বাংলাদেশ আবার একটি বড় নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। এখন রাজনীতি শুধু সভা–সমাবেশ, লিফলেট–ব্যানার আর টিভিতে সীমাবদ্ধ নয়। আলোচনা অনলাইনে অনেক আলোচনা হয়। এই জায়গায় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী) বড় ভূমিকা রাখছেন।
কেউ ইউটিউবে কথা বলেন, কেউ ফেসবুক লাইভ করেন, কেউ ছোট ভিডিও বানান। তাঁরা সাংবাদিক না হলেও অনেক মানুষ তাঁদের কথা বিশ্বাস করেন। তাই নির্বাচনের সময় তাঁদের প্রভাব বাস্তব।
ইনফ্লুয়েন্সারদের অনেকেই সঠিক তথ্য দেন, ভুল ভাঙেন, তরুণদের সচেতন করেন। সমস্যা হয় তখন, যখন তাঁরা মানুষকে তথ্য দেওয়ার বদলে ‘আমরা-ওরা’, ‘ভালো-খারাপ’, ‘দেশভক্ত-দেশদ্রোহী’ এইভাবে ভাগ করতে শুরু করেন। তখন রাজনীতি যুক্তির বদলে ভয়, সন্দেহ আর ঘৃণার দিকে চলে যায়।
নির্বাচনের সময় বিভাজন তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল হলো ‘আমরা বনাম তারা’ ফ্রেম। ইনফ্লুয়েন্সারদের একটি অংশ (সবাই নয়) এমনভাবে কথা বলেন, যেন দেশের সব সমস্যার একটাই শত্রু আছে, আর তাদের অবস্থানই একমাত্র দেশপ্রেম। এতে দুই ধরনের ক্ষতি হয়। একদিকে ভিন্নমতকে ‘শত্রু’ হিসেবে দেখানো হয়, অন্যদিকে সাধারণ ভোটার ভয় পায়—সে ভাবে, ‘আমি যদি প্রশ্ন করি, আমি কি ভুল দলে পড়ে যাব?’
এই ধরনের প্রভাব কীভাবে কাজ করে, তা গবেষণাতেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে অপতথ্য বিষয়ে দুই প্রভাবশালী গবেষক ক্লেয়ার ওয়ার্ডল ও হোসেইন দেরাখশান ২০১৭ সালে ‘ইনফরমেশন ডিজঅর্ডার’ ধারণায় দেখিয়েছেন—ভুল তথ্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা, এবং বিকৃত তথ্য একসঙ্গে অনলাইন পরিবেশ দূষিত করে।
নির্বাচনকালে অনেক সময় সরাসরি মিথ্যা না বলে সত্যের ছোট অংশ বড় করে দেখানো হয় বা অর্ধসত্য দিয়ে মানুষের ক্ষোভ বাড়ানো হয়। এতে বিভাজন দ্রুত বাড়ে, কারণ মানুষ যাচাই না করে আবেগের পক্ষে দাঁড়ায়।
একইভাবে রান্ড করপোরেশনের (একটি বিখ্যাত অলাভজনক, নির্দলীয় এবং স্বাধীন গবেষণা সংস্থা) গবেষক জেনিফার কাভানাঘ ও মাইকেল দ. রিচ ‘ট্রুথ ডিকে’ (সত্যের ক্ষয়) ধারণায় বলেন, যখন জন–আলোচনায় যাচাইযোগ্য তথ্যের গুরুত্ব কমে যায় আর মতামত, আবেগ ও পক্ষপাত বাড়ে, তখন সমাজে সবার মেনে নেওয়ার মতো সাধারণ সত্য কমে যায়। এতে গণতান্ত্রিক আলোচনার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাইরের দেশগুলোর অভিজ্ঞতা
২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনের পর কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা-ফেসবুক ডেটা কেলেঙ্কারি দেখায়—ডেটা, অ্যালগরিদম ও লক্ষ্যভিত্তিক বার্তা (মাইক্রোটার্গেটিং) দিয়ে ভোটারের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলা সম্ভব।
দ্য গার্ডিয়ান–এ ১৭ মার্চ ২০১৮ কারোল ক্যাডওয়ালাডর ও এমা গ্রাহাম-হ্যারিসনের প্রতিবেদনে ৫০ মিলিয়ন ফেসবুক প্রোফাইল সংগ্রহের ঘটনা প্রকাশ পায়। এখানে ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ শুধু ইউটিউবার নয়; অনলাইন ব্যক্তিত্ব, পেজ ও গ্রুপ মিলিয়ে একধরনের ‘প্রভাব-শিল্প’ তৈরি হয়েছিল, যা সমাজে মেরুকরণ বাড়ায়, যা ‘ট্রুথ ডিকে’ আলোচনার সঙ্গেও মিলে যায়।
ভারতের নির্বাচন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক নির্বাচনগুলোর একটি। রয়টার্সের ২৫ এপ্রিল ২০২৪-এর প্রতিবেদন ‘ইন্ডিয়া সিভস অনলাইন ডেলিউজ টু স্ট্যাম্প আউট ডিজইনফরমেশন ইন ওয়ার্ল্ড’স বিগেস্ট ইলেকশন’ দেখায়—ভারত কীভাবে অনলাইন মিথ্যা/বিভ্রান্তি ঠেকাতে চেষ্টা করছে, কারণ অনলাইন প্রভাব বাস্তব সহিংসতা বা বড় সামাজিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে। ইনফ্লুয়েন্সাররা এখানে ‘মাঠের বাস্তবতা’ ব্যাখ্যা করার নামে কখনো কখনো বিভাজনের ভাষা জনপ্রিয় করে তুলতে পারে—যার প্রভাব শুধু ভোটে নয়, নির্বাচন-পরবর্তী সামাজিক সম্পর্কেও পড়ে।
