মহাত্মার শান্তিময় পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষা

আজকের দিনে মহাত্মা গান্ধীকে স্মরণ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বব্যাপী সহিংসতা, সংঘাত ও বিদ্বেষ মহামারি আকার ধারণ করেছে।ছবি: সংগৃহীত।

আজ শান্তিবাদী নেতা মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৬৯ সালের এই দিনে তিনি ভারতের গুজরাটের পোরবন্দরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সাধারণ একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনদর্শন ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাঁকে অনন্য করে তোলে।

পৃথিবীতে অনেক জাতীয়তাবাদী নেতা বা জননেতা এসেছিলেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, কিন্তু মহাত্মা এসেছিলেন সময়োত্তীর্ণ চরিত্র নিয়ে। তিনি নির্দিষ্ট সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে দীর্ঘ সময়ের বাতিঘর হয়ে উঠেছেন।

রোমাঁ রোলাঁর লেখা ‘মহাত্মা গান্ধী’ (১৯২৪) বইয়ে মহাত্মা গান্ধীকে ‘ইউনিভার্সাল বিয়িং’ বা ‘বিশ্বমানব’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

আজকের দিনে মহাত্মা গান্ধীকে স্মরণ করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্বব্যাপী সহিংসতা, সংঘাত ও বিদ্বেষ মহামারি আকার ধারণ করেছে।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির তথ্যমতে, এ মুহূর্তে পৃথিবীজুড়ে ১৩০টির মতো সশস্ত্র সংঘাত চলছে। এ সহিংসতা চলছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।

আজ শান্তি, সহাবস্থান ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতিও এর বাইরে নয়।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

শান্তির মসৃণ পথ নির্মাণে কেবল মহাত্মা গান্ধী নন, শান্তিবাদী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রনায়ক মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, নেলসন ম্যান্ডেলা, ডেসমন্ড টুটু এবং দালাই লামার মতো অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বদের পাঠ নিবিড়ভাবে সম্পন্ন করতে হবে—তাঁরা যে মানবিক, মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিময় পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেছেন, তার পরিপূর্ণতার স্বার্থে।

পৃথিবীর সব শান্তিবাদী নেতাদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী স্বতন্ত্র উচ্চতার। তাঁর জীবনই তাঁর আদর্শ। মহাত্মা গান্ধীর নৈতিকতা, ধর্মচিন্তা, সহাবস্থান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি আজও দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক।

মহাত্মা গান্ধী ছিলেন এক মহান জাতীয়তাবাদী নেতা; ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী স্বরাজ আন্দোলনের পুরোধাপুরুষ।

মহাত্মা গান্ধী আইনজীবী হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় একুশ বছর (১৮৯৩–১৯১৪) কাটিয়েছেন। এ সময় তিনি সেখানে অভিবাসী ভারতীয়দের অধিকার রক্ষায় সুদীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে নামেন।

বর্ণবৈষম্যে জরাগ্রস্ত দক্ষিণ আফ্রিকার ক্লেদাক্ত চেহারা তিনি নিজ চোখে দেখেন এবং নিজেও নানা ধরনের নিপীড়নের শিকার হন।

শুধু ‘শ্বেতাঙ্গদের জন্য’ সংরক্ষিত প্রথম শ্রেণির একটি আসনে বসার কারণে তাঁকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি বিভিন্ন সময় শারীরিকভাবে নিগৃহীত হন।

১৯৪৬ সালে নোয়াখালীতে গান্ধী।
ছবি: সংগৃহীত।

দক্ষিণ আফ্রিকার এই অভিজ্ঞতা ও কাঠামোগত বঞ্চনার পর্যবেক্ষণ তাঁর রাজনৈতিক দর্শনকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছিল।

মহাত্মা গান্ধী সিদ্ধান্ত নেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলবেন।

এ কারণে তাঁকে কয়েকবার শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং জেলে ঢোকানো হয়। তারপরও তিনি গণমানুষের অধিকার আদায়ে হাল ছেড়ে দেননি।

মহাত্মা গান্ধী দ্রোহী চেতনার এক অনন্য স্মারক। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে তিনি ৯ জানুয়ারি ১৯১৫ সালে ভারতে ফিরে আসেন।

ভারতবর্ষে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধী প্রধান নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনকে সর্বজনীন রূপ দেন।

‘সত্যাগ্রহ’ ও ‘অহিংসা’কে স্বরাজ আন্দোলনের নতুন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেন।

এ দুটি কৌশলের মূল বিষয় ছিল সত্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ—যাতে কোনো ধরনের শারীরিক হিংসা বা অস্ত্র ছাড়া কেবল নৈতিক বল প্রয়োগ করে শত্রুর মোকাবিলা করা যায়।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

তিনি সহিংসতা দিয়ে সহিংসতা মোকাবিলা করতে চাননি। তাঁর প্রতিরোধের কৌশল ছিল ‘সত্যাগ্রহ’ বা অহিংস প্রতিরোধ।

মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, অহিংসা নিষ্ক্রিয় দুর্বলতা নয়; বরং অহিংসা হলো সক্রিয় ও সাহসী নৈতিক শক্তি, যা অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক কার্যকর উপায়।

মহাত্মা গান্ধী নিজে ‘দ্য স্টোরি অব মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ’ শিরোনামে একটি আত্মজীবনী লেখেন। বইটি তিনি গুজরাটি ভাষায় রচনা করেছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মহাদেব দেশাই এটির ইংরেজি অনুবাদ করেন।

দেশাই (১৯১৭–১৯৪২) আমৃত্যু গান্ধীর সহকারী, বিশ্বস্ত অনুগামী ও দিনলিপিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় তাঁর ওপর অসংখ্য পূর্ণাঙ্গ জীবনী প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর চিঠি, প্রবন্ধ এবং জীবনদর্শন নিয়ে লেখা বইয়ের হিসাব ধরলে এই সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

গান্ধীর আত্মজীবনী ও অন্যান্য জীবনীকারের কাজ থেকে জানা যায়, মহাত্মা গান্ধীর ‘অহিংসা’ ধারণাটি হিন্দুধর্ম ও খ্রিষ্টধর্মের মূল চেতনার সমন্বয়ে পুষ্টি লাভ করেছিল।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

মহাত্মা গান্ধী মহাভারত, রামায়ণ ও বেদের প্রতি বেশ অনুরাগী ছিলেন। তিনি যখন লন্ডনে আইন পড়তে যান, তখন মহাভারত সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন।

সংস্কৃত ভাষার প্রতিও তাঁর বিশেষ মুগ্ধতা ছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও ইংরেজি ভাষার আধিপত্য ভারতের স্থানীয় ভাষাগুলোকে যে ক্রমশ দুর্বল করে ফেলছে, তা নিয়ে তাঁর উৎকণ্ঠা ছিল।

তাঁর বিশ্বাস ছিল, আমাদের ভাষার যে শক্তি, তাকে সমুন্নত রাখা গেলে জ্ঞানচর্চার পরিধি আরও সহজ ও সমৃদ্ধ হতো।

মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অসহযোগ আন্দোলন, আইন অমান্য আন্দোলন ও ডান্ডি মার্চ এবং ভারত ছাড় আন্দোলনের পর্যায়গুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

ভারত ছাড় আন্দোলনে তিনি ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ (করব অথবা মরব) ঘোষণা দেন, যা কোটি কোটি ভারতীয়কে উদ্বুদ্ধ করে।

মহাত্মা গান্ধীর এই অহিংস ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের নীতি পরবর্তী সময়ে নেলসন ম্যান্ডেলা এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের মতো বিশ্বের অন্যান্য উপনিবেশ ও বর্ণবাদবিরোধী নেতাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।

সান্ধ্য প্রার্থনার আগে মহাত্মা গান্ধী। বোম্বের জুহু সমুদ্রসৈকতে। মে/জুন ১৯৪৪।
ছবি: সংগৃহীত।

গান্ধী কেবল রাজনৈতিক আন্দোলন করেননি, তিনি সমাজ সংস্কারেও নিবিষ্ট ছিলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য তিনি জীবনব্যাপী কাজ করেছেন।

দলিত বা নিম্নবর্ণের মানুষদের তিনি ‘হরিজন’ (ঈশ্বরের সন্তান) হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। নিম্নবর্ণের মানুষ যে অস্পৃশ্য, এই ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে ভারতবর্ষজুড়ে তিনি চরকায় সুতা কাটা এবং খাদি কাপড় পরার আন্দোলন গড়ে তোলেন।

পশ্চিমের বস্তুনির্ভর আধুনিকতার খোলস মাড়িয়ে ভারতের আধ্যাত্মিক ধারণার ভেতর নতুন স্বরূপ অনুসন্ধানে তিনি সচেষ্ট ছিলেন।

মহাত্মা গান্ধী ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেশভাগ চাননি। ভারতের স্বাধীনতা বা স্বরাজ অর্জনের জন্য হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করতেন।

দ্বিজাতি তত্ত্বকে তিনি ভিত্তিহীন ধারণা বলে বিবেচনা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম কখনো একটি নতুন জাতির ভিত্তি হতে পারে না।

মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মধ্যে দেশের স্বাধীনতা, রাজনীতি, ধর্ম ও অর্থনৈতিক নীতির প্রশ্নে চিন্তার বিস্তর ফারাক ছিল।

মহাত্মা গান্ধী সহাবস্থান, বহুত্ব এবং নাগরিক অধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন শান্তির প্রতি। তিনি বুঝেছিলেন, শান্তি ছাড়া স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়। দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের সার্বিক সহিংস পরিস্থিতি আজও আমাদের সেই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

মহাত্মা গান্ধী জোর দিয়েছিলেন নৈতিকতা, অহিংসা ও সর্বধর্ম সমন্বয়ের ওপর; আর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অভিমুখিতা ছিল দ্বিজাতি তত্ত্ব ও রাজনৈতিক অধিকারের দিকে।

অন্যদিকে, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ছিলেন আধুনিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের পক্ষে; আর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ছিলেন বাস্তববাদী ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের পক্ষে।

এই চতুর্মুখী সমীকরণে মহাত্মা গান্ধীর চিন্তা শেষ পর্যন্ত মার খেয়েছে। চূড়ান্ত বিবেচনায় ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে।

মহাত্মা গান্ধী সহাবস্থান, বহুত্ব এবং নাগরিক অধিকারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন শান্তির প্রতি। তিনি বুঝেছিলেন, শান্তি ছাড়া স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়।

দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের সার্বিক সহিংস পরিস্থিতি আজও আমাদের সেই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

আমরা যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তবে দেখব সহিংসতা, ঘৃণা, ক্লেদ ও অশ্রদ্ধার চর্চা এক স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে উঠছে।

পারস্পরিক ঘৃণা চর্চার পরিধি ক্রমে বাড়ছে। সমাজ হয়ে উঠছে প্রতিশোধপরায়ণ। তবে মনে রাখতে হবে, কেউ ঘৃণা বা সহিংসতাবোধ নিয়ে জন্মায় না। ঘৃণা বা সহিংসতা শেখানো একটি বিষয়, যা রুগ্‌ণ সামাজিক বাস্তবতা থেকে তৈরি হয়।

মহাত্মা গান্ধীর শিক্ষা হলো, ‘চোখের বদলে চোখ নিলে সারা পৃথিবী অন্ধ হয়ে যাবে।’ সব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে ক্ষমা ও শান্তির পথে হাঁটতে হবে।

প্রতিশোধ কেবল আরেকটি প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। শান্তিই হতে পারে আমাদের স্থায়ী গন্তব্য।

মহাত্মা গান্ধীর ঘরানার সমচিন্তক ডেসমন্ড টুটুর জগৎখ্যাত বইয়ের শিরোনাম ধার করে বলতে চাই, ‘দেয়ার ইজ নো ফিউচার উইদাউট ফরগিভনেস’—ক্ষমা ছাড়া আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

শান্তির কোমল অনুভূতি বুকে ধারণ করি এবং একটি সহনশীল সমাজ বিনির্মাণের সহযাত্রী হই। শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলেই মহাত্মা গান্ধীর স্বপ্ন ও আদর্শ পূর্ণতা পাবে।

  • খান মো. রবিউল আলম যোগাযোগ পেশাজীবী ও শিক্ষক।