ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণ করতে যুক্তরাষ্ট্র যা করল, তাকে সীমান্ত পার হয়ে আইন প্রয়োগ বলা যায় না। এটি আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নয়। এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নগ্ন হামলা। একে ঠিকঠাক নাম দিতে হলে বলতে হয়—আন্তর্জাতিক ভাঙচুর।
এখানে আইন সরে গেছে, ক্ষমতা এগিয়ে এসেছে। নীতির জায়গা দখল করেছে পছন্দ। আর বলপ্রয়োগকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে নৈতিকতার পোশাকে। এটিকে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার প্রতিরক্ষা হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ বাস্তবে এটি সেই শৃঙ্খলার নীরব মৃত্যুদণ্ড। কোনো রাষ্ট্র যখন আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে আরেক রাষ্ট্রের নেতাকে অপহরণের বৈধতা খোঁজে, তখন সে আইন রক্ষা করে না। সে আইনকে অপমান করে।
ক্ষমতাসীন কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে জোর করে ধরে নেওয়ার পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনে একবিন্দুও জায়গা নেই। এটি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের আত্মরক্ষার মধ্যে পড়ে না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এমন কোনো অনুমোদন দেয়নি।
আন্তর্জাতিক আইন ভুলভ্রান্তিমুক্ত না–ও হতে পারে, পরাশক্তিদের এসব আইন সব সময় মানা না–ও লাগতে পারে। কিন্তু এটি এমন কোনো খোলা চেক নয়, যেটা পরাশক্তিরা পকেটে নিয়ে ঘুরবে আর যখন খুশি কোনো দেশ দখল করবে, কোনো নেতাকে অপহরণ করবে বা জোর করে কোনো দেশের সরকার বদলে দেবে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মাদক পাচারের অভিযোগ দেখিয়ে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার যুক্তি আরও বিপজ্জনক। না চুক্তিভিত্তিক আইনে, না প্রথাগত আইনে, না কোনো গ্রহণযোগ্য বিচারিক ব্যাখ্যায়—কোথাও এমন নিয়ম নেই। মানবাধিকার আইন রাষ্ট্রকে আচরণের মানদণ্ডে বাঁধে। এটি নিজেকে ‘বিশ্ব-শেরিফ’ ঘোষণা করা শক্তিকে একতরফা সামরিক অভিযান চালানোর লাইসেন্স দেয় না। যদি তা-ই হতো, তাহলে পৃথিবী স্থায়ীভাবে অনুমোদিত বিশৃঙ্খলায় ডুবে যেত।
এই যুক্তির আরেকটি দিক আছে, যা আরও স্পষ্ট করে দেয়—বিষয়টি আইনের নয়, বিষয়টি ক্ষমতার। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই এই নীতিকে আন্তরিকভাবে মানত, তাহলে নৈতিক ও আইনি দিক থেকে তাদের নজর পড়ত তাদের আরও ঘনিষ্ঠ শক্তির ওপর। এই যুক্তি মানলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে আটক করার দাবি অনেক বেশি শক্তিশালী হতো। কারণ, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির প্রামাণ্য দলিল রয়েছে। এমনকি গণহত্যার বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগও আছে। কিন্তু সে যুক্তি কেউ তুলছে না। কারণ, এখানে আইন নয়, বরং ক্ষমতা নিজের মতো করে তার টার্গেট ঠিক করছে।
সরকার পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কিছু নয়। এটি একটি দীর্ঘ অভ্যাস। ইরান (১৯৫৩), গুয়াতেমালা (১৯৫৪), চিলি (১৯৭৩), ইরাক (২০০৩)—এই তালিকা দীর্ঘ। তবে ক্ষমতাসীন একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সরাসরি অপহরণ করা নতুন নিম্নস্তর। ঠিক এই আচরণ ঠেকাতেই ১৯৪৫ সালের পর আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। বলপ্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা কোনো কারিগরি ধারা নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইনের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র। অনুমোদন ছাড়া এই নিষেধাজ্ঞা ভাঙা মানে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া—নিয়ম কেবল দুর্বলদের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি ভালো করেই বোঝে। তবু সে এগোচ্ছে। এভাবে সে জাতিসংঘ সনদভিত্তিক ব্যবস্থার ময়নাতদন্ত নিজ হাতে করছে।
ক্ষতি এখানেই থামছে না। যুক্তরাষ্ট্র বহুবার জাতিসংঘ সনদ ও জাতিসংঘ সদর দপ্তর চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। তারা তাদের অপছন্দের কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দিয়েছে। গত বছর ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সরাসরি ভাষণ দিতে না দেওয়া কোনো কূটনৈতিক ভুল ছিল না। এটি ছিল স্বাগতিক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট চুক্তিভঙ্গ। বার্তাটি পরিষ্কার—আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার এবং জাতিসংঘ সনদ মানা মার্কিন অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে।
জাতিসংঘ গড়ে তোলা হয়েছিল ক্ষমতাকে লাগাম দিতে, তাকে তোষামোদ করতে নয়। অথচ আজ প্রতিষ্ঠানটি ভেটোর কারণে পঙ্গু, স্বাগতিক রাষ্ট্রের চাপে নত, আর সনদ লঙ্ঘনে সক্ষম শক্তিগুলোর কাছে উপেক্ষিত। আইন রক্ষকের জায়গা ছেড়ে জাতিসংঘ ক্রমে আইন ক্ষয়ের মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
অস্বীকার একসময় আত্মপ্রতারণায় রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তার মূল প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। এখন তাই অনুচ্চারিত কথাটি উচ্চারণের সময় এসেছে। জাতিসংঘকে স্থায়ীভাবে সেই দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া উচিত, যে তার চুক্তিগত দায়িত্বকে অসুবিধা মনে করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমাজকে এমন একটি বিকল্প বৈশ্বিক কাঠামো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে, যার কর্তৃত্ব একটি রাজধানী, একটি ভেটো বা একটি মুদ্রার কাছে জিম্মি হবে না।
জিয়াদ মোতালা যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি স্কুল অব লর আইন বিভাগের অধ্যাপক
আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত