বিশ্লেষণ
‘কৃষক কার্ড’ কি আত্মনির্ভর কৃষির রূপান্তর ঘটাবে
কৃষক কার্ড যেন আত্মনির্ভর, কৃষককেন্দ্রিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষিব্যবস্থা রূপান্তরে ভূমিকা রাখে, সেই বিষয়ে লিখেছেন পাভেল পার্থ
পুঁজির বিস্তার, মুনাফার নিয়ন্ত্রণ, পণ্যকরণ ও বাজার সম্প্রসারণের ভেতর দিয়ে খাদ্যব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বৈশ্বিক ক্ষমতাকাঠামোর কর্তৃত্ব। একমুখী বাজারব্যবস্থা কৃষকসমাজকে উৎপাদনের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। কৃষির ইতিহাসে শস্যের আরেকবার নির্দয় গণবিলুপ্তি এবং কৃষকের নয়া বন্দিদশা ঘটেছে ষাটের দশকে তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লব’ প্যাকেজের মাধ্যমে। ফসলের বৈচিত্র্য ধ্বংস করে কৃত্রিম সার, বিষ ও পাতালপানি–নির্ভর ‘আধুনিক কৃষি প্রকল্প’ চাপিয়ে দিয়ে উৎপাদনের সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি। নীতি, আইন, প্রকল্প, বাজেট ও কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্র বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বাহাদুরির বৈধতা দিয়েছে। কৃষির এই ধারাবাহিক রূপান্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ, বৈচিত্র্য ক্ষয়, মুনাফার বিস্তার কিংবা প্রাণডাকাতিতে কৃষকের কোনো ভূমিকা নেই। আজকের নয়া–উদারবাদী বাজারে কৃষক কেবল এক স্বীকৃতিহীন বন্দী মজুর।
গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী সরকার কি কৃষকের চারপাশের প্রশ্নহীন সব দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ‘কারাগার’ চুরমার করতে পারবে? আশা হলো নির্বাচনী ইশতেহারে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি সেই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। দলটি এক আত্মনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছে। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে কেন কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষি এখনো আত্মনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক নয়, এই আলাপ কি আমাদের সংসদে আছে? দেশের সব জাতি, বর্গ ও জেন্ডারের গরিব কৃষক, বর্গাচাষি, ভূমিহীন কৃষিমজুর, জুমিয়া ও কৃষিশ্রমিকেরা কি এই আলাপে অংশ নিতে পারবেন? চর, গড়, পাহাড়, টিলা, বরেন্দ্র, বন, দ্বীপ, উপকূল, হাওর কিংবা
বিল অঞ্চলের কৃষিজীবনের বৈচিত্র্য ও বঞ্চনার বয়ান থেকে কি আত্মনির্ভর কৃষিব্যবস্থার দলিল রচিত হবে?
কৃষিব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তর প্রশ্নে সরকার তার নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো সর্বদা সামনে রাখবে আশা করি। সরকারের সামনে এক জটিল, বৈষম্যমূলক ও অনিরাপদ নয়া–উদারবাদী কৃষিব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে। এই কৃষিব্যবস্থাকে জবরদস্তি করে বা অতি উৎসাহিত হয়ে আজকেই হটিয়ে দেওয়া অসম্ভব। তবে কৃষির ধারাবাহিক রূপান্তরের ইতিহাসকে নৈর্ব্যক্তিকভাবেই পাঠ করতে হবে। সবুজ বিপ্লব প্রকল্প, বহুজাতিক বাণিজ্য বিস্তার কিংবা দেশীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যেভাবে কৃষির লাগাতার দখল, দূষণ ও দস্যুতা ঘটেছে, সেসব আলাপে আনতে হবে।
সব রেজিমে নেওয়া কৃষি প্রকল্প, কৃষিবিষয়ক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতি ও অবহেলা, সাফল্য কিংবা সংকটগুলোকে জনবিশ্লেষণের ময়দানে দাঁড় করাতে হবে। কৃষকের বহুমুখী ও বহুস্তরীয় বঞ্চনা ও লড়াইয়ের রক্তদাগগুলোকে কৃষকের জমিন থেকেই পাঠ করতে হবে। বীজ, লোকায়ত জ্ঞান, জমি, জলা, জঙ্গল, পাহাড়, নদী, খাল কীভাবে গরিবের সর্বজনীন প্রাকৃতিক পুঁজি থেকে আজকে ক্ষমতাবানদের বাণিজ্যিক পুঁজি হয়ে উঠল, মূলত কৃষির রূপান্তরের মূল জিজ্ঞাসাটিই এখানে টগবগ হয়ে আছে। রাষ্ট্র কি আজ এই জিজ্ঞাসার জন্য প্রস্তুত?
