ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার অভিযানটি কয়েক মাসের পরিকল্পনা ও মহড়ার ফল। গোয়েন্দারা দীর্ঘদিন ধরে প্রেসিডেন্ট দম্পতির চলাচল নজরে রাখে।
অভিযানের আগের রাত থেকে দেড় শতাধিক বিমান আকাশে নিরাপত্তা দেয়। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভেনেজুয়েলার সামরিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত করে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকার্যকর করা হয়। নিচু দিয়ে ওড়া হেলিকপ্টার কারাকাসের কেন্দ্রে ডেলটা ফোর্সের সেনাদের নামিয়ে দেয়। মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তারক্ষীদের গোলাগুলি হয়। এরপর প্রেসিডেনশিয়াল প্রাসাদের ভেতরে স্টিলের সুরক্ষিত কক্ষে আশ্রয় নিতে যাওয়ার সময় মাদুরোকে আটক করা হয়।
অভিযানটি সফলভাবে শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই আরেকটি ঘটনায় পরিস্থিতি আরও আলোচিত হয়ে ওঠে। মার এ লাগোতে সোনালি সাজে তৈরি একটি কক্ষে অস্থায়ী মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এখন থেকে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং দেশটির তেলের সম্পদ দিয়ে এ অভিযানের খরচ মেটানো হবে।
মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া হয় ইউএসএস আইও জিমা নামের একটি অ্যামফিবিয়াস যুদ্ধজাহাজে। সাধারণত এই জাহাজ সৈন্য ও রসদ পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। আটকের পরের সন্ধ্যায় তাঁদের নিউইয়র্কে আনা হয়। সেখানে তাঁদের বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার এবং অস্ত্রসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাদুরোর একটি ছবি প্রকাশ করেন। ছবিতে দেখা যায়, ধূসর ট্র্যাকস্যুট পরা মাদুরোর হাতে হাতকড়া। তিনি পানির বোতল চেপে ধরে আছেন। চোখ বাঁধা কাপড়ে। কানে শব্দরোধী হেডফোন।
এ দৃশ্য সাম্প্রতিক সময়ের ছবিগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত। কিছুদিন আগেও মাদুরোকে দেখা গেছে সমর্থকদের সামনে মঞ্চে নাচতে, ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার দৃঢ় ঘোষণা দিতে। এমনকি এক সমাবেশে তাঁকে দেখা গেছে, জন লেননের শান্তির গান ইমাজিন গাইতেও।
লাতিন আমেরিকার এই ‘স্বৈরশাসককে’ ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে কয়েক মাস ধরে যে চেষ্টা ডোনাল্ড ট্রাম্প চালিয়ে আসছিলেন, এ ঘটনা তাঁকে একটি বিজয়ের মুহূর্ত এনে দেয়। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কিছু মিত্রও আমাদের জানিয়েছেন, একটি সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে উৎখাত করার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাহীন আচরণ তাঁদের উদ্বিগ্ন করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প খুব কম তথ্য দিয়েই ঘোষণা করেন, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা অস্থায়ীভাবে ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। ট্রাম্প বলেন, একটি নিরাপদ সঠিক ও বিচক্ষণ ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত তাঁরাই দেশটি চালাবেন।
যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকার্যকর করতে একাধিক হামলা চালায়। কারাকাসের চারপাশের পাহাড় থেকে সাধারণ মানুষ পুরো আক্রমণটি চোখে দেখতে পায়। তারা মাটির কম্পন অনুভব করে। এরপর শহরের যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মার্কিন বাহিনী যখন এগিয়ে আসে, তখন তারা তীব্র গুলির মুখে পড়ে। এতে তাঁদের কয়েকজন আহত হন এবং ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণহানি ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এতে প্রশ্ন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যতে কতটা গভীরভাবে জড়িয়ে পড়বে। ট্রাম্প যুদ্ধের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি। এমনকি আগেভাগে কংগ্রেসকে এই অভিযানের কথা জানানোর প্রয়োজনও মনে করেননি। তিনি এর কারণ হিসেবে কংগ্রেস থেকে তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেন।
ট্রাম্প এ বিষয়ে কোনো মন্তব্যও করেননি যে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য কী বার্তা দেয়, যখন তিনি ইউক্রেনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন। একইভাবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাইওয়ান দখলের সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন। সে ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী হতে পারে, তা–ও ট্রাম্প এড়িয়ে যান।
মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা তাঁর আমেরিকা ফার্স্ট নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, এই প্রশ্নও ট্রাম্প উড়িয়ে দেন। এই নীতিকে সাধারণত বিদেশি হস্তক্ষেপবিরোধী হিসেবে দেখা হয়। ট্রাম্প বলেন, এটিই আমেরিকা ফার্স্ট নীতি। কারণ, আমরা চাই আমাদের চারপাশে ভালো প্রতিবেশী থাকুক। আমরা স্থিতিশীলতা দিয়ে নিজেদের ঘিরে রাখতে চাই। বহু বছর ধরে দূর থেকে হামলা চালিয়ে পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জনের পক্ষপাতী থাকার পর তিনি এবার সরাসরি সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাকেও গ্রহণ করেন। নিজের নতুন এই কৌশলের নাম তিনি দেন ‘ডনরো ডকট্রিন’। এটি তাঁর নিজের নাম এবং উনিশ শতকের মনরো ডকট্রিনের একটি অস্বস্তিকর সংমিশ্রণ।
সবকিছুর মূলেই যে বিষয়টি কাজ করছে, ট্রাম্প সেটা স্পষ্ট করে দেন—তেল। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে নতুন করে সচল করতে, যেখানে নেতৃত্ব দেবে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল ভারী এবং পরিশোধন করা কঠিন হলেও যুক্তরাষ্ট্র এই পরিকল্পনায় এগোতে চায়। ট্রাম্প বলেন, এই খাত থেকে আসা আয় যাবে ভেনেজুয়েলার জনগণের কাছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, বহু বছর আগে ভেনেজুয়েলা তেলশিল্প জাতীয়করণ করায় যুক্তরাষ্ট্র যে ক্ষতির মুখে পড়েছিল, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবেই এই অর্থ নেওয়া হবে।
ট্রাম্প গোপন অভিযান শুরুর নির্দেশ দেওয়ার পর গত আগস্টে সিআইএ তাদের এজেন্টদের ভেনেজুয়েলায় পাঠায়। এসব এজেন্ট মাদুরো কী ধরনের পোশাক পরেন, কী খান, কোথায় যাতায়াত করেন, কী ধরনের পোষা প্রাণী রাখেন—এসব খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে। ডেলটা ফোর্স একটি নিরাপদ বাড়িতে মাদুরোকে আটক করার প্রশিক্ষণ নেয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভেনেজুয়েলার আকাশসীমার কাছাকাছি গিয়ে আবার ফিরে আসে। আকাশসীমা অতিক্রম না করে তারা পর্যবেক্ষণ করে, কোনো আক্রমণ হলে ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনী কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অকার্যকর করতে একাধিক হামলা চালায়। কারাকাসের চারপাশের পাহাড় থেকে সাধারণ মানুষ পুরো আক্রমণটি চোখে দেখতে পায়। তারা মাটির কম্পন অনুভব করে। এরপর শহরের যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। মার্কিন বাহিনী যখন এগিয়ে আসে, তখন তারা তীব্র গুলির মুখে পড়ে। এতে তাঁদের কয়েকজন আহত হন এবং ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণহানি ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার মানুষ জানে না আসলে দেশটি কে চালাচ্ছে। অথচ দেশটির টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে রাস্তায় পতাকা নেড়ে উদ্যাপনের ছবি দেখানো হচ্ছে। কারাকাসে কোলেকটিভোস নামে পরিচিত সশস্ত্র বেসামরিক মিলিশিয়ারা টহল দিচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা তাঁদের সমর্থকদের রাস্তায় নামতে ডাক দিয়েছেন, কিন্তু কোলেকটিভোস ছাড়া আর কেউ সেই ডাকে সাড়া দেয়নি।
• ভিভিয়ান সালামা, ন্যান্সি এ ইউসেফ, জোনাথন লেমির, শেন হ্যারিস, আইজ্যাক স্ট্যানলি বেকার এবং সারা ফিটজ প্যাট্রিক লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
দ্য আটলান্টিক থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত