ট্রাম্পের নতুন শুল্কের পাল্টা জবাব

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

আবারও তাঁর ছটফটানি শুরু হয়েছে। অর্থাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইচ্ছেমতো কখনো শুল্ক বাড়াচ্ছেন, কখনো কমাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজে যে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোতে সই করেছিলেন, সেগুলো ভঙ্গ করছেন। এমনকি খুব সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনও লঙ্ঘন করছেন।

আগেরবারের থেকে এবারের পার্থক্য একটাই—শুল্ক আরোপের জন্য তিনি নতুন একটি অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন, আর তা হলো জোর করে শ্রম বন্ধ করা।

অবশ্যই প্রশাসনের এই কথা ঠিক যে জোর করে শ্রমের বিরুদ্ধে বিশ্বে খুব কমই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদের এই উদ্বেগ আসলে একধরনের ছলনা। নতুন শুল্কগুলোও মূলত আগের শুল্কগুলোরই কাছাকাছি প্রকৃতির। এগুলো ট্রাম্প আগে বাণিজ্যঘাটতির অজুহাতে আরোপ করেছিলেন। তাহলে কি আমরা বিশ্বাস করব, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যঘাটতি আর জোর করে শ্রমের ব্যবহার কাকতালীয়ভাবে একসঙ্গে মিলে যায়?

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আগের শুল্কগুলো বাতিল করার পর প্রশাসন ১৫০ দিনের জন্য অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করে। আদালত এগুলোকে আগেই অবৈধ বলেছিলেন। তবু আপিল চলতে থাকে এবং জুলাইয়ের শেষ দিকে এগুলোর মেয়াদ শেষ হয়। এখন আবার নতুন শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। অন্য দেশগুলো নাকি শ্রম নির্যাতন ঠেকাতে ব্যর্থ—এই অভিযোগে একটি তথাকথিত তদন্তের ভিত্তিতে এই শুল্ক আরোপ হলো।

আশ্চর্যের বিষয়, ‘জোরপূবর্ক শ্রমে’ উৎপাদিত পণ্যের উৎস হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহভাজন দেশ চীনকে প্রায় ছাড়ই দেওয়া হয়েছে। কারণ, বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ আছে। তারা চাইলে ট্রাম্পকে সহজেই চাপে ফেলতে পারে। যখনই কোনো দেশ পাল্টা লড়াই করার ক্ষমতা ও ইচ্ছা দেখায়, ট্রাম্প সাধারণত পিছিয়ে যান। এবার তো তিনি চীনের সঙ্গে সংঘাতেই জড়ালেন না।

ট্রাম্প তাঁর এই আগ্রাসী আচরণ চালিয়ে যেতে পারছেন। কারণ, দেশ-বিদেশের অনেকেই তাঁর কাছে নতি স্বীকার করেছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকার মনে করে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই নিরাপদ। কিন্তু ট্রাম্প অন্য যেকোনো কর্তৃত্ববাদী নেতার মতো—তিনি ভয় সৃষ্টি করতে চান। যত দিন বিশ্ব তাকে সে সুযোগ দেবে, ততই সামনে বড় বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।

আরও বড় কথা, যদি ট্রাম্প সত্যিই ‘জোরপূবর্ক শ্রম’ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতেন, তাহলে তিনি প্রথমে নিজের দেশেই এ সমস্যার সমাধান করতেন। যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই ‘জোরপূবর্ক শ্রমের’ একটি কেন্দ্র। এর কারণ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর একটি ফাঁকফোকর। সেখানে বলা হয়েছে, দণ্ডিত অপরাধীর ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে দাসত্ব বা বাধ্যতামূলক শ্রম চালু থাকতে পারে। এই ভাষা একসময় দক্ষিণাঞ্চলে বর্ণবৈষম্যের যুগে চেইন গ্যাং ব্যবস্থাকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করা হয়েছিল। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অনেক জায়গায় এটির অপব্যবহার হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র এক-চতুর্থাংশেরও কম অঙ্গরাজ্যে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ নিষিদ্ধ। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে বাস করলেও বিশ্বের বন্দীদের এক-চতুর্থাংশ সেখানে রয়েছে।

গবেষক মাইকেল পয়কারের একটি বিশদ গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৫ সালে প্রায় ১৪ লাখ বন্দী কাজ করছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ৬ লাখ সরাসরি উৎপাদন খাতে যুক্ত ছিলেন, যা তখনকার মোট উৎপাদন শ্রমশক্তির ৪ দশমিক ২ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের এই বন্দী শ্রমব্যবস্থা বুঝতে চাইলে আভা ডুভার্নের ২০১৬ সালের তথ্যচিত্র থার্টিন্থ দেখা যেতে পারে।

গত বছর ট্রাম্প যখন বিশ্বজুড়ে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তখন তিনি একে ‘পারস্পরিক’ বলেছিলেন। কিন্তু এখন যদি সত্যিই পারস্পরিকতা মানা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব অঙ্গরাজ্যে এখনো বন্দি শ্রম ব্যবহার করা হয়, সেখানকার পণ্যের ওপরই উচ্চ শুল্ক আরোপ করা উচিত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক আরোপের কোনো যুক্তি আরও দুর্বল। কারণ, ২০২৪ সালের একটি আইনের মাধ্যমে তারা ‘জোরপূর্বক শ্রমে’ উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করেছে, এমনকি উপঠিকাদারদের উৎপাদিত পণ্যও এর আওতায়।

অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক আগে বলেছিলেন, এই আইন আমেরিকান কোম্পানিগুলোর ওপর অপ্রয়োজনীয় বোঝা সৃষ্টি করে। তিনি এমনকি সব ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছিলেন। এই অবস্থান স্পষ্টতই ভণ্ডামিপূর্ণ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত এই ভণ্ডামি প্রকাশ্যে তুলে ধরা এবং নতি স্বীকার না করা। তাদের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের যেসব অঙ্গরাজ্যে বন্দী শ্রম বেশি ব্যবহৃত হয়, সেসব জায়গার পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, বার্গার কিং, কারগিল ও ওয়ালমার্টের মতো বড় কোম্পানির সরবরাহ শৃঙ্খলেও কোথাও না কোথাও বন্দী শ্রম ব্যবহৃত হয়। যদি ট্রাম্পের পদক্ষেপ ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের এই শ্রমব্যবস্থা নিয়ে তদন্তে উৎসাহিত করে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকদের জন্যও উপকারী হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ইউরোপে এ বিষয়ে তেমন কোনো আওয়াজ শোনা যায়নি। বরং তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে যে শুল্ক তাদের ওপর আরও বেশি পড়েনি।

আরও পড়ুন

ভণ্ডামির এখানেই শেষ নয়। কানাডার ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ট্রাম্প ১৯৩০ সালের স্মুট-হাওলি শুল্ক আইনের একটি ধারা ব্যবহার করেছেন, যেখানে বৈষম্যমূলক শুল্কের জবাব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পুরো ব্যবস্থাই বৈষম্যহীনতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি সেই নীতিরই সরাসরি লঙ্ঘন। এখানে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক শুল্কের জবাবেই পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে।

আবারও দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের অংশ বাড়াতে চাইছেন। কিন্তু এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, শুল্ক আসলে একধরনের বিকৃতিমূলক কর, যা শেষ পর্যন্ত আমেরিকান ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং দেশের প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয়।

ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ উৎপাদন খাত দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। বরং তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খাতে ৭৫ হাজার চাকরি কমে গেছে, যেখানে জো বাইডেনের সময়ে তা বেড়েছিল। পণ্যে বাণিজ্যঘাটতি কমার বদলে আরও বেড়েছে এবং তা ১ দশমিক ২৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি অস্বাভাবিক নয়। বহুপক্ষীয় বাণিজ্যঘাটতি শুল্কের ওপর কম, বরং জাতীয় সঞ্চয়ের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের ওপর বেশি নির্ভর করে। ট্রাম্পের বিশাল বাজেটঘাটতি এই সঞ্চয়কে দুর্বল করেছে।

ট্রাম্প তাঁর এই আগ্রাসী আচরণ চালিয়ে যেতে পারছেন। কারণ, দেশ-বিদেশের অনেকেই তাঁর কাছে নতি স্বীকার করেছে। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকার মনে করে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাই নিরাপদ। কিন্তু ট্রাম্প অন্য যেকোনো কর্তৃত্ববাদী নেতার মতো—তিনি ভয় সৃষ্টি করতে চান। যত দিন বিশ্ব তাকে সে সুযোগ দেবে, ততই সামনে বড় বিপর্যয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।

  • জোসেফ ই স্টিগলিৎস নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