তাইওয়ানের ২০২৪ সালের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে আশাব্যঞ্জক। এপি, ২৯ জানুয়ারি ২০২৪–এর রিপোর্ট ‘হাউ তাইওয়ান বিট ব্যাক ডিজইনফরমেশন অ্যান্ড প্রিজার্ভড দ্য ইন্টেগ্রিটি অব ইটস ইলেকশন’—ডেভিড ক্লেপার ও হুইঝং উ দেখান, নির্বাচনের সময় ভুয়া তথ্য ছড়ালেও দ্রুত ফ্যাক্ট চেক, নির্বাচন কমিশনের তথ্য এবং দায়িত্বশীল ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যাখ্যায় ক্ষতি কমানো গেছে। অর্থাৎ সব ইনফ্লুয়েন্সার সমস্যা নয়; কেউ কেউ ভুল তথ্য ঠেকাতেও ভূমিকা রাখতে পারেন।
ব্রাজিলে ২০১৮ সালের নির্বাচনে এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ (বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ) বিশাল ভূমিকা রাখে।
গবেষক এফ ব্রিতো ক্রুজের ২০১৯ সালের কাজ ‘সিক্রেটস অ্যান্ড লাইস: হোয়াটসঅ্যাপ অ্যান্ড সোশ্যাল মিডিয়া ইন ব্রাজিল’স ২০১৮ প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশন’ এই প্রবণতাকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে—এনক্রিপশন, গ্রুপ ও ফরোয়ার্ডিংয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক কনটেন্ট দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এখানে অনেক সময় ‘বিশ্বস্ত’ ব্যক্তি বা গ্রুপ অ্যাডমিনই প্রভাবক হয়ে ওঠেন, কারণ মানুষ যাচাই না করেই তার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। ফলে বিভাজন নীরবে কিন্তু গভীরভাবে বাড়ে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় ইনফ্লুয়েন্সারভিত্তিক বিভাজন কয়েকটি কারণে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক কথাবার্তা অনেক সময় ‘নীতি ও কর্মসূচি’ থেকে সরে গিয়ে ‘ব্যক্তি ও পরিচয়’-কেন্দ্রিক হয়। ইনফ্লুয়েন্সাররা যখন এই পরিচয়-রাজনীতিকে আরও সহজ ভাষায় ভাইরাল করেন, তখন সমাজের ভেতরের ভাঙন দ্রুত বাড়ে। মানুষ যুক্তি শুনতে রাজি থাকে না, কারণ সে আগেই ‘পক্ষ’ ঠিক করে ফেলেছে।
দ্বিতীয়ত, গুজব বা অর্ধসত্য এখানে দ্রুত ছড়ায়—কারণ, অনেকে খবরের উৎস যাচাই করতে অভ্যস্ত নন। ‘একটা ভিডিও দেখলাম’, ‘একজন বলল’—এটাই প্রমাণ হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, ইনফ্লুয়েন্সারদের একটি অংশ অজান্তে ‘বিদেশি ন্যারেটিভ’ অনুকরণ করে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ‘স্টপ দ্য স্টিল’ ধরনের নির্বাচন জালিয়াতির ভাষা জনপ্রিয় হয়েছিল; পরে অন্য দেশেও একই ধরনের ভাষা কপি-পেস্ট হতে দেখা যায়। এই কপি-পেস্ট রাজনীতি বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক—কারণ, এতে নির্বাচনকে আগেই অবৈধ বলা শুরু হয়, ফলাফল যা–ই হোক মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।
বর্তমানে অনলাইন রাজনৈতিক কনটেন্টের বড় অংশের দর্শক শুধু দেশের ভেতরে নয়, দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশিরাও। তাঁরা নিয়মিত ইউটিউব আলোচনা, ফেসবুক লাইভ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দেখেন এবং দেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে গভীরভাবে যুক্ত থাকেন। ফলে সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি তাঁদের মনেও প্রভাব ফেলে।
চতুর্থত, অনলাইন উত্তেজনা অনেক সময় অফলাইনে রূপ নেয়, বিশেষ করে যখন ইনফ্লুয়েন্সাররা ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় কাউকে ‘শাস্তি’, ‘বয়কট’, ‘উচিত শিক্ষা’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। এর ফলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
পঞ্চমত, এটি মানব নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। ইউএনডিপির মানবিক উন্নয়ন প্রতিবেদন–১৯৯৪ মানব নিরাপত্তা ধারণা দেখিয়েছে, নিরাপত্তা মানে শুধু রাষ্ট্র নয়, মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তা। বিভাজনমূলক প্রচার মানুষের মনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করে, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে দেয়, এমনকি ব্যক্তিকে অনলাইন হেনস্তা বা হুমকির মুখে ফেলে। তাই ইনফ্লুয়েন্সারদের বিভাজনমূলক ভূমিকা শুধু মতবিনিময় নয়, মানুষের বাস্তব নিরাপত্তার বিষয়ও।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা: অনলাইন প্রভাবের অর্থনৈতিক দিক
বাংলাদেশের নির্বাচনে সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায় অদেখা দিক সামনে আসে—প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বর্তমানে অনলাইন রাজনৈতিক কনটেন্টের বড় অংশের দর্শক শুধু দেশের ভেতরে নয়, দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশিরাও। তাঁরা নিয়মিত ইউটিউব আলোচনা, ফেসবুক লাইভ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দেখেন এবং দেশের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে গভীরভাবে যুক্ত থাকেন। ফলে সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি সরাসরি তাঁদের মনেও প্রভাব ফেলে।
এখানে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল। প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি প্রধান উৎস, এবং লাখো পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই প্রবাসী বাংলাদেশিরা কেবল ভোট-আলোচনার অংশ নয়; তাঁরা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ঝুঁকিটা তৈরি হয় যখন অনলাইন বিভাজনমূলক বয়ান প্রবাসী সমাজেও উত্তেজনা ছড়ায়। যদি সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সারদের কথায় রাজনৈতিক মতভেদ ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নেয়, তাহলে প্রবাসী কমিউনিটিতেও বিভক্তি তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিরা একই শ্রমবাজার, একই কমিউনিটি নেটওয়ার্ক এবং একই সামাজিক পরিসরে থাকেন। সেখানে রাজনৈতিক উত্তেজনা যদি বিরোধ, দলাদলি বা সংঘর্ষে রূপ নেয়, তাহলে তা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, নিয়োগকর্তা এবং বৃহত্তর সমাজের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
বিদেশের শ্রমবাজারে সুনাম, স্থিতি এবং শৃঙ্খলা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রবাসী কমিউনিটির ভেতরে অস্থিরতার চিত্র তৈরি হলে কাজের সুযোগ, নতুন নিয়োগ, কিংবা কমিউনিটির প্রতি আস্থার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রেমিট্যান্স–প্রবাহেও পড়তে পারে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি।
এ কারণেই বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হলে তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে এটি মানব নিরাপত্তার প্রশ্ন—কারণ, প্রবাসী শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ, এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পরিশেষে, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সাররা বড় ভূমিকা রাখবেন—এটা প্রায় নিশ্চিত। প্রশ্ন হলো, সেই ভূমিকা কি সমাজকে আরও ছিন্নভিন্ন করবে, নাকি মানুষকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তে সাহায্য করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা-টার্গেটিং অভিজ্ঞতা, ভারতের অনলাইন মিথ্যা ঠেকানোর চেষ্টা, ব্রাজিলের হোয়াটসঅ্যাপ-প্রভাব, আর তাইওয়ানের ফ্যাক্ট চেক-ইনফ্লুয়েন্সার-সমাজ মিলে প্রতিরোধ—সব উদাহরণ একটাই কথা বলে: ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্ষমতা বাস্তব। আর এই ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণহীন হলে জাতীয় নিরাপত্তা, মানবনিরাপত্তা, ব্যক্তিনিরাপত্তা—সবই ঝুঁকিতে পড়বে।
মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
*মতামত লেখকের নিজস্ব
