আধুনিক কূটনীতিতে কেন অচল হচ্ছে ‘চাণক্য ডকট্রিন’

সম্প্রতি পাকিস্তান–সৌদি আরব সামরিক চুক্তি করেছেছবি : এএফপি

প্রাচীন ভারতের প্রখ্যাত রাজনৈতিক চিন্তাবিদ চাণক্য তথা কৌটিল্য তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’-তে বৈদেশিক নীতির একটি বিশেষ রূপরেখা প্রদান করেছিলেন। এটি ‘মণ্ডল’ বা ‘বৃত্ততত্ত্ব’ নামে পরিচিত। এই দর্শনে রাষ্ট্রের প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে ধরা হয় ‘স্বাভাবিক শত্রু’ এবং প্রতিবেশীর প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে ভাবা হয় ‘স্বাভাবিক মিত্র’। মূলত এ চিন্তা থেকেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি জনপ্রিয় সূত্র তৈরি হয়েছে। সেটি হলো, ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ অথবা ‘শত্রুর বন্ধু আমার শত্রু’। দুই হাজার বছরের বেশি সময় ধরে এই ভূরাজনৈতিক যুক্তি দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের অনেক অঞ্চলের রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিকে প্রভাবিত করেছে।

তবে বর্তমান বিশ্ব আর চাণক্যর সেই আমলের মতো সহজ বা দ্বিমুখী নয়। একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপট এখন একেবারেই ভিন্ন। বর্তমান যুগে বিশ্বায়ন এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এতটাই বেড়েছে যে জাতিগুলো এখন একই সঙ্গে কারও বন্ধু এবং কারও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজেকে টিকিয়ে রাখে। আধুনিক কূটনীতি এখন আর শুধু সাদা কিংবা কালো চশমায় ‘শত্রু’ বা ‘মিত্র’ চেনার ওপর নির্ভর করে না; বরং আজকের বিশ্ব চলে বহুমাত্রিক ও বাস্তববাদী নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে। চাণক্যর সেই কঠোর ও সুনির্দিষ্ট মিত্র-শত্রু তত্ত্ব এখনকার জটিল রাজনীতির সঙ্গে আর সেভাবে খাপ খাচ্ছে না। বাস্তব জগতের কিছু উদাহরণ বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংকটেও ভারত ভারসাম্যের রাজনীতি দেখাচ্ছে। একদিকে ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের পুরোনো রাজনৈতিক সমর্থন থেকেও পিছিয়ে আসছে না। এখানে প্রতিপক্ষ দুই দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বের ডোরে বাঁধা থেকে সুবিধা আদায় করাটাই আধুনিক কূটনীতির আসল ক্যারিশমা।

প্রথমেই ভারত, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের কথাই ধরা যাক। ১৯৪৭ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চরম বৈরিতা বিরাজ করছে। চাণক্যর যুক্তি মেনে চললে পাকিস্তানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শত্রুভাবাপন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, সৌদি আরব কেবল পাকিস্তানকেই বড় আকারের আর্থিক সহায়তা দেয় না; বরং ভারতের সঙ্গেও নিজেদের বিনিয়োগ ও জ্বালানি সম্পর্ক ক্রমে গভীরতর করে তুলছে। এখানে সৌদি আরব কারও বন্ধুর শত্রু হওয়ার চিরাচরিত দায়ভার গ্রহণ করেনি।

একইভাবে ভারত, চীন ও রাশিয়ার সম্পর্কের দিকে তাকালে নতুন এক দৃশ্য দেখা যায়। চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্তে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা রয়েছে। তবে রাশিয়া একই সঙ্গে এই দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে শক্তিশালী কৌশলগত সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছে। রাশিয়া যেমন ভারতের প্রধান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী, তেমনি আবার চীনের সঙ্গেও তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতা অতুলনীয়। চাণক্যর সূত্রের ঊর্ধ্বে উঠে এখানে প্রতিটি রাষ্ট্র নিজ নিজ স্বার্থে সব পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখছে।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংকটেও ভারত ভারসাম্যের রাজনীতি দেখাচ্ছে। একদিকে ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি নিজেদের পুরোনো রাজনৈতিক সমর্থন থেকেও পিছিয়ে আসছে না। এখানে প্রতিপক্ষ দুই দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বের ডোরে বাঁধা থেকে সুবিধা আদায় করাটাই আধুনিক কূটনীতির আসল ক্যারিশমা।

আরও পড়ুন

আবার যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ওয়াশিংটন রিয়াদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও চীন বর্তমানে সৌদি আরবের বৃহত্তম জ্বালানি অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ত্রিদেশীয় সম্পর্কের সমীকরণ প্রমাণ করে যে একই সঙ্গে একাধিক প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে নিবিড় অংশীদারত্ব গড়ে তোলা আজকের পৃথিবীতে অসম্ভব নয়।

তুরস্কের ক্ষেত্রে এই জটিলতা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। দেশটি সামরিক জোট ন্যাটোর শক্তিশালী সদস্য হয়েও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে উভয় পক্ষের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছে। তুরস্ক ইউক্রেনকে ড্রোন দিয়ে সহায়তা করলেও রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। এমনকি যুদ্ধের মধ্যেও দেশ দুটির মধ্যে মধ্যস্থতা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে আঙ্কারা।

পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘকালের সম্পর্কের দিকে লক্ষ করলেও চাণক্য নীতির ব্যত্যয় চোখে পড়ে। চীনের সবচেয়ে বড় অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিশাল সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানে চীন পাকিস্তানের বন্ধু, তবু দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব রক্ষায় ওয়াশিংটন পাকিস্তানকে কাছে টেনে নিয়েছে।

আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে পুরোনো ক্ষোভ, ভুল কূটনীতি আর আদর্শগত দ্বন্দ্ব।
ফাইল ছবি

ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটিও এ তালিকায় যোগ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত পুরোনো হলেও ভারত চাবাহার বন্দর উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ইরানের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ভারতের কৌশলগত অংশীদারত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। আধুনিক দুনিয়ায় কোনো একক শত্রুতার কারণে বড় ধরনের বিনিয়োগ বা প্রজেক্টগুলো এখন আর মুখ থুবড়ে পড়ে না।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের দিকে তাকালেও আমরা নমনীয় কূটনীতির জয়গান শুনতে পাই। আমিরাত একদিকে ওয়াশিংটনের নিরাপদ ছায়ায় রয়েছে আবার অন্য হাতে চীনের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে যুক্ত। অন্যদিকে কাতার নিজ দেশে বৃহত্তম মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে আশ্রয় দিয়েও তালেবান কিংবা হামাসের মতো পশ্চিমাদের বিরোধীপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চ্যানেল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে। এমনকি দোহা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

পরিশেষে কোয়াড বা চতুষ্পক্ষীয় নিরাপত্তা সংলাপের কথা বলা যায়। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া মূলত এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হলেও তারা চাণক্যর নির্মম যুদ্ধবিগ্রহের নীতির চেয়ে বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে জাপান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র আবার অন্যদিকে চীনের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। বেইজিংয়ের উত্থান নিয়ে জাপানের উদ্বেগ থাকলেও তারা চীনকে তাদের ব্যবসা থেকে সরিয়ে দেয়নি।

এসব বাস্তব চিত্র এটাই তুলে ধরে যে বর্তমান বিশ্বের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার লড়াই আর চাণক্যর যুগের মতো রৈখিক নয়। আজ বিশ্বায়ন ও মুক্তবাজারের এই সময়ে ‘শত্রুর শত্রু অবশ্যই বন্ধু’ হবে—এমন কোনো চিরন্তন সত্য আর অবশিষ্ট নেই। বরং আজকের কূটনীতিতে নিজের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারলে কারও শত্রুও হতে পারে ব্যবসায়িক সহযোগী। বিংশ কিংবা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে সেই সহস্রাব্দ পুরোনো দ্বিধাবিভক্ত সম্পর্কের সমীকরণ আজকের বহুমাত্রিক জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নিতান্তই সেকেলে হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • এন এন তরুণ অর্থনীতির অধ্যাপক, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ। সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ

    ই-মেইল: [email protected]

    *মতামত লেখকের নিজস্ব