আজ শস্যের উৎপাদন বেড়েছে সত্য, কিন্তু আমাদের শরীরে ঢুকেছে ভয়াবহ বিষ। মাটি, মানুষ, মাছ, পাখি, পানি, মুরগি, গরু, ফসল, দুধ আজ আক্রান্ত। ক্যানসার রোগীদের বড় অংশটাই গ্রামীণ কৃষিজীবী। রাসায়নিক বিষ, সিসা-ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু কিংবা মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে বড় হচ্ছে আমাদের রুগ্ণ শিশুরা। কৃষিকাজের জন্য কৃষক আজ বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের ঘাড় মটকে মুনাফা লুটছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। বাজার সিন্ডিকেট ক্রেতা-ভোক্তা-উৎপাদক সবাইকে জিম্মি করে রেখেছে। বাড়ছে জলবায়ুসংকট। বাড়ছে লবণাক্ততা, খরা, তাপপ্রবাহ, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ি ঢল কিংবা বন্যার তীব্রতা।
বহু অমীমাংসিত প্রশ্ন নিয়ে কৃষির এমন এক রক্তাক্ত জমিনে দাঁড়িয়ে কৃষির ন্যায্য রূপান্তর প্রশ্নে সরকারের প্রথম ও অন্যতম কাজ হবে দেশের কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত কার্যকর আলাপ ও মতামত গ্রহণকে এক রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি হিসেবে গড়ে তোলা। সরকারঘোষিত কৃষক কার্ড কর্মসূচির ভেতর দিয়েই দেশব্যাপী সরকার কৃষক জনসংযোগ ও আলাপচারিতার এই কাজ শুরু করতে পারে।
কেবল জমি চাষের নিরিখেই কৃষক বাছাই নয়
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শিরোনামে ৫১ দফার ইশতেহারে বিএনপি কৃষি খাতের মৌলিক রূপান্তরের জন্য অঙ্গীকার করেছে। আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষককেন্দ্রিক এক আধুনিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য। কৃষক কার্ড, কৃষকের সার্বিক সুরক্ষা, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ফসলের ন্যায্যমূল্য, কৃষিজমি সুরক্ষা, কৃষিবিমা, শস্যবিমা, পশুবিমা, মৎস্যবিমা, কৃষি-উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম, অঞ্চলভিত্তিক কৃষিপণ্য উৎপাদন, খাল খনন, হাওরে ইজারা প্রথা বাতিল, জৈব কৃষি, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশবান্ধব কৃষির ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি।
নির্বাচনী ইশতেহারের ঘোষণা বাস্তবায়ন হিসেবে ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি আগামী পয়লা বৈশাখ কৃষক কার্ডের সূচনা করতে যাচ্ছে সরকার। বলা হচ্ছে, এই কার্ডের মাধ্যমে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা প্রায় ১০ ধরনের সুবিধা ও সেবা পাবেন। ন্যায্যমূল্যে সার-বীজ ও কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি, সরকারি প্রণোদনা, ন্যায্যমূল্যে সেচসুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষিবিমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উৎপাদন বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও রোগবালাই দমনে পরামর্শ এই কার্ডের মাধ্যমে পাবেন কৃষকেরা। মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিও এই কার্ড পাবেন। সরকারি প্রণোদনার টাকা সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে যাবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, স্থানীয় সরকারের প্রত্যয়নপত্রের মাধ্যমে এই কার্ডের জন্য আবেদন করতে হবে। ‘মাই জিওভি’ ওয়েবসসাইটে গিয়ে আবেদন করা যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের ডেটাবেজ তৈরি করছে। তাদের মতে দেশে মোট কৃষক পরিবার ১ কোটি ৬৫ লাখ। আগামী চার বছরের ভেতর সব কৃষক পরিবার কৃষক কার্ড পাবে। প্রাথমিকভাবে কৃষক কার্ডের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৭৫ হাজার ২০০ টাকা। সরকারি ‘কৃষি তথ্য সার্ভিসের’ ওয়েবসাইটে ‘কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ পরিকল্পনাতে’ বলা হয়েছে প্রাথমিকভাবে প্রি-পাইলটিংয়ের মাধ্যমে দেশের আটটি বিভাগের নয়টি জেলার নয়টি উপজেলার নয়টি কৃষি ব্লকের ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড়—এই পাঁচটি শ্রেণির মোট ১৯ হাজার ৩০৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। তাঁদের ভেতর ১৬ হাজার ৪৮১ জন ক্ষুদ্র, ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষককে বাছাই করে ৪৫ দিনের ভেতর কৃষক কার্ড প্রদান ও মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা হারে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
দেখা গেছে পাইলটিং এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষুদ্র কৃষক ৮ হাজার ৯০ জন, এরপর প্রান্তিক কৃষক ৬ হাজার ৩৭৪ জন, ভূমিহীন কৃষক ২ হাজার ১৭ জন। বড় কৃষক মাত্র ২০০ জন। বহু প্রমাণ আছে দুনিয়াব্যাপী এই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরাই আমাদের মূল আহার জোগান দেন, কোনো বৃহৎ বাণিজ্যিক খামার বা বড় কৃষকের অবদান খুবই স্বল্প। কিন্তু তারপরও ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরাই সব দিক থেকে বঞ্চিত ও নিপীড়িত। আমরা আশা করব কৃষক তালিকা তৈরি ও যাচাই–বাছাইকরণ এবং কার্ড প্রদানে কেবল জমি চাষের ধরন অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস নয়; দলিত, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী মানুষ, বিধবা, প্রবীণ, ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন, গৃহহীন, জলবায়ু-উদ্বাস্তু বা এমন বহু সামাজিক বর্গীয় প্রান্তিকতাকেও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় আনা জরুরি। বহু গরিব গ্রামীণ নারী ধানের চাতালে, চালের কারখানায়, মাছ-মুরগি-গরুর খামারে কাজ করেন। কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় তাঁদের অবদান কোনো অংশেই কম নয়। তাঁরা কি এই কার্ড পাবেন না?
কৃষকের মূল্যায়ন: বিগত কার্ডগুলো যেমন ছিল?
