নেপালে এ সপ্তাহেই নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে। সরকার গঠন করবে আরএসপি বা রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি। এই দল সম্পর্কে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মানুষ অনেক কিছু জেনেছেন। সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনে ২৭৫ সদস্যের ‘প্রতিনিধি সভা’য় তাদের সদস্য থাকছে ১৮২ জন।
নেপালের সাধারণ নির্বাচনে প্রথমে ভোট হয় ১৬৫ আসনে। পুরো দেশ ১৬৫টি পার্লামেন্টারি আসনে ভাগ করা। ভোটারদের পছন্দে ১৬৫ জন এমপি সরাসরি নির্বাচিত হন। পার্লামেন্টের বাকি ১১০ জন সদস্য নির্বাচিত হন দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংখ্যানুপাতিক হিসাবে।
ভোটের দিন একই সময় ভোটারদের দুটি ব্যালট দেওয়া হয়। একটি ব্যালট দিয়ে তাঁরা বিভিন্ন দল থেকে দাঁড়ানো এলাকাভিত্তিক প্রার্থীদের ভোট দেন। দ্বিতীয় ব্যালটের মাধ্যমে একই ভোটার নির্বাচনে অংশ নেওয়া যেকোনো একটা জাতীয় দলকে পছন্দ করেন।
নির্বাচনের আগের দিন প্রতিটি দল দ্বিতীয় ধরনের এমপি নির্বাচনের জন্য যার যার ১১০ সদস্যের প্রার্থী তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়। ভোটাররা দ্বিতীয় ব্যালট পেপার দিয়ে যে দলকে যে সংখ্যায় পছন্দ করেন, সেই হিস্যা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে জমা থাকা ওই সব তালিকা থেকে বাকি ১১০ জন এমপি নির্বাচিত হন।
অর্থাৎ নেপালের নির্বাচনে একজন ভোটার যেমন সরাসরি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী হওয়া যেকোনো দলের প্রার্থীকে বাছাই করতে পারেন, তেমনি পছন্দসই অন্য দলকেও জাতীয়ভাবে ভোট দিতে পারেন।
এ রকম দুই প্রক্রিয়া মিলে (১২৫+৫৭) আরএসপি ১৮২টি আসন পেল এবার। তারা একক প্রার্থীকেন্দ্রিক সরাসরি ভোট পেয়েছে ৪৪ শতাংশ। দল হিসেবে
পছন্দের ভোট পেয়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিভিন্ন আসনে তাদের প্রার্থীরা যত ভোট পেয়েছেন, তার চেয়েও বেশি মানুষ তাদের ভোট দিয়েছেন জাতীয়ভিত্তিক দল হিসেবে। একই রকমভাবে বিরোধী নেপালি কংগ্রেসের প্রার্থীরা প্রার্থীভিত্তিক ভোট পেয়েছে প্রদত্ত ভোটের ১৯ শতাংশ, জাতীয় দল হিসেবে পেয়েছে ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ ১৯ শতাংশ ভোটার তাঁদের এলাকাভিত্তিক প্রার্থীদের পছন্দ করলেও দল হিসেবে তাদের পছন্দ করেছেন কম ভোটার।
নেপালের ভোটারদের এ রকম বিচিত্র পছন্দের সুযোগ দেখে বাংলাদেশের কথা মনে পড়ল। গণ–অভ্যুত্থানের সময় নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তন তথা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি নিয়ে কথা উঠেছিল।
তখন এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধবাদীরা বলতেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হয় এবং সরকার গঠনের বেলায় নানা দলের টানাপোড়েনে পড়ে দেশ। কিন্তু নেপালে মিশ্র ব্যবস্থায় আরএসপি কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, পার্লামেন্টে প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ আসন তথা সুপার মেজরিটি পেয়েছে। এককভাবেই তারা সরকার গঠন করতে পারবে। চাইলে পুরো মেয়াদ একাই নির্বিঘ্নে চালিয়ে নিতে পারবে দেশকে। ভোট পদ্ধতির সঙ্গে রাজনৈতিক বা সরকার গঠনজনিত অস্থিতিশীলতার যে চিরস্থায়ী কোনো সম্পর্ক নেই, সেটাই দেখা যাচ্ছে এখানে।
