তাঁরা কি ধরেই নিয়েছেন পশ্চিম তীরে হামলা চালানো সঠিক?

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি হামলা নিহত চার ফিলিস্তিনির জানাজা। ১২ অক্টোবর
ছবি: রয়টার্স

বিশ্ববাসীর চোখে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতার দুটি প্রকার আছে। গাজায় চলছে গণহত্যা, যেখানে ইসরায়েলিরা পরিবার–পরিজন, সমাজ, জীবন ও জীবিকাকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। অপরটি ১৯৪৮ সালে নাকবার পর থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান সহিংসতা। শেষোক্তটির দিকে বিশ্ববাসীর অত নজর নেই, তেমন আলোচনাও নেই।

যত তীব্রই হোক না কেন, পশ্চিম তীরের সহিংসতা শেষোক্ত ধরনের। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় এই অঞ্চলে আমরা ইসরায়েলি সহিংসতা বাড়তে দেখেছি। গাজা যুদ্ধের অজুহাতে রাজনীতিকেরা যেন ধরেই নিয়েছেন যে পশ্চিম তীরে হামলা চালানো সহিহ। কিন্তু পশ্চিম তীরের দিকে তাকান।

সেখানে একাধিপত্যবাদী সরকার ফিলিস্তিনিদের বিনা বিচারে আটক করছে। বন্দীদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। দখলদারদের সুযোগ করে দিতে ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের চলাচলের স্বাধীনতাটুকু পর্যন্ত নেই।

জাতিসংঘের অফিস ফর দ্য কো–অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটেরিয়ান অ্যাফেয়ার্সের হিসাবে ৭ অক্টোবর থেকে পরবর্তী সাত সপ্তাহে ইসরায়েলিরা পশ্চিম তীরে ২২১ ফিলিস্তিনিকে খুন করেছে। গোটা ২০২২ সালেও এত মানুষ নিহত হননি।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে জেনিন শরণার্থীশিবিরের আট বছর বয়সী আদম আল ঘাউল এবং ১৫ বছর বয়সী বাসেল আবু আল–ওয়াফা রয়েছে। চলমান হামলায় আহত হয়েছেন আরও ২ হাজার ৯৫৫ জন।

ফিলিস্তিনি শরণার্থীশিবির, গ্রাম, শহরসহ সর্বত্র হামলা ও অভিযান চলছে ঘন ঘন। আগে তবু রাতের বেলা গোপনে অভিযান চলত, এখন দিনের আলোতেও শিবিরে ঢুকে পড়ছে ইসরায়েলিরা। পাথর ছোড়ার জন্য, বা শুধু দাঁড়িয়ে থাকার জন্য কিংবা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য নিশানা করা হচ্ছে কিশোর–তরুণদের। আর এ কাজে তারা ব্যবহার করছে ড্রোন ও স্নাইপারদের।

আরও পড়ুন

পশ্চিম তীরে চিকিৎসা দলকেও শুশ্রূষার জন্য আহত ব্যক্তিদের কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ২২৯টি হামলার কথা জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। হামলাগুলো চালানো হয়েছে অভিযানের সময়। অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে না দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের আটক করা, তাঁদের ওপর বল প্রয়োগ করা এবং স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে সামরিক অভিযান চালানোর মতো ঘটনা ঘটেছে এ সময়।

ধ্বংসযজ্ঞের যে মাত্রা তাতে বোঝা যাচ্ছে ইসরায়েলের লক্ষ্য শুধু গাজা নয়, পুরো ফিলিস্তিনে দ্বিতীয় নাকবা ঘটানো। গত ১৮ নভেম্বর বালাতা শরণার্থীশিবিরের ওপর তারা বোমা বর্ষণ করে। এরপর ইসরায়েলি সাঁজোয়া যান ও বুলডোজার সরু রাস্তায় অভিযান চালায়।

এমনিই পশ্চিম তীরের রাস্তাঘাটের অবস্থা নাজুক। ইসরায়েলি অভিযানে রাস্তাঘাট ও জরুরি অবকাঠামো আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসরায়েলিদের বহু পুরোনো কৌশল এটি। তারা দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তার সব ধ্বংস করে দিতে চায়। এই বছরের শুরুর দিকে জেনিনে ইসরায়েল বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে এবং পানির পাইপ, রাস্তাঘাট ও গাড়িঘোড়া ধ্বংস করে দেয়।

আরও পড়ুন

আগের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, এই অভিযানগুলোর ফলাফল কী। ফলাফল হলো গণগ্রেপ্তারের পক্ষে প্রচারণা। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েল ৩ হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করে। প্রশাসনিক আটকাদেশে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশকে ছয় মাস পর্যন্ত বিনা বিচারে আটক রাখা যাবে। এই গ্রেপ্তার পৈশাচিক।

ইসরায়েলি সৈন্যরা ফিলিস্তিনিদের মারধর করে ও তাঁদের সহায়–সম্পদও ধ্বংস করে দেন। তাঁরা তাঁদের সামরিক আইন সংস্কারের পর সংস্কার করে চলেছেন। এতে করে ফিলিস্তিনিদের বিচারিক মূল্যায়ননের বাইরে রেখে যত দিন খুশি আটকে রাখা সম্ভব হয়েছে। আটক ব্যক্তিরা চাইলেও আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। তারা এমনকি তাদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনও বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে কাউকে ফলো করাও আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করেছে তারা।

ইসরায়েলি কারাগারগুলোয় নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয়। তবে পরিস্থিতি এখন আগের চেয়েও খারাপ। ইসরায়েল ফিলিস্তিনি কারাবন্দীদের ওপর পূর্ণ মাত্রায় নির্যাতন শুরু করেছে এখন। ফিলিস্তিনি বন্দীরা এখন বাইরের দুনিয়া থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। ফলে তাঁদের কোনো বক্তব্য আমাদের কাছে পৌঁছায় না।

সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত কারাবন্দীদের ভাষ্য ও আইনজীবীদের কাছ থেকে পাওয়া ভাষ্যের ভিত্তিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কিছু বিষয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটি বলছে, কারাবন্দীদের চোখ বেঁধে উলঙ্গ করে রাখা হয়। মাথা নিচু করে ইসরায়েলি গান গাইতে হয়। ৭ অক্টোবরের পর ছয়জন ফিলিস্তিনি কারাবন্দী ইসরায়েলি কারাগারে মারা গেছেন। ফিলিস্তিনি বন্দীদের প্রতি এই আচরণকে সামষ্টিক শাস্তি বলা চলে।

যদিও জিম্মি মুক্তির বিনিময়ে বেশ কিছু ফিলিস্তিনি কারাবন্দী মুক্তি পেয়েছেন, এই সময়কালে ইসরায়েল আরও অনেককে গ্রেপ্তার করেছে। প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স ক্লাবের হিসাবে ১৬৯ জন শিশু ও ৭১ জন নারী মুক্তি পেয়েছেন। আর নতুন করে ইসরায়েলিরা ১২ বছরের একটি শিশুসহ ২৬০ জন গ্রেপ্তার করে।

আরও পড়ুন

এদিকে বন্দীমুক্তি উদ্‌যাপনের জন্য যাঁরা জমায়েত হয়েছিলেন, ইসরায়েলিরা তাঁদের ওপর স্টান গ্রেনেড, বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়েছে। ইয়াসিন আল আসমার ও ফাদি আদরান এতে নিহত হন, আহত হন আরও অনেকে। ইসরায়েল এমনকি আমাদের আবেগকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তারা কারামুক্তি উদ্‌যাপনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কারামুক্তির আগেই বাড়িঘরগুলোতে অভিযান চালিয়ে দর্শনার্থীদের বের করে দেয়, তারা চকলেট ছুড়ে ফেলে দেয় ও ৭০ হাজার শেকেল জরিমানার হুমকি দেয়।

অর্থনৈতিক সহিংতাও চালাচ্ছে ইসরায়েলিরা। তারা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে যে কর দিত, তা কমিয়ে দিয়েছে। যারা ইসরায়েল অধিকৃত অঞ্চলে কাজ করতে যেত, তাদের আর কাজ করার অনুমতি দিচ্ছে না। দখলদার ইসরায়েলি ও সামরিক বাহিনীর অত্যাচারে ফিলিস্তিনিরা জলপাইগাছ থেকে ফল নামাতে পারছেন না।

অথচ এই জলপাইয়ের ওপরই ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ফিলিস্তিনি পরিবার নির্ভরশীল। পশ্চিম তীরের শহর ও গ্রামগুলোয় মানুষের চলাফেরার স্বাধীনতা নেই। দখলদারেরা তাদের নিত্য হয়রানি করে। গাড়িতে হামলা চালায়। হুয়ারার মতো কোনো কোনো জায়গা ফিলিস্তিনিদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই শহরটা এখন ভুতুড়ে চেহারা নিয়েছে। মূল সড়ক অতিক্রম করতে গেলেও এখানে সেনাবাহিনীর অনুমতি নিতে হয়।

গাজায় তাণ্ডব যখন শেষ হবে এবং ফিলিস্তিন ইস্যু থেকে সংবাদমাধ্যমগুলো সরে আসবে, তখন শুরু হবে আরেক ধরনের সহিংসতা। রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকেই তখন চলবে দৈনন্দিন নিপীড়ন। হয়তো এই নিপীড়নের মাত্রা আরও বাড়বে। এই পৃথিবীও আগের জায়গায় ফিরে যাবে। ইসরায়েলি দখলদারি ও অবরোধের দিকে তখন আর কেউ নজর দেবে না। সে কারণেই আমরা ফিলিস্তিনিরা আবারও মূলে ফিরে যেতে চাই। বলতে চাই এই সহিংসতার মূলে রয়েছে দখলদার ঔপনিবেশিক শক্তির সহিংসতা। ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিরোধেই আমাদের মুক্তি নিহিত।

  • লেইথ হানবালি স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক, ফিলিস্তিনের রামাল্লায় বিরযিট বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। নিবন্ধটি গার্ডিয়ানে প্রকাশিত।