে একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা চলমান থাকবে, যা একটা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে অনুপস্থিত। বিরোধী দলের শক্তিশালী অবস্থানই একটি কার্যকর সংসদ গড়ে তুলতে পারে, যা জনগণের আস্থা অর্জনে বিএনপির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। এতে করে রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক বদলের মাধ্যমে বিগত সময়ের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চর্চা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে।

এর সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার চর্চা অব্যাহত রাখার দিকেও বিএনপির সচেতন দৃষ্টি দিতে হবে। তাদের এটা মাথায় রাখতে হবে, যেন একটি বহুত্ববাদী ও বৈচিত্র্যময় সংবাদমাধ্যম তাদের সময়ে গড়ে ওঠে, যা বিগত দেড় দশকজুড়ে ক্ষমতাসীনদের দলীয় মাধ্যমে পরিণত হয়েছিল। শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম না থাকলে জনতার কাছে সরকারের কোনো জবাবদিহিই তৈরি হয় না।

এর মধ্য দিয়ে বিএনপিকে নাগরিক সমাজ এবং জনগণের কাছ থেকে গঠনমূলক সমালোচনা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবার মন–মানসিকতা তৈরি হবে। অর্থাৎ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা জারি রাখতে হবে, যে প্রতিশ্রুতি আমরা নানা সময় তারেক রহমানের বক্তব্যেও পেয়েছি।    

বিএনপি যদি সত্যিই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনরুদ্ধারের বাহক হতে চায়, তবে তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসবে ক্ষমতা পাওয়ার পর। ভূমিধস বিজয়ের জনপ্রিয় ম্যান্ডেটকে যদি দলটি রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ও সিদ্ধান্তের ওপর নৈতিক ও রাজনৈতিক একচ্ছত্র অধিকারের লাইসেন্স হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে সেটিই হবে গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হওয়ার প্রথম ধাপ। আমরা চাইব না যে ভবিষ্যতে তেমন একটি কর্তৃত্ববাদী দানবীয় ব্যবস্থা আমাদের আবার গ্রাস করুক। তাই বিএনপিকে মনে রাখতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা যত বড়, সংযমের দায়ও তত বেশি।

  • বুলবুল সিদ্দিকী অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
    *মতামত লেখকের নিজস্ব