দীর্ঘ সময় পর দেশের জনগণের সরাসরি ভোটে একটি সরকার গঠন হতে যাচ্ছে। জুলাইয়ের উত্তাল গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছর দেশ কোনো রাজনৈতিক সরকারের অধীনে ছিল না। এর আগে দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে একধরনের অঘোষিত স্বৈরশাসন, স্বেচ্ছাচারী ও জনবিচ্ছিন্ন সংসদ প্রত্যক্ষ করেছে এই জনপদ। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এবার ব্যালটের মাধ্যমে জনতা তাদের রায় দিয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিজয়ী জনপ্রতিনিধিরা এখন রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন অধ্যায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আমরা এত দিন একটি উৎসবমুখর রাজনৈতিক পরিবেশের অপেক্ষায় ছিলাম। অথচ এরই মধ্যে দেশের কিছু জায়গায় নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা ও সহিংসতার খবর জনমনে ভীতি তৈরি করছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
বিগত প্রায় দেড় যুগে দেশের শাসনব্যবস্থা এমন একপর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছিল যে, সংসদ নামক প্রতিষ্ঠানটি কেবল ক্ষমতার বৈধতা দেওয়ার একটি যান্ত্রিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছিল।
জনপ্রতিনিধিরা সেখানে গিয়ে জনগণের অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার পরিবর্তে লিপ্ত ছিলেন চাটুকারিতা ও নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে। মানুষের মৌলিক অধিকার, জীবনযাত্রা কিংবা কৃষক ও শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা নিয়ে কোনো জোরালো আলোচনা সেখানে হয়নি। সেই সংসদে জনগণের কোনো কার্যকর অংশীদারত্ব ছিল না। বরং সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধের আয়োজনই সেখানে চূড়ান্ত হতো।
দেশের মানুষের জন্য কাজ করার কথা থাকলেও একশ্রেণির সংসদ সদস্য ব্যস্ত ছিলেন জনগণের সম্পদ লুটে নিতে এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা গোষ্ঠীর তোষণে। আদালতের ক্ষমতা খর্ব করা থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা তখন নিয়মে পরিণত হয়েছিল।
তখন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে একের পর এক পরিবেশ ও প্রকৃতিবিধ্বংসী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সেই দীর্ঘ অন্ধকার শেষে এখন নতুন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশায় বাংলাদেশ।
সংসদ যখন কার্যকর থাকে না, তখন জনতা অনিবার্যভাবে রাজপথে নেমে আসে। জনতার সঙ্গে রাজপথে নেমে আসে সংঘাতও। গত ১৮ বছরে আমরা নিয়মিতভাবে এই চিত্র দেখেছি। জনদাবি আদায়ের কোনো কার্যকর সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে আস্থা না থাকায় শিক্ষার্থী, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে বাধ্য হয়ে রাজপথে নামতে হয়েছে।
জনপ্রতিনিধিরা যেহেতু তাদের নাগালের মধ্যে ছিলেন না, তাই মানুষের সামনে রাজপথ ছাড়া অন্য কোনো পথও ছিল না। ফলে প্রতিটি দাবির জন্য সাধারণ মানুষকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে। পুলিশি লাঠিপেটা ও জলকামানের পাশাপাশি ছিল বানোয়াট মামলার অন্তহীন যন্ত্রণা। রাজপথে নামা মানেই ছিল ব্যক্তিগত জীবনে দুর্ভোগ।
যদি রাজপথই সব সমস্যার সমাধানের একমাত্র স্থান হয়ে থাকে, তাহলে জনগণের কষ্টার্জিত ভোট ও বিপুল ব্যয়ের এই নির্বাচনের তাৎপর্য প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশে একটি স্বস্তির পরিবেশ অপরিহার্য।
একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় সড়ক অবরোধের কারণে শহরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট ও অপচয় হয়েছে অজস্র কর্মঘণ্টা। রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকার দৃশ্যও আমরা বহুবার দেখেছি। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিক্ষা ও অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তার প্রভাব আমরা এখনো বহন করছি, হয়তো আরও বহুকাল করব। দেশের মানুষ বারবার এই সংকট থেকে মুক্তি চেয়েছে, কিন্তু কার্যকর গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকায় রাজপথই হয়ে উঠেছিল একমাত্র ভরসা।
এখন আমাদের সামনে নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এবং একই সঙ্গে একটি বিরোধী দল তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে। আমরা আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করি, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি আর কখনোই অসহনীয় রাজনীতিতে ফিরে যাবে না।
আমাদের ইতিহাসের বড় শিক্ষা হলো, রাজনীতির দ্বন্দ্ব যখন সংসদের বাইরে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা হয়, তখন সেখানে যুক্তিতর্কের পরিবর্তে বাহুবল প্রাধান্য পায়। গণতন্ত্রে সংসদই সব বিতর্কের কেন্দ্রস্থল। সেখানে আলোচনার মাধ্যমে জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসা উচিত।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্ব হবে জনদাবিগুলো নিয়মিতভাবে সংসদে তোলা। জনগণের কষ্টের কথা সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া বিরোধী দলের দায়িত্ব, আর তা যৌক্তিকভাবে সমাধান করা সরকারের কর্তব্য। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাংলাদেশে অনেকটাই বিস্মৃত ছিল। তাই জনগণের আশা, এবার সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল সমানভাবে দায়িত্বশীল হবে।
ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর কিছু জায়গায় যে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, তা গণতন্ত্রের পথে প্রথম বাধা। নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবেই। বিজয়ীদের বিনয় এবং পরাজিতদের ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। যাঁরা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছেন, তাঁরা মূলত দেশের আইন ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকেই অস্বীকার করছেন।
মনে রাখতে হবে, গত দেড় বছর দেশের সাধারণ মানুষ অনেক আশা নিয়ে রাজনৈতিক সরকারকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় ছিল। নতুন সরকারের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
যদি রাজপথই সব সমস্যার সমাধানের একমাত্র স্থান হয়ে থাকে, তাহলে জনগণের কষ্টার্জিত ভোট ও বিপুল ব্যয়ের এই নির্বাচনের তাৎপর্য প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশে একটি স্বস্তির পরিবেশ অপরিহার্য।
কারণ, দীর্ঘদিন ধরে মানুষ তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রকাশের সুযোগ পায়নি এবং নানা নাগরিক কষ্টে জীবন কাটিয়েছে। এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট ও রাজনৈতিক সংঘাত কমানোর দায়িত্ব নতুন নেতৃত্বের ওপর।
রাজপথকে বিশ্রাম দেওয়া মানে রাজনৈতিক অনুপস্থিতি নয়, বরং এর অর্থবহ ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রতিবাদ বা সংহতির জন্য সব সময় রাস্তা অবরোধ করতেই হবে—এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর সমাধান আসতে হবে সংসদ থেকেই। যখন একজন নাগরিক জানবেন যে সংসদে তাঁর হয়ে জনপ্রতিনিধি কথা বলছেন, কিংবা গণমাধ্যম যথাযথভাবে সংসদীয় বিতর্ক তুলে ধরছে, তখন মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।
তাঁরা আর রাজপথ দখল করে নাগরিক ভোগান্তি তৈরি করতে আগ্রহী হবেন না। বিশেষ করে কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্ররা—যাঁরা তাঁদের ন্যায্য দাবিতে মাসের পর মাস আন্দোলন করেন, তাঁরা এবার সংসদের কাছ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন। বিচার বিভাগের সংস্কার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্বসহকারে সংসদে উত্থাপিত হওয়া প্রয়োজন।
বিগত সরকারের সময়ে প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি যে অবহেলা দেখা গেছে এবং নদীনালা ও বন দখলের যে প্রবণতা চলেছে, তার বিরুদ্ধে এবার সংসদকে সোচ্চার হতে হবে। সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করা জরুরি, যাতে জনগণের প্রতিটি টাকার হিসাব যথাযথভাবে তদারক করা যায়। রাজনীতির চর্চা যখন প্রাসাদ বা রাজপথে নয়, বরং সংবিধানসম্মত নির্ধারিত কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে, তখনই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ফিরে আসবে। এটি উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে পরিবর্তন এসেছে, তার সার্থকতা নির্ভর করছে একটি স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ সরকার গঠনের ওপর। জনগণ এবার কেবল নির্বাচন চায়নি, তারা চেয়েছে ক্ষমতায় প্রকৃত অংশীদারত্ব। সংসদের ভেতরে ও বাইরে জনমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই হবে নির্বাচিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রকৃত পরীক্ষা।
রাজপথের আন্দোলনে কাঁদানে গ্যাসের শেলের ধোঁয়া মানুষকে দীর্ঘদিন ভুগিয়েছে। বাংলাদেশ এখন একটি পরিপক্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশায়। সাধারণ মানুষ দিন শেষে শুধু শান্তিতে বাঁচতে চায় এবং নিজের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত দেখতে চায়। নতুন সংসদের ওপর মানুষের প্রত্যাশা মোটাদাগে এতটুকুই।
ক্ষমতাসীন দল যেন অহংকার পরিহার করে সর্বস্তরের মানুষকে আলিঙ্গন করে নেয়, আর বিরোধী দল যেন হীনস্বার্থে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতিতে ফিরে না যায়। আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে গেলে রাজনীতির নামে সহিংসতা আবার রাজপথে ফিরে আসবে, যা কারও কাম্য নয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের মাধ্যমে যে নতুন রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হচ্ছে, তা যেন সত্যিকারের কল্যাণমুখী ও অহিংস পথনির্দেশক হয়। রাজপথ ফিরে পাক তার স্বাভাবিকতা, আর সব মতপার্থক্যের সমাধান হোক জাতীয় সংসদে।
সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব
