ঢাকা শহরে একজন ‘জোহরান মামদানি’ কোথায় পাব

‘ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার।’কোলাজ: প্রথম আলো

এ বছরের প্রথম দিনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র জোহরান কোয়ামে মামদানি শপথ নিয়েছেন। বৈচিত্র্যের কারণে নিউইয়র্ককে বলা হয় ‘বিশ্বের রাজধানী’। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই শহরটির নতুন মেয়রের বয়স মাত্র ৩৪ বছর। আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় জন্মগ্রহণ করা মামদানি নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও প্রথম দক্ষিণ এশীয় মেয়র, যিনি পবিত্র কোরআন হাতে শপথ নিয়েছেন।

২০২৫-এর নভেম্বরের নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয় প্রমাণ করে, গ্রাসরুট ক্যাম্পেইন বা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের প্রচারণা বড় শক্তিকে রুখে দিতে পারে। মামদানি প্রমাণ করেছেন, সততা আর হাসিমুখ নিয়ে মানুষের কাছে গেলে মানুষ ফিরিয়ে দেয় না।

মামদানির প্রচারণা ছিল সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক। রেন্ট ফ্রিজ অর্থাৎ অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাটের ভাড়া বাড়ানো যাবে না। গণপরিবহন হবে ফ্রি। সরকারি মুদিদোকান থেকে মানুষ সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে পারবে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য থাকবে নিখরচায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র। শহর হবে সবুজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আনা হবে বিপ্লব। আর ‘খারাপ ল্যান্ডলর্ড’দের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কড়া ব্যবস্থা। বিশেষ করে এটা ছিল জোহরান মামদানির হাউজিং পলিসির মূল স্তম্ভ।

নিউইয়র্কে ‘খারাপ ল্যান্ডলর্ড’ বা ‘স্লামলর্ডস’ বলতে বোঝায়, যাঁরা ভাড়াটেদের অধিকার লঙ্ঘন করে বাড়ির জিনিসপত্র মেরামত করে না, হ্যাজার্ডাস পরিবেশ তৈরি করে রাখে, অবৈধ ফি আরোপ করে। মামদানি এদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ পলিসি নিয়েছেন।

শপথের পরপরই মামদানি ‘মেয়রস অফিস অব মাস এনগেজমেন্ট’ গঠন করেছেন, যাতে নাগরিকেরা সরাসরি শহর পরিচালনায় অংশ নিতে পারেন। নিউইয়র্কবাসীর জন্য এটা একেবারেই নতুন ধারণা। অর্থাৎ সব মিলে পরিবর্তন আসছে।

আরও পড়ুন

২.

জোহরান মামদানির মেয়র হিসেবে অভিষেক অনুষ্ঠান দেখছিলাম। ২৪ মিনিট ধরে বক্তৃতা দিলেন তিনি। বললেন বিস্তৃত ও সাহসিকতার সঙ্গে নিউইয়র্ক শাসন করার কথা।

নিশ্চয়ই মামদানির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তিনি যে বিনা পয়সায় অনেক কিছু দেওয়ার বা করার পরিকল্পনা করেছেন, এর জন্য চাই অর্থ। এই অর্থ তিনি আনবেন ধনীদের ওপর অতিরিক্ত করারোপ করে। কিন্তু সেটা করলে ধনীরা নিউইয়র্ক থেকে ব্যবসা অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিতে পারেন, এমন আলোচনাও আছে। আর যেকোনো কিছু করার জন্য তাঁর প্রয়োজন ‘বিরোধী পক্ষ’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা।

মুখোমুখি অবস্থান থেকে সাম্প্রতিক সময়ে দুজনই সরে এসেছেন। মামদানির সামনে নিশ্চয় আরও অনেক বাধাবিপত্তি আছে, যেগুলো গণমাধ্যমে খুব করে আসেনি। আর কাজ করতে গেলে বাধা, চ্যালেঞ্জ আসবেই। যিনি জনগণের কাজে নামবেন, তাঁর কিছু ভুলও হবে। যিনি কোনো কাজ করবেন না, তাঁর ভুলও হবে না।

এই শহরে আমরা চাই একজন জোহরান মামদানির মতো মেয়র, যিনি হবেন তরুণ, সাহসী, প্রোগ্রেসিভ। যিনি বলবেন, ঢাকাকে নোংরা শহর থেকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, বাসযোগ্য শহরে রূপান্তর করব। কিন্তু তিনি কোথা থেকে আসবেন? তিনি তো দূর কোনো আসমান থেকে আসবেন না। আমাদের ভেতর থেকে একজন মামদানিকে বের করে আনতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণদের সুযোগ দিতে হবে।

প্রায় এক বছর ধরে জোহরান মামদানির কথাবার্তা, আচরণ, ভাষণ, চিন্তা-বিশ্বাস—প্রায় সবকিছু অনুসরণ করছি। কখনো কখনো তাঁকে মনে হয়েছে যেন তরুণ বারাক ওবামা। ২০০৮ সালে ওবামা যখন ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার জন্য লড়ছিলেন, পরে মনোনয়ন পেলেন এবং নির্বাচনে জয়লাভ করলেন, তাঁর তখনকার সেই ভাষণগুলোর কথা মনে পড়ছিল। মনে হলো, নিউইয়র্কে আরেকজন বারাক ওবামা উঠে এসেছেন।

বিষয়টি আলাপ করছিলাম সহকর্মী তাসনিম আলমের সঙ্গে। তাসনিম মত দিলেন, দুজনের ভাষণের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ওবামা বক্তৃতাটা ভালো দিতেন নিঃসন্দেহে। তবে মামদানির বক্তৃতায় বাড়তি যেটা পাওয়া যায়, সেটা হলো বিশ্বাস। মনে হয় তিনি বিশ্বাস থেকেই কথা বলছেন।

এটা অবশ্য সারা দুনিয়ায় রাজনীতিবিদদের সমস্যা। ভোট বা জনসমর্থনের জন্য বক্তৃতা দিয়ে ফাটিয়ে দেন অনেকেই; কিন্তু সে কথা বিশ্বাস করেন কতজন? রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গল্প অহরহ দেখি বিশ্বজুড়ে। যার বিশ্বাস ও কথার মধ্যে মিল থেকে, তিনিই সঠিক মানুষ, সঠিক রাজনীতিবিদ। জোহরান মামদানিকে এখন পর্যন্ত এ রকম মানুষই মনে হচ্ছে।

শুধু রাজনীতিবিদদের দোষ দিই কেন। আমাদের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী কী করছেন? অপরের মুখে ঝাল খাওয়া বুদ্ধিজীবী অন্তত আমাদের সমাজে কম নেই। আমরা যাঁরা সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট তাঁরাই–বা কতটা বিশ্বাসের সঙ্গে লিখি? যাঁরা টক–শো করি, কতটা বিশ্বাসের সঙ্গে বলি? কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য লেখার মানুষ, বলার মানুষ কম নেই এই সমাজে।

আরও পড়ুন

৩.

আমাদের এই ঢাকা শহরে একজন মামদানির মতো সোচ্চার মানুষ দরকার। কারণ, এই শহরটা নির্জীব হয়ে পড়েছে। এতটা হতশ্রী ঢাকা শহর আমরা কোনো দিন দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এমনিতে কোনো ধরনের উন্নয়নকাজ এই শহরে নেই বা হচ্ছে না। প্রধান সড়ক থেকে একটু সরু সড়ক, গলির মধ্যে ঢুকলে দেখা যায় এই শহরের প্রকৃত চেহারা। ভাঙা সড়ক, ব্যস্ত সড়কের ওপর দোকান, হাজার রকম অন্যায় দেখেও নাগরিকেরা কোনো কথা বলে না। কারণ, এটা এখন ভয়ের শহর। নিজের গা বাঁচিয়ে চলাই এখন নিরাপদ পন্থা।

ধোঁয়া, ধুলাদূষণ, শব্দদূষণ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা আর কী বলব?

কিন্তু এভাবে তো একটা শহর দীর্ঘদিন চলতে পারে না। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেই নির্বাচিত মেয়র নেই। আছেন দুজন প্রশাসক। এর মধ্যে উত্তরে যিনি আছেন, কখনো কখনো তাঁর উপস্থিতি কিছুটা টের পাওয়া যায়। কাজে যতটা, তার চেয়ে কথায় কিছুটা উপস্থিতি তাঁর আছে। কিন্তু দক্ষিণে যিনি প্রশাসক আছেন, তিনি কী কাজ করেন, নাগরিকেরা জানতে পারেন বলে মনে হয় না।

জনপ্রতিনিধি যদি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন, তার কিছুটা হলেও জবাবদিহি থাকে। তিনি জানেন, তাঁকে আবার জনগণের দরজায় দাঁড়াতে হবে। আর যিনি নির্বাচিত নন, তিনি দায়বদ্ধ থাকেন, তাঁকে যিনি বা যাঁরা নিয়োগ দিয়েছেন, তাঁদের কাছে। অনির্বাচিত মেয়র বা প্রশাসক খুশি থাকেন তাঁর নিয়োগকর্তার ইচ্ছার দাস হয়ে। জনগণ বা মানুষের প্রতি তাঁর কোনো জবাবদিহি নেই।

ঢাকায় প্রতিদিন ৬,৪৬৫ থেকে ৭,৫০০ টন ময়লা উৎপন্ন হয়, কিন্তু কালেকশন রেট মাত্র ৩৭-৫০ শতাংশ। মোট বর্জ্যের ১০ শতাংশ প্লাস্টিক হলেও এর মাত্র ৩৭ শতাংশ রিসাইকেল হয়। প্লাস্টিক বর্জ্যের বাকি অংশ যায় ল্যান্ডফিলে, নদীতে, খালে। মাতুয়াইল ও আমিনবাজার ল্যান্ডফিল দুটোই ক্যাপাসিটি ছাড়িয়ে গেছে, ফলে রাস্তায় ময়লার স্তূপ, নালা বন্ধ, সামান্য বৃষ্টিতে জলজট—এসব আমাদের নিত্যসঙ্গী।

ঢাকায় বছরে বছরে বাড়িভাড়া বাড়ছে। কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা রেন্ট কন্ট্রোল আইন চালু হলে লাখ লাখ ভাড়াটের জীবনযাত্রা সহজ হতো। ঢাকায় দৈনিক ৩-৪ ঘণ্টা জ্যামে নষ্ট হয়, অর্থনৈতিক ক্ষতি বিলিয়ন ডলার। কমিউনিটি এনগেজমেন্ট দিয়ে রুট অপটিমাইজ করলে শহরটা চলমান হতো। ফুটপাত দখলমুক্ত হলে মানুষ একটু হাঁটতে পারত, আরেকটু সবুজায়ন হলে মানুষ বড় করে শ্বাস নিতে পারত।

৪.

এই শহরে আমরা চাই একজন জোহরান মামদানির মতো মেয়র, যিনি হবেন তরুণ, সাহসী, প্রোগ্রেসিভ। যিনি বলবেন, ঢাকাকে নোংরা শহর থেকে পরিচ্ছন্ন, সবুজ, বাসযোগ্য শহরে রূপান্তর করব। কিন্তু তিনি কোথা থেকে আসবেন? তিনি তো দূর কোনো আসমান থেকে আসবেন না। আমাদের ভেতর থেকে একজন মামদানিকে বের করে আনতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণদের সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় নির্বাচন ফিরিয়ে আনতে হবে। আর আমরা যাঁরা সাংবাদিক, নাগরিক কিংবা তরুণ, তাঁদের চাপ সৃষ্টি করতে হবে জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য। কোনোভাবেই মাথানত করা যাবে না।

ঢাকা শহরটা আমাদের সবার। এটাকে বাঁচাতে সত্যিই একজন মামদানি দরকার। প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রস্তুত তাঁকে খুঁজে বের করতে বা তাঁর মতো নেতৃত্ব গড়ে তুলতে?

  • কাজী আলিম-উজ-জামান প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক।

    ই–মেইল: [email protected]

*মতামত লেখকের নিজস্ব