আবারও হুমকির মুখে পড়তে পারে বাক্​স্বাধীনতা

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে বাক্​স্বাধীনতা হরণের স্মৃতি আমরা এখনো ভুলিনি। এ বাস্তবতায় সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর খসড়া আমাদের ‘আশঙ্কা’কে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করছে। সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে লিখেছেন সহুল আহমদ

বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে দেশ ও বিদেশের প্রায় সব মহল থেকে তীব্র প্রতিবাদ এসেছিল এবং বাক্​স্বাধীনতাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এ আইনকে ব্যবহার করে নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের খতিয়ান বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে এসেছে।

২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এ আইনের অধীন সাড়ে ৪ হাজারের বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, যার মধ্যে একটা বড় অংশই ছিলেন রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক। স্কুলের শিক্ষার্থী, নিরক্ষর কৃষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, কার্টুনিস্ট, লেখক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মী—বহু মানুষ এই নিপীড়নমূলক আইনের শিকার হন।

এ আইনের অধীন মামলার বেশির ভাগই করেছিলেন সরকারি দলের লোক ও রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল বাক্​স্বাধীনতা হরণে আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম বড় হাতিয়ার।

দেশ–বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ এনে কেবল খোলস বদলানো হলেও মূল নিপীড়নমূলক কাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে (পরবর্তী সময়ে আইন) কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হলেও সংজ্ঞায়নের অস্পষ্টতা রয়ে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন

তবে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের সাম্প্রতিক খসড়া মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতিকে নষ্ট তো করছেই, বরং এটি আগের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য চরম হুমকি হয়ে উঠতে পারে, প্রস্তাবিত খসড়ার এমন কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় আলোচনা করা যাক। 

প্রথমেই দেখা যেতে পারে ৮(২) নম্বর ধারার ‘কতিপয় তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করিবার ক্ষমতা’-সংক্রান্ত অংশটি। বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত কোনো তথ্য-উপাত্ত যদি দেশের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে বা সহিংসতা উদ্রেক করে বা বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা প্রদান করে, তাহলে সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

এই অংশের সংজ্ঞার অস্পষ্টতা নিয়ে আগেও প্রচুর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও বর্তমান আইনের সঙ্গে প্রস্তাবিত খসড়ার মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, নতুন খসড়ায় প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে ‘আশঙ্কা’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে।

গুজব বা অপতথ্য রোধ করার জন্য প্রয়োজন আরও বেশি পেশাদার ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর বাড়ানো। উল্টো সরকার যদি এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে যায়, তাহলে সমাজে গুজব ছড়ানো বা গুজবে বিশ্বাস করার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে। 

অর্থাৎ কেবল জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করা নয়, যদি ‘ক্ষুণ্ন করিবার আশঙ্কা থাকে’, তবু এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এই ‘আশঙ্কা’ শব্দটির সংযোজন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারকে এতটা বিস্তৃত করেছে যে যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ডকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের ইচ্ছেমতো ‘আশঙ্কাজনক’ বলে চিহ্নিত করতে পারবে। 

এ ছাড়া ৮(২) ধারায় নতুন আরেকটি বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, কর্তৃপক্ষের কাছে যদি কোনো তথ্য ‘কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানহানিকর বা রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ মনে হয়, তাহলেও তা ব্লক বা অপসারণ করা যাবে। এর মাধ্যমে গণমাধ্যমে প্রকাশিত যেকোনো ধরনের প্রতিবেদনকেও সহজেই আটকে ফেলা যাবে।

তারপরও ‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ বিষয়টিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশে সরকার ও রাষ্ট্র যেভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে, সেখানে সরকারের যেকোনো সমালোচনাই রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বলে চিহ্নিত করার সুযোগ রয়ে যায়।  

আরও পড়ুন

দ্বিতীয়ত, সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৫ নম্বর ধারাটি ছিল ‘যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশসংক্রান্ত’। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্ল্যাকমেলিং, যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ ম্যাটেরিয়াল (সিএসএএম) বা সেক্সটর্শন প্রতিরোধ করা।

খসড়ায় এই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে ‘মানহানিকর তথ্য’ এবং যৌন হয়রানিমূলক পরিচ্ছেদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ‘মানহানি বা হেয়প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়’।  

খসড়ায় মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তার ব্যাপ্তি প্রায় অসীম। মানহানির সংজ্ঞার ক্ষেত্রে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতোই ঔপনিবেশিক ১৮৬০ সালের পেনাল কোডকে মানদণ্ড ধরা হয়েছে এবং এর পরিধিকে আরও প্রসারিত করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তির ‘সুনাম, মর্যাদা বা চরিত্র’ ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে ‘মিথ্যা, বিকৃত, বিভ্রান্তিকর, অপমানজনক বা ক্ষতিকর’ তথ্য-উপাত্ত-বক্তব্যও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; এমনকি তা যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি, সম্পাদিত বা পরিবর্তিতও হয়। 

একইভাবে ‘হেয়প্রতিপন্ন’–এর অর্থ বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তির মর্যাদা, সম্মান, সুনাম বা সামাজিক অবস্থানকে এমন কোনো কথা, আচরণ, প্রকাশনা, ইঙ্গিত বা কার্যকলাপের মাধ্যমে ক্ষুণ্ন করা, যার ফলে উক্ত ব্যক্তি অন্যের কাছে অপমানিত, তুচ্ছ, নিকৃষ্ট বা অসম্মানজনক হিসেবে প্রতীয়মান হন বা তাঁর সামাজিক মর্যাদা বা সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়’।  

আরও পড়ুন

‘মানহানি’ ও ‘হেয়প্রতিপন্ন’, এ দুটির সংজ্ঞা পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, কোনো রাজনীতিবিদ কিংবা সরকারের কোনো মন্ত্রী বা মন্ত্রণালয় বা রাষ্ট্রীয় যেকোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির খবর প্রকাশ বা তীব্র সমালোচনাকে খুব সহজেই এই ধারার অধীন অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে।

এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম, স্যাটায়ার বা রাজনৈতিক কার্টুনকেও এর আওতায় এনে মামলা দেওয়া সম্ভব। কারণ, যেকোনো রাজনৈতিক মিম বা কার্টুন কোনো না কোনো নেতার রাজনৈতিক অবস্থানকে ব্যঙ্গ করে। শাসকগোষ্ঠী সহজেই দাবি করতে পারে যে এসবের মাধ্যমে তাদের ‘মর্যাদা, সুনাম বা সামাজিক অবস্থান’ ক্ষুণ্ন হয়েছে। উল্লেখ্য, হেয়প্রতিপন্নের সংজ্ঞাতে কথা, আচরণ, প্রকাশনার পাশাপাশি ‘ইঙ্গিত’ও যুক্ত করা হয়েছে।

একইভাবে শাসকগোষ্ঠী দাবি করতে পারে, কোনো সংবাদ প্রতিবেদন বা লেখা বা আলোচনা বা কোনো তথ্য তাদের সুনাম বা চরিত্রকে ক্ষুণ্ন করেছে। আবার মানহানির সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সুনাম, চরিত্র, মর্যাদার মতো অস্পষ্ট বর্গের সঙ্গে কেবল ‘মিথ্যা’ বা ‘বিকৃত’ তথ্য যুক্ত করা হয়নি, বরং ‘বিভ্রান্তিকর’ শব্দটাও যুক্ত করা হয়েছে। এখানে ‘বিভ্রান্তিকর’ শব্দটা খোদ শব্দের মতোই ‘বিভ্রান্তিকর’।

কোনো একটি রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক তথ্যকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। সরকার চাইলে যেকোনো অপ্রিয় বা অস্বস্তিকর ব্যাখ্যাকে ‘বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়ে এ আইনের মাধ্যমে দমন করতে পারবে।  

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল ও এ আইনে গ্রেপ্তার সবার মুক্তি দাবিতে ছাত্র সমাবেশ।
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

তৃতীয় দিকটি গুজবসংক্রান্ত। খসড়ার ২৬ নম্বর ধারায় ‘সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রচার’কে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। এটা নতুন সংযোজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য বৃদ্ধির অজুহাতে এ ধারার অবতারণা।

এতে গুজব ও অপতথ্যের দুটি পৃথক সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। গুজব বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘কোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবি, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করিবার সম্ভাবনা রাখে।’ 

অন্যদিকে অপতথ্যের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘এমন কোনো মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত, প্রতারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি, প্রকাশ বা প্রচার করা হয়।’ 

প্রথমত, গুজব বা অপতথ্য—দুটির সংজ্ঞার ‘অসমর্থিত’ বা ‘বিকৃত’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ বর্গের অধীন সাইবার স্পেসে সরকারবিরোধী প্রায় সব সমালোচনাকেই অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। আবার এখানে ব্যক্তি, জনসাধারণ, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে ‘বিভ্রান্ত’ করার অংশ দিয়ে আসলে পুরো বিষয়টাকে আরও বায়বীয় করে ফেলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

যদি এটাকে আগের হেয়প্রতিপন্নের অংশের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, তাহলে বোঝা যাবে, যেকোনো ধরনের তথ্য, যা সরকার বা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে অস্বস্তি ফেলতে পারে, সেগুলোকেই এই দুই ধারার অধীন ফেলে দেওয়া খুবই সহজ।

সংবাদপত্রের যেকোনো অনুসন্ধানীমূলক প্রতিবেদনকেও এ দুই ধারার অধীন ফেলে দেওয়া সম্ভব। কারণ, কোনটা ‘বিভ্রান্তিকর’ বা কোনটা ‘বিকৃত’, তা সংজ্ঞায়িত করার এখতিয়ার থাকে কেবল ক্ষমতাসীনদের! 

দ্বিতীয়ত, গুজব ও অপতথ্যকে কেবল শাস্তিমূলক বা ফৌজদারি আইন দিয়ে দমনের এই চেষ্টা প্রমাণ করে যে ডিজিটাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জটিলতা নীতিনির্ধারকেরা আমলে নেননি।

ধরা যাক, একজন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটা ‘গুজব বা অপতথ্য’ (একেবারে সংজ্ঞানুযায়ী) প্রকাশ করেছেন। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েক শ সাধারণ নাগরিক সরল বিশ্বাসে সেটিকে ‘সত্য’ মনে করে শেয়ার করল। এখন আইন কি সেই প্রাথমিক প্রচারকারী এবং সরল বিশ্বাসে শেয়ার করা নাগরিককে সমান অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করবে?

আরও পড়ুন

আবার একটা অপতথ্য কয়েক হাজার লোক শেয়ার করতে পারে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি এই কয়েক হাজার লোককে ধরবে, নাকি এর মধ্যে মাত্র একজনকে ধরবে? যদি দেশের বাইরে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইডি থেকে এটি ছড়ানো হয় বা কোনো পেজ বন্ধ করার পর মুহূর্তেই নতুন পেজ খোলা হয়, তবে ফৌজদারি আইন দিয়ে তা কীভাবে ঠেকানো সম্ভব?

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তথ্যের বহুমাত্রিক প্রবাহকে আমলে না নিয়ে কেবল ঢালাওভাবে একে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার অর্থ হলো বিরোধী মত দমনে সরকারের হাতে আরও একটি দমনপীড়নের হাতিয়ার তুলে দেওয়া।

গুজব বা অপতথ্য রোধ করার জন্য প্রয়োজন আরও বেশি পেশাদার ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর বাড়ানো। উল্টো সরকার যদি এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে যায়, তাহলে সমাজে গুজব ছড়ানো বা গুজবে বিশ্বাস করার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল ও এই আইনে আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ
ফাইল ছবি : প্রথম আলো

এর পাশাপাশি প্রস্তাবিত সংশোধনীতে সাজার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং এমন কিছু নতুন অনুচ্ছেদ আনা হয়েছে, যা নাগরিকদের ওপর রাষ্ট্রের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে, জবাবদিহি কমাবে।

সম্প্রতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রীয়াজও বলেছেন, সংশোধনীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচারের ভার নির্বাহী বিভাগের ওপর ন্যস্ত হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন দলের অনুকূলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। (প্রথম আলো, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬) 

সারসংক্ষেপ করলে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা–সংক্রান্ত ধারাটি বাদ দেওয়া ছাড়া এই সংশোধনীতে ইতিবাচক পরিবর্তন তো নেই–ই, উল্টো সামগ্রিকভাবে বিলুপ্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতোই বিপজ্জনক হতে যাচ্ছে। মানহানির ক্ষেত্রে কেবল ঔপনিবেশিক বিধিকে সূত্র হিসেবেই হাজির করেনি, বরং এর পরিধিও আরও বৃদ্ধি করেছে।

‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’ বিষয়টিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, তা স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশে সরকার ও রাষ্ট্র যেভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে, সেখানে সরকারের যেকোনো সমালোচনাই রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বলে চিহ্নিত করার সুযোগ রয়ে যায়।

এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ফৌজদারি মানহানিকে বিলুপ্ত করতে আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধের বাইরে রাখার আহ্বান জানিয়েছিল।

কিন্তু নতুন সংশোধনীতে মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন—এই শব্দগুলোর ব্যাখ্যা আরও অস্পষ্ট এবং সীমারেখাকে প্রায় অসীম করে তোলা হয়েছে। মানহানিকে কেবল ব্যক্তির ক্ষেত্রেও রাখা হয়নি, প্রতিষ্ঠানের জন্যও যুক্ত করা হয়েছে।

সাইবার সুরক্ষা আইনের উদ্দেশ্য নাগরিককে ডিজিটাল পরিসরে সুরক্ষা প্রদান করা হলেও এই সংশোধনীর খসড়া থেকে অনুমান করা যায়, নাগরিকের গতিবিধি ও অধিকার আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করার দিকেই সরকারের ঝোঁক।

এই খসড়া সংশোধনী যেমন প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি এর অস্পষ্ট ধারাগুলো যেকোনো সরকারবিরোধী মত, স্যাটায়ার বা ন্যূনতম সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পথ প্রশস্ত করেছে।

ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা বা কটূক্তির কারণে গ্রেপ্তারের নজির তৈরি হয়ে আছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে বাক্​স্বাধীনতা হরণের স্মৃতি আমরা এখনো ভুলিনি। এ বাস্তবতায় সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর খসড়া আমাদের ‘আশঙ্কা’কে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করছে।

● সহুল আহমদ লেখক ও গবেষক

* মতামত লেখকের নিজস্ব