সংবিধান বা গণভোট বিতর্কের সমাধান কীভাবে হবে

বড় বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসায় বিএনপি যে বড় রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই শক্তিকে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কীভাবে ব্যবহার করবে, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে একেবারে শুরুতেই এখন যেদিকে নজর দিতে হচ্ছে, তা হলো গণভোট, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ ইস্যুকে দলটি কীভাবে সামাল দেয় তার ওপর।

আমরা দেখলাম নতুন সংসদ গঠনপ্রক্রিয়ার শুরুতেই এসব নিয়ে বিরোধ ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিতর্কটি সরল নয়। এর সাংবিধানিক ও আইনগত দিক যেমন আছে, তেমনি নৈতিক ও রাজনৈতিক দিকও আছে। তা ছাড়া এটাও মনে রাখা জরুরি, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি কোনো স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে হয়নি। একটি রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এগুলো পাওয়া গেছে। অথচ নতুন সংসদ ও নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথে নতুন যাত্রার শুরুতেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ ও বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল।

এটা মানতে হবে যে গণভোট, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ—এই বিষয়গুলোর হিসাব-নিকাশ বেশ জটিল হয়ে পড়েছে। গণভোটে জুলাই সনদ পাস হয়েছে। গণতন্ত্রের জনগণই সার্বভৌম। সেই বিবেচনায় জনগণের ভোটে পাস হওয়া জুলাই সনদকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে এই জুলাই সনদের কিছু বিষয়ে বিএনপির ভিন্ন অবস্থান বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে। এ অবস্থান নিয়েই বিএনপি জনগণের সামনে হাজির হয়েছিল এবং জনগণ তাদেরকে বিপুলভাবে এবং দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যৌক্তিক প্রশ্নটি হচ্ছে, জুলাই সনদ তাহলে কীভাবে বাস্তবায়িত হবে?

বিএনপি যেহেতু জুলাই সনদে সই করেছে, তাই তাদের দেওয়া ভিন্নমতগুলো বাদ দিয়ে হলেও জুলাই সনদের বাকি সবকিছু বাস্তবায়নের নৈতিক বাধ্যবাধকতা দলটির রয়েছে। এখন সংসদে বা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে বিএনপি যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করে জুলাই সনদকে উপেক্ষা করার পথ ধরে, তবে তা হবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল ও অভ্যুত্থানের চেতনাবিরোধী। বিপুল বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপি যে শক্তি অর্জন করেছে, তার এমন ব্যবহার জনগণ ভালোভাবে নেবে না।

ভেতরে-ভেতরে যা-ই থাক, বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বিএনপির পক্ষে ব্যাপক জনরায় ও গণভোটের ফলাফল—এ দুইয়ের মধ্যে বড় প্রশ্ন আকারে হাজির আছে জুলাই সনদে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট। পুরো বিষয় বেশ তালগোল পাকিয়ে গেছে।

অন্যদিকে বিএনপি যে বিষয়গুলোয় তাদের ভিন্নমত জানিয়েছে বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, সেগুলো যদি তারা বাস্তবায়ন না করে, তবে নৈতিকভাবে তাদের ধরার সুযোগ নেই। কারণ, কেউ পছন্দ করুক বা না করুক, এগুলো তাদের ঘোষিত অবস্থান এবং এ অবস্থান নিয়েই তারা বিজয়ী হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জুলাই সনদের ওপর ভিত্তি করে যে গণভোট হয়েছে, সেখানে নোট অব ডিসেন্টের কোনো ব্যাপার নেই।

মজার বিষয় হচ্ছে, এমন গণভোটকে বিএনপি নাকচও করেনি। ভেতরে-ভেতরে যা-ই থাক, বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বিএনপির পক্ষে ব্যাপক জনরায় ও গণভোটের ফলাফল—এ দুইয়ের মধ্যে বড় প্রশ্ন আকারে হাজির আছে জুলাই সনদে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট। পুরো বিষয় বেশ তালগোল পাকিয়ে গেছে।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা শপথ নেননি। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা শপথ নিয়েছেন। এ নিয়ে সামনে যে জটিলতা তৈরি হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিএনপি যে প্রশ্ন তুলছে, তাকে উপেক্ষা করা কঠিন।

আরও পড়ুন

৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত যা হয়েছে, তা বর্তমান সংবিধান মেনেই হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হয়েছে বর্তমান সংবিধানের ভিত্তিতে। এখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলে কিছু নেই। ফলে সংবিধান সংস্কারের জন্য যদি পরিষদ করতে হয়, তবে আগে তা সংসদে পাস করাতে হবে। এর আগে এই সংসদের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন কীভাবে? বিএনপি এ প্রশ্নই তুলেছে।

আবার জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫-এ স্পষ্ট বলা আছে যে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর একই অনুষ্ঠানে পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। নির্বাচন কমিশনও সেভাবেই ১৭ ফেব্রুয়ারি একই দিনে সংসদ সদস্যদের এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণের উদ্যোগ নেয়। জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা সে অনুযায়ী শপথ নিয়েছেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ও ইসির পদক্ষেপ বিবেচনায় নিলে এ দুটি দলের অবস্থানকেও যৌক্তিক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

আরও পড়ুন

আগেই বলেছি, বিপুল বিজয় বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছে। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে উপেক্ষা করে বিএনপি তাদের ভিন্নমতগুলো বাদ দিয়ে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর পথ ধরতে পারে।

আবার জুলাই সনদ বিবেচনায় নিয়ে সংসদে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ বিল’ এনে তা পাস করিয়ে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেই আইনের ভিত্তিতে সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে হবে। কিন্তু জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা তো এরই মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে রেখেছেন। তখন তাঁদের নতুন করে শপথ নিতে হতে পারে। জামায়াত ও এনসিপি কি তা মেনে নেবে?

বিএনপির এ ধরনের যেকোনো উদ্যোগ ও পদক্ষেপ রাজনীতিতে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি যে রাজনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে, তা কি বিরোধীদের সঙ্গে বিরোধ জিইয়ে রেখে ক্ষয় করবে, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনা ও দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজে লাগবে?

এটা এখন স্পষ্ট, গণভোট বা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ—এগুলোর প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। এসব নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক ও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখন আমরা এমন একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে শুধু সাংবিধানিক ও আইনগত যুক্তি বা তর্কবিতর্কের মাধ্যমে এর সমাধান কঠিন হবে। আমরা দেখলাম, এই বিতর্ক ও বিরোধের কারণে নতুন সংসদ ও নতুন সরকারের যাত্রার শুরুর দিনটি কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছে। সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে জামায়াত ও এনসিপি যোগ দেয়নি। জনগণ এবার রাজনীতিতে ভিন্ন সংস্কৃতির সূচনা প্রত্যাশা করেছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ বা গণভোট—এসব নিয়ে যে বিরোধ বা জটিলতার পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তা সমাধানের জন্য এখন রাজনৈতিক পথ কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে। আগেই বলেছি, বর্তমান বাস্তবতায় আইন, সংবিধান—এসব বিবেচনার পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও এর চেতনার মতো রাজনৈতিক দিকটিকেও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীন দল বা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে বিজয়ী দল হিসেবে রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরির দায় তাই বিএনপিরই বেশি।

  • এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক

    ই–মেইল: [email protected]

    *মতামত লেখকের নিজস্ব

[ এ লেখা ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে সংবিধান বা গণভোট বিতর্ক, সমাধানটি রাজনৈতিক—এ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে]