জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অস্থিরতা ততই বাড়ছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক। মতপার্থক্য থাকবে, অভিযোগ থাকবে, পাল্টা বক্তব্যও থাকবে; কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যখন শারীরিক সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তা আর রাজনীতির সীমায় থাকে না। তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্বাচন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের ন্যূনতম শালীনতা।
সম্প্রতি শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে যৌথ ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠান প্রাণঘাতী সংঘর্ষে পরিণত হয়। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর একজন স্থানীয় নেতা নিহত হন এবং বিএনপির বহু কর্মী আহত হন। স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতেই এমন ঘটনা ঘটায় নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে।
একই সময়ে ঢাকা–৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর একাধিকবার ডিম নিক্ষেপের ঘটনাও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, সমালোচনা হতেই পারে; কিন্তু তার জবাব শারীরিক আক্রমণ হতে পারে না। একইভাবে কোনো প্রার্থী এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা নন, এই অভিযোগ তুলে তাঁকে অপমান করাও নিন্দনীয়।
সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক যেকোনো আসন থেকে নির্বাচন করতে পারেন। প্রার্থীকে ভোট দেওয়া বা না দেওয়া একান্তভাবেই ভোটারের অধিকার। তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৬ জন নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ১৩ জনই বিএনপির কর্মী বা সমর্থক। এই পরিসংখ্যানও নির্বাচনী সহিংসতার ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও একে সমানে সমান লড়াই বলা কঠিন। সমানে সমান লড়াই বলতে বোঝায় রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য। সেই ভারসাম্য বর্তমানে নেই। নব্বই–পরবর্তী বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই ছিল প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি। তারা কখনো এককভাবে, কখনো জোটগতভাবে নির্বাচনে লড়েছে। এই ভারসাম্য নষ্ট হয় তখনই, যখন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করে। বাংলাদেশে গণ–অভ্যুত্থান ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হারানোর নজির আছে। কিন্তু দল হিসেবে আওয়ামী লীগ আজ যে চরম রাজনৈতিক সংকটে, তার বড় অংশই তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের ফল।
এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় বিএনপিই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অনেক বিদেশি সংবাদমাধ্যম বিএনপির জয় প্রায় নিশ্চিত বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, ফলাফল এই প্রত্যাশার বিপরীতও হতে পারে। এমন কিছু হলে তার প্রধান কারণ হবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ, বিদ্রোহী প্রার্থী এবং দলীয় শৃঙ্খলার দুর্বলতা।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭৯ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন ৯২ জন এবং জামায়াতে ইসলামীর একজন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় এক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন। তাঁদের দুজন বিদ্রোহী প্রার্থী শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। বিএনপির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বহিষ্কার, সতর্কতা এবং দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করেও অনেক নেতা নির্বাচনের মাঠে রয়ে গেছেন। কোনো কোনো আসনে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন, যা ভোট বিভাজনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ঢাকা–১২ আসনে বিএনপি গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে প্রার্থী করেছে। অথচ এ আসনে বিএনপির
প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া–২ আসনে বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। এখানে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবীবকে। স্থানীয় নেতা–কর্মীদের বড় অংশ এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি।
নির্বাচনে জয়ের মূল সূত্র হলো বিরোধী পক্ষকে বিচ্ছিন্ন করা এবং নিজের শক্তিকে সম্প্রসারিত করা। অতীতে বিএনপি এই কৌশল প্রয়োগ করে সফল হয়েছিল। তবে এবার সেই কৌশলে তারা অনেকটাই হোঁচট খেয়েছে। আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও অনেক ক্ষেত্রে মিত্রদের গুরুত্ব দেয়নি কিংবা রাজনৈতিকভাবে তুচ্ছ করেছে।
পটুয়াখালী–৩ আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত নেতা হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। এখানে বিএনপি সমর্থন দিয়েছে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে। ঝিনাইদহ–৪ আসনে জেলা বিএনপির সদস্য সাইফুল ইসলাম ফিরোজ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এখানে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করতে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খাঁন বিএনপিতে যোগ দেন।
সিলেট–৫ আসনে জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। এই আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতিকে। নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিএনপির দুজন সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন এবং দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়েছে। যশোর–৫ আসন, কিশোরগঞ্জ–৫ আসনসহ আরও কয়েকটি আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি স্পষ্ট।
এই ৭৭ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বিএনপির সমর্থকদের ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্রদের ভোট তুলনামূলকভাবে একত্র থাকছে। বিএনপির একক প্রার্থী থাকলে এসব আসনে জয় অনেক সহজ হতো। বিভক্তির কারণে সেই জয় কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে কয়েকটি আসনে মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে আরও নাজুক করেছে।
এই অবস্থায় দলের বাইরের ভোটারদের বড় একটি অংশ কেন্দ্রবিমুখ হতে পারে। বাংলাদেশে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য কেবল দলীয় সমর্থকদের ভোট যথেষ্ট নয়। অতীতে কোনো দলই শুধু নিজস্ব ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন করতে পারেনি। ভাসমান ভোটার এবং নিরপেক্ষ নাগরিকদের সমর্থন ছাড়া সরকার গঠন অসম্ভব।
নির্বাচনে জয়ের মূল সূত্র হলো বিরোধী পক্ষকে বিচ্ছিন্ন করা এবং নিজের শক্তিকে সম্প্রসারিত করা। অতীতে বিএনপি এই কৌশল প্রয়োগ করে সফল হয়েছিল। তবে এবার সেই কৌশলে তারা অনেকটাই হোঁচট খেয়েছে। আওয়ামী লীগের মতো বিএনপিও অনেক ক্ষেত্রে মিত্রদের গুরুত্ব দেয়নি কিংবা রাজনৈতিকভাবে তুচ্ছ করেছে।
তবু এত নেতিবাচকতার মধ্যেও বিএনপির জন্য একটি আশার জায়গা রয়েছে। সেটি হলো ইসলামি ভোটের বিভাজন। একসময় জামায়াতে ইসলামী ইসলামি ভোট এক বাক্সে রাখার যে কৌশল নিয়েছিল, এবার তা কার্যকর নেই। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে জোটভুক্ত করা এবং মতাদর্শিক কারণে ইসলামী আন্দোলনের জোট ছাড়ার ফলে বিএনপি কিছু লভ্যাংশ পেতে পারে। সেই লভ্যাংশ বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে হওয়া ক্ষতির চেয়ে বেশি নাকি কম হবে, তার উত্তর মিলবে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের ফলাফলেই।
● সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি
*মতামত লেখকের নিজস্ব