নেপালের বেলায় আমরা দেখছি, সেখানে ভোট দিতে আসা প্রত্যেকের প্রতিনিধি থাকছেন পার্লামেন্টে। সরাসরি ভোটে পরাজিত প্রার্থীকে যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁরাও দ্বিতীয় ব্যালটে জাতীয় দল বাছাইয়ের মাধ্যমে পরোক্ষে হলেও সংসদে তাঁর হয়ে কথা বলার মতো প্রতিনিধি পাঠাতে পারছেন। অর্থাৎ নেপালে যাঁরাই ভোট দিয়েছেন, তাঁদের সবার কোনো না কোনো প্রতিনিধি পার্লামেন্টে আছেন।
অন্যদিকে সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থা থাকায় নেপালে আসনভিত্তিক নির্বাচনে আরএসপির জোয়ারের মধ্যেও অন্য কয়েকটি দল পার্লামেন্টে স্বাস্থ্যকর উপস্থিতি বজায় রাখতে পারল এবং তাতে কিছু বিরোধী কণ্ঠ সেখানে আসতে পারল। এমনও ঘটেছে, একটি দল মূল ভোটে আসন পেয়েছে একটি, কিন্তু দ্বিতীয় ব্যালটের হিসাবে আরও চারটি আসন পেয়ে পার্লামেন্টে তাদের পাঁচজন এমপি হয়েছেন এখন।
নেপালিরা মিশ্র পদ্ধতি রেখেছে পার্লামেন্টে সর্বোচ্চসংখ্যক ভোটারের জনপ্রতিনিধিকে নিয়ে আসার জন্য। তারপরও এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৬৪টি দলের মধ্যে কেবল ছয়টি দলের উপস্থিতি থাকছে পার্লামেন্টে। নিয়ম অনুযায়ী, ৩ শতাংশের কম ভোট পাওয়ায় অন্য দলগুলো কোনো আসন পাচ্ছে না।
এই অভিজ্ঞতা নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আরও উদারনৈতিক সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলে। সংস্কারপন্থীদের কথা হলো বহুমুখী জনমতের যত বেশি প্রতিনিধি পার্লামেন্টে আনা যায়, নাগরিকদের তত বেশি অংশের আগ্রহ থাকে চলতি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি।
নেপালের এসব অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলের তিক্ত বিতর্ক স্মরণ করতে পারি। এবারকার নির্বাচনী ফলকেও বিবেচনায় নিতে পারি।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ফল বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই যেটা চোখে পড়ে, ‘বিজয়ী’রা (যে দলেরই হোন না কেন) আসনভিত্তিক মোট ভোটারের সংখ্যালঘু একাংশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রদত্ত বৈধ ভোটারদের বিশাল একাংশের সংসদে কোনো প্রতিনিধিই থাকছেন না।
বিষয়টা স্পষ্ট ও বিস্তারিত করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে দৈবচয়ন ভিত্তিতে একটা জেলার পাঁচটি আসনের ভোটের আলোচনা তুলে ধরছি এখানে। বিবেচনার জন্য নেওয়া ময়মনসিংহ-১ থেকে ময়মনসিংহ-৫ পর্যন্ত আসনগুলোর ফলাফলে দেখেছি, সেখানে ভোটারসংখ্যা ছিল মোট ২৪ লাখ ৪১ হাজার ৩৮২। বিজয়ী প্রার্থীরা পেলেন তার মাত্র ২৬ শতাংশ (৬ লাখ ৩৮ হাজার ৩৫৩ ভোট)।
এই পাঁচ আসনে প্রদত্ত বৈধ ভোট ছিল ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৮৫। সেই বৈধ ভোট থেকে বিজয়ীরা পেয়েছেন ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রদত্ত বৈধ ভোটেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাঁরা পাননি। এর অন্য মানে দাঁড়ায়, আলোচ্য আসনগুলোর বৈধ ভোট দেওয়া ভোটারদেরও সংখ্যাগরিষ্ঠের কোনো জনপ্রতিনিধি থাকছেন না সংসদে। আবার এ–ও সত্য, বিদ্যমান ব্যবস্থায় এখানকার বিজয়ী সংসদ সদস্যরা বৈধভাবেই নির্বাচিত হয়েছেন।
অনুমান করছি, দৈবচয়ন ভিত্তিতে নেওয়া হলেও ৫ আসনের ক্ষুদ্র এই চিত্র কমবেশি ৩০০ আসনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। স্পষ্টত এটা আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার ত্রুটির দিক। যখন কোনো পার্লামেন্টে নির্বাচনী এলাকাগুলোর ভোটারদের, বিশেষ করে বৈধ ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের প্রতিনিধিত্ব থাকে না, তখন সেই নির্বাচনী ব্যবস্থা সংশোধন দাবি করে। সংশোধন বা সংস্কার কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বিতর্ক হতে পারে।
নেপালের বেলায় আমরা দেখছি, সেখানে ভোট দিতে আসা প্রত্যেকের প্রতিনিধি থাকছেন পার্লামেন্টে। সরাসরি ভোটে পরাজিত প্রার্থীকে যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁরাও দ্বিতীয় ব্যালটে জাতীয় দল বাছাইয়ের মাধ্যমে পরোক্ষে হলেও সংসদে তাঁর হয়ে কথা বলার মতো প্রতিনিধি পাঠাতে পারছেন। অর্থাৎ নেপালে যাঁরাই ভোট দিয়েছেন, তাঁদের সবার কোনো না কোনো প্রতিনিধি পার্লামেন্টে আছেন।
শ্রীলঙ্কাও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্বশীল করতে অনেক সংস্কার করেছে এবং সেখানেও একধরনের মিশ্র পদ্ধতিতে নির্বাচন হচ্ছে। এতে সংসদ সেখানেও অনেক বেশি প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে উঠেছে। জাতীয় নীতিনির্ধারণে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে ভবিষ্যতে শ্রীলঙ্কা প্রেসিডেনশিয়াল পদ্ধতি থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার দিকে যাবে বলেও অনুমান করা হচ্ছে।
গত চার বছরে দক্ষিণ এশিয়ায় গণ–অভ্যুত্থান হওয়া তিন দেশেই প্রধান একটা প্রত্যাশা ছিল জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্র সংস্কার। নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনী ব্যবস্থা যেহেতু আগেই অনেকখানি সংস্কার করা ছিল, সেই সূত্রে তারা এখন অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারে মনোযোগী হচ্ছে।
বাংলাদেশের বেলায় ঐকমত্য কমিশনের বিতর্কে বন্দী হয়ে গেছে অভ্যুত্থানের অনেক প্রত্যাশা। যদিও নতুন সরকার চাইলে নতুন সংসদে জনস্বার্থে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করতে আলাপ তুলতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার যে মোটেই কোনো ঝুঁকি নেই, নেপালের নির্বাচনী ফল তার মোটাদাগের নজির।
অন্যদিকে নির্বাচনী ব্যবস্থা যদি ক্রমেই পরিবর্তনের ধারক না হয়ে ওঠে এবং বর্তমান ধাঁচের নির্বাচন ও সংসদের ওপর কাঠামোগত কারণেই জনগণ যদি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, তাহলে শাসক সমাজের জন্য প্রকৃতই দূরবর্তী বিপদ আছে।
স্থিতিশীলতার বুদ্বুদের বাইরে এসে নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শী হওয়ার তাগিদ বইছে দক্ষিণ এশিয়ার বাতাসে। এখানে নতুন প্রজন্ম স্থিতিশীলতার মোহ অতিক্রম করে পরিবর্তন চাইছে। পাঁচ বছর আগেও দক্ষিণ এশিয়া জানত না কী ধরনের রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থান আসছে। হয়তো একইভাবে ধারণা করা কঠিন, অর্থবহ পরিবর্তন না হলে গণ–অভ্যুত্থানকারী জনতা পরের পাঁচ বছর পর কী চেহারা নেবে।
আলতাফ পারভেজ দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
মতামত লেখকের নিজস্ব