এর আগে ২০০৭ সালে ‘কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড’ প্রদান করা হয়েছিল। ২০১৫ সাল থেকে ‘ফিশারম্যান কার্ড’ দেওয়া হয়, যা জেলে কার্ড হিসেবে পরিচিত। দেখা গেছে রাজশাহীর নওহাটার দুয়ারী গ্রামের মোসা. বিলকিস বেগম কিংবা পবার বড়গাছি সূর্যপুর গ্রামের শ্রী রাজকুমার হলধর নারী-পুরুষ সবার কার্ডেই ‘ফিশারম্যান’ লেখা আছে। এ ছাড়া কৃষকেরা ১০ টাকার কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পেরেছিলেন। কিন্তু এসব কার্ড কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তাঁদের কোনো কাজে আসেনি।
রাজশাহীর বড়গাছির মাধাইপাড়ার কৃষক মো. সোহরাব আলী কৃষি উপকরণ কার্ড পেয়েছিলেন ২০০৭ সালে। যত্ন করে সেই কার্ড কাগজে মুড়িয়ে রেখেছেন। সম্প্রতি রাজশাহী সফরে গেলে তিনি ভাঁজ করা কার্ডটি মেলে দেখালেন; এই কার্ডের মাধ্যমে সরকার থেকে এখন পর্যন্ত কিছু পাননি। একই বছর কার্ড পেয়ে এখনো কিছু পাননি পবার কারিগরপাড়ার কৃষক মালা বক্স। তবে বড়গাছি গ্রামের কৃষক মো. আবু শ্যামা কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডের মাধ্যমে সরকারি কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত সার, বীজ এসব সরকারি দামে কিনতে পারেন।
কৃষকদের অনেকেই জানালেন বীজ ও সারের জন্য আগের কৃষি কার্ড লাগে না, কেবল ভোটার কার্ড হলেই হয়। আবার অনেকে বললেন, এসব কিছুই লাগে না, দলীয় প্রভাব ও স্থানীয় ক্ষমতার বলে শুধু এসব উপকরণ পাওয়া যায়। এর আগে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে কিছু কৃষক ডিজেলে ভর্তুকি পেয়েছিলেন এবং সরকারি অফিস থেকে উফশী বীজ বা সার কিনতে পেরেছিলেন সরকারি দামে। জেলে কার্ড থাকলেও বহু জেলে অভিযোগ জানালেন, কার্ড প্রদানে প্রথাগত বংশগত জেলেদের কার্ড প্রদান করা হয়নি। অনিয়ম, দুর্নীতি, অন্যায় ও ভুল করা হয়েছে। বহু ধনী ও ক্ষমতাবান মৎস্য ব্যবসায়ী ও খামারমালিকদের ‘ফিশারম্যান কার্ড’ দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে কার্ড পেলেও ২০২৫ সালে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞার মৌসুমে বড়গাছির সূর্যপুরের শ্রীপদ হলধর কেবল ২৫ কেজি চাল সহায়তা পেয়েছিলেন।
এসব কার্ড ছাড়াও বরেন্দ্র অঞ্চলে ‘বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ প্রদত্ত একধরনের পানি রিচার্জ কার্ড আছে, যা সেচে বা ব্যবহারের পানি তোলার জন্য ব্যবহৃত হয়। যত টাকার পানি তোলা হবে কার্ডে তত টাকা রিজার্চ করতে হয়। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্ষমতা, গভীর নলকূপ অপারেটরের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সামাজিক প্রান্তিকতা বহু কিছুর ওপর নির্ভর করে কে পানি পাবে আর কে পাবে না। সেচের পানি না পেয়ে এর আগে বরেন্দ্র এলাকায় তিন সাঁওতাল কৃষক বিষপান করেছিলেন, যার ভেতর অভিনাথ ও রবি মার্ডি মারা যান।
কৃষক কার্ডের সুফল কার?
কেমন ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকের দরকার তা নিয়ে সম্প্রতি বরেন্দ্র অঞ্চল (রাজশাহী), হাওর (নেত্রকোনা), বন (মধুপুর), পাহাড় (খাগড়াছড়ি), চর (মানিকগঞ্জ) এবং উপকূল অঞ্চলের (সাতক্ষীরা) কৃষকদের সঙ্গে দলীয় সভা ও একক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আলাপ করেছি। কৃষকেরা জানালেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তাঁরা কৃষকের মর্যাদা ও স্বীকৃতি এবং কৃষিব্যবস্থার সুরক্ষা ও মুক্তি চান। চলতি সময়ের ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক তেল ও জ্বালানিসংকটের বিষয়টি টেনে তাঁরা জানান, আগেও কয়েকবার ডিজেলে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাজারে তেলের দাম বাড়লে বা পাওয়া না গেলে বা বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে কৃষকের সর্বনাশ এবং তখন কৃষিকাজের খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু বাজারে বা সরকারের কাছে তখন বেশি দামে ফসল বিক্রি করা যায় না।
কৃষিব্যবস্থায় জীবাশ্ম¦জ্বালানির নির্ভরশীলতা ধারাবাহিকভাবে কমাতে হবে। কৃষক কার্ড দিয়ে যদি কৃষকেরা শুধু ডিজেল কিনতে পারেন, তবে এটি আত্মনির্ভর এবং জলবায়ু–সহিষ্ণু কৃষির রূপান্তরে ভূমিকা রাখবে না; বরং একই সঙ্গে সরকারকে নমুনা হিসেবে কিছু নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানিনির্ভর কৃষক প্রকল্পকে এই কার্ডের মাধ্যমে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে জ্বালানি বা সেচের যে সুবিধার কথা বলা হচ্ছে, সেটাও পাতালের পানিনির্ভর, যা আমাদের কৃষিকে এক বিপজ্জনক গভীর খাদে দাঁড় করিয়েছে। যেসব কৃষক ভূ-উপরিস্থ প্রাকৃতিক পানির আধার বা কম পানিনির্ভর সেচ বা লোকায়ত সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তাঁদের কাজকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়া জরুরি।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরকার মনোনীত দোকান বা ডিলার থেকে যেন একতরফাভাবে সিনথেটিক সার ও হাইব্রিড বীজ কেনার জন্য উৎসাহিত করা না হয়। দেশের বহু অঞ্চলের কৃষকেরা এখনো বহুদেশীয় জাত চাষাবাদ করছেন এবং নানা ধরনের জৈব সার ও প্রাকৃতিক কৃষিচর্চা করছেন। তাহলে এমন প্রাকৃতিক কৃষকদের জৈব সার ও স্থানীয় বীজবৈচিত্র্য সুরক্ষা ও চাষাবাদের ক্ষেত্রে সরকারি প্রণোদনা কৃষক কার্ডের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। জাতীয় কৃষি নীতি (২০১৮) দেশের ভিন্ন বাস্তুতন্ত্র এবং কৃষি প্রতিবেশের ভিন্নতাকে গুরুত্ব দিয়ে কৃষি পরিকল্পনার কথা বলেছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে প্রাপ্ত সুবিধা ও প্রণোদনাগুলো যেন দেশের ৩০টি অঞ্চলের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে আঘাত না করে সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
কৃষক বীজ বা উপকরণ কিনে প্রতারিত হয়। ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচারের কোনো নজির নেই। কৃষক কার্ড কৃষকদের এমন ক্ষতিপূরণ আদায়ে কাজে লাগতে পারে। একই সঙ্গে দুর্যোগ বা জলবায়ুসংকটের কারণে ফসলহানির ক্ষেত্রে শস্যবিমা বা ক্ষয়ক্ষতি পূরণে কৃষক কার্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। ষাটোর্ধ্ব কৃষকের পেনশন এই কার্ডের মাধ্যমে চালু করা সম্ভব। কৃষকের বাজার ও ন্যায্যমূল্যে সরাসরি ফসল বিক্রির ক্ষেত্রে এই কার্ড কাজে লাগতে পারে।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী লোকায়ত কৃষিচর্চা এবং জন–অভিযোজনকে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিত করতে হবে। দেশে বহু তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আছেন। তরুণদের কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় সৃজনশীলভাবে যুক্ত করতে কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচিকে তরুণদের কৃষি-গ্রাফিতিও পাঠ করতে হবে। কৃষক কার্ড যেন কেবল করপোরেট বাজারনির্ভর রাসায়নিক কৃষিকে চাঙা করার জন্যই সহায়তা বা প্রণোদনাকে জারি না রাখে; বহু বিকল্প সংগ্রামী কৃষিকাজকে যেন গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়। কৃষক কার্ড যেন আত্মনির্ভর, কৃষককেন্দ্রিক ও জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষিব্যবস্থা রূপান্তরে ভূমিকা রাখে—এটাই প্রত্যাশা।
পাভেল পার্থ লেখক ও গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব