যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে নতুনভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছেন। এটি করতে গিয়ে যদি তাঁকে ট্রান্স-আটলান্টিক পশ্চিমে
নিজের বিদ্যমান প্রভাবকে বলি দিতে হয়, তার জন্যও তিনি প্রস্তুত আছেন।
ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টা মনে করছেন, ন্যাটোর মতো জোটগুলো এখন আমেরিকার জন্য বোঝা। তাঁরা মনে করছেন, সত্যিকারের মহান হওয়ার ক্ষমতা অর্জন করার জন্য ‘একলা আমেরিকা’ই যথেষ্ট। কিন্তু গত বছরজুড়ে ট্রাম্প প্রশাসন যেসব কাজকারবার করেছে, তা দেখলে বোঝা যায়, তারা আসলে নিজেদের শুধু দুর্বলই করছে।
আমেরিকার নিজেকে দুর্বল করার স্পষ্ট কয়েকটি উদাহরণ তৈরি হয়েছে। এক. দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন বিপন্ন করা; দুই. রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মতো স্বৈরশাসকদের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক গড়ে তোলা; তিন. শুধুই সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করে বিশ্বব্যবস্থা গঠন, যেখানে কোনো নিয়ম বা বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান নেই এবং দীর্ঘদিন ধরে থাকা জোট ও বাণিজ্য সম্পর্ক ধ্বংস করা।
যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য দেশ থেকে যে বৈশিষ্ট্য আলাদা করেছে, তা হলো দেশটির গভীর নীতি ও আলোকিত চিন্তাধারার ভিত্তি। দেশটির প্রতিষ্ঠাতারা পশ্চিমা মানবতাবাদ ও যুক্তিসিদ্ধ সংবিধানে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকাকে আধুনিক যুগের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় সফল করেছে।
মার্কিন সংবিধানের প্রস্তাবনায় লেখা আছে, ‘আমরা, জনগণ’। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দাবির ক্ষেত্রে আগে এ ধরনের ভাষা শুধু রাজারা ব্যবহার করতেন। এখানে তা
জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি তখনকার স্বৈরশাসকদের শাসনের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ।
ইতিহাসজুড়ে আমেরিকা সব সময় ছিল দ্বৈত চরিত্রের। একদিকে এটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, অন্যদিকে আলোকিত গণতন্ত্রের দেশ। দক্ষিণের অঙ্গরাজ্যে গোড়ার দিকে দাসপ্রথা ছিল। এটি ছিল সংবিধানে ঘোষিত সমতার অধিকার ও স্বাধীনতার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ।
আমেরিকার স্বাধীনতার আড়াইশতম বার্ষিকী আসতে চলেছে। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো এই গণতন্ত্র এখন এক ব্যক্তির কারণে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। তিনি স্বৈরশাসন প্রবর্তনে বিশ্বাসী। এতে পুরো আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের জন্য হুমকি আছে।
কিন্তু তবু আমেরিকা কেবল শক্তির জন্যই মহান হয়নি। এর অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং দুই মহাসাগরের মধ্যে অবস্থান এর বৈশিষ্ট্য ছিল। এ বৈশিষ্ট্য দুটি বিশ্বযুদ্ধ ও শীতল যুদ্ধে তাকে জয় এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে। তবে দেশটিকে শক্তিশালী করেছে তার ভৌত শক্তি বা বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ও আলোকিত নীতির সমন্বয়।
ট্রাম্পের শাসনে সবকিছু নির্ভর করছে নগ্ন শক্তির ওপর। তার সরকার কোনো সীমাবদ্ধতা মানছে না। আমেরিকাকে যা কিছু মহান করেছে, ট্রাম্প ঠিক তার উল্টোটা করে যাচ্ছেন। এত বড় শক্তিশালী রাষ্ট্র এখন অযৌক্তিকতা, স্বার্থপর জাতীয়তাবাদ ও হিংসার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আমেরিকার স্বাধীনতার আড়াইশতম বার্ষিকী আসতে চলেছে। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো এই গণতন্ত্র এখন এক ব্যক্তির কারণে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। তিনি স্বৈরশাসন প্রবর্তনে বিশ্বাসী। এতে পুরো আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের জন্য হুমকি আছে।
দেশে ধনী ও ক্ষমতাধর এমন এক অলিগার্ক গোষ্ঠীর ক্ষমতা বাড়ছে, যারা বিশ্বজয়, দূরগ্রহে উপনিবেশ স্থাপন এবং অমরত্ব অর্জনের স্বপ্ন দেখছে।
সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত নাগরিক অধিকার এখন ব্যাপক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। পুরো দেশ ব্যক্তিগত কোম্পানির মতো প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। যারা প্রতিবাদ করছে বা প্রতিরোধ করছে, তারা ঝুঁকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্টদের হাতে নিহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এ ধরনের মৃত্যু কার্যত কোনো আইনি বিচারের আওতায় আসে না। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ক্রমেই আর্থিক চাপে পড়ছে। আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু ক্ষমতাশালীদের জন্যই বিদ্যমান দেখা যাচ্ছে।
‘মুক্তির দেশ’ ভ্রমণকারীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র এখন সাবেক পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো মনে হচ্ছে। বিদেশনীতিতে আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী দেশগুলো (যেমন ডেনমার্ক) বিপক্ষের মতো আচরণ করছে। তারা তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যবাদী দাবির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছে। ট্রাম্প ও তাঁর মহলের কাছে পুতিনের মতো আগ্রাসী নেতা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো ইউরোপীয়রা, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এটা অযৌক্তিক মনে হলেও বাস্তব।
শক্তি বিভাজন কার্যকর রাখা, উন্মুক্ত শ্রমবাজার, বিশ্বের সেরা মেধা আকৃষ্ট করা বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থা এবং সহনশীলতা, যুক্তি ও সর্বজনীন অধিকারের ওপর ভিত্তি করে মূল্যবোধ—এসবই দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকাকে মহান করেছে। কিন্তু ট্রাম্প এর সবকিছুকেই ভেঙে ফেলছেন। তাঁর মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) আন্দোলন কেবল ট্রান্স-আটলান্টিক পশ্চিমকে নয়, আমেরিকার শক্তির মূল ভিত্তিকেও ধ্বংস করছে।
চলতি বছর এ ধারাবাহিকতা সম্ভবত অব্যাহত থাকবে। এ ধারা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের জন্যই বড় হুমকি।
জোসচকা ফিশার জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভাইস চ্যান্সেলর
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত