এলপিজি সিলিন্ডার: পাতে টান পড়েছিল আগেই, এবার কি ভাতেও টান পড়বে

কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এলপিজির দাম বাড়ানোর কৌশল চলেই আসছেছবি : দীপু মালাকার

প্রতিবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর দেখা যায়, রিকশাচালকেরা ভাড়া বাড়িয়ে দেন। কেননা, স্ট্র্যাটেজিক পণ্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সবকিছুর দাম বেড়ে যায়। রিকশাচালকেরা কিছুটা ভাড়া বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন।

গত ২১ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একলাফে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এর ফলে যানবাহনের ভাড়া থেকে শুরু করে ডিম, সবজির দাম—বাজারে সবকিছুই চড়তে শুরু করেছে। কিন্তু এবারের বাস্তবতা হলো, রিকশাচালকেরা এক টাকাও ভাড়া বাড়াতে পারেননি। এর একটি কারণ সম্ভবত, রিকশায় যাঁরা চড়ছেন, তাঁদের পক্ষে বেশি ভাড়া দেওয়া সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন

অর্থনীতির জন্য এটা একটা বড় সংকেত। কেননা, নব্বইয়ের পর দেশে উদারীকরণ বা মুক্তবাজার অর্থনীতির হাওয়া প্রবেশ করার পর গত সাড়ে তিন দশক ধরে যে ট্রিকল ডাউন অর্থনীতির সূত্র (সমাজের উপরতলার লোকদের হাতে টাকা দিলে সেটা চুইয়ে চুইয়ে একেবারে শেষ প্রান্তের লোকটারও হাতে গিয়েও পড়ে) চালু আছে, তা বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

গত সপ্তাহে ব্যাটারিচালিত রিকশায় মালিবাগ থেকে কারওয়ান বাজার আসার পথে চালকের কাছ থেকে তাঁর কায়দা করে টিকে থাকার গল্প শুনতে শুনতে আসছিলাম। বাজারে বানরুটির দাম বেড়েছে পাঁচ টাকা করে। আগে দিনে যেখানে চারটি বানরুটি আর দুই কাপ চা খেতেন, এখন সেখানে দুটি বানরুটি আর দুই কাপ চা খান তিনি। সংসার খরচের কথা বলতে গিয়ে জানালেন, পরিবারের সদস্যদের আগে সপ্তাহে তিন-চার দিন পাতে ডিম, পাঙাশ মাছ বা ব্রয়লার মুরগি জোগান দিতে পারতেন। এখন ভাত, ডাল, আলুভর্তা কিংবা শাক দিয়েই বেশির ভাগ ওয়াক্ত পার করতে হচ্ছে। গত তিন-চার মাসে কারেন্টের (বিদ্যুতের) বিল বেড়েছে বলেও জানালেন। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম যে বাজারে ২ হাজার ৫০০ টাকা উঠেছে, সেই খবর জানিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

কারওয়ান বাজার মোড়ে ভাড়া দিয়ে যখন নামছি, তখন বলে বসলেন, ‘আগে তো পাতে টান পড়েছিলই, এবার হয়তো ভাতেও টান পড়বে।’

ভারতেও রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে গরিব ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে ভর্তুকি দেওয়া হয়। অথচ বাংলাদেশের বাজারে গরিব ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র প্রায় না থাকলেও বাজারে যেন পুরাদস্তুর সমাজতন্ত্র চালু আছে। এখানে সব আয়ের মানুষকেই একই দামে পণ্য কিনতে হয়। সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও সমাজতন্ত্র চালু রয়েছে। কেননা, ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর সরকারের আয়ের এখনো বড় অংশ।

শুধু রিকশাচালক নয়, বাংলাদেশের শ্রমজীবী থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পর্যন্ত নির্দিষ্ট আয়ের মানুষদের কণ্ঠেও এই কথাগুলো এখন প্রতিধ্বনি তোলে। কেননা, টানা চার বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ টানা উচ্চমূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছেন। তাঁদের প্রকৃত আয় প্রতিবছরই কমছে। অন্যদিকে বাজারে বাড়ছে সবকিছুরই দাম।

আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের পাগলা ঘোড়ার লাগাম ধরতে একে একে বিনোদন, ভ্রমণ, শিক্ষা, যাতায়াত, চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হয়েছে। এরপর বাধ্য হয়েই পাত থেকে মাছ, মাংস, ডিমের মতো প্রোটিন ও সবজির অংশও কাটছাঁট করতে হয়েছে। এবারের ধাক্কায় অনেক মানুষকে কার্বোহাইড্রেটও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। বাজারে বানরুটির দাম বেড়ে যাওয়া, শিঙাড়ার আকার ছোট হয়ে আসা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

বাংলাদেশের মানুষদের পুষ্টির সবচেয়ে বড় অংশটা আসে ভাত থেকে। ফলে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করায় টান পড়লে তার প্রভাব শুধু ক্ষুধা আর পুষ্টিতে পরিস্থিতি সীমাবদ্ধ না–ও থাকতে পারে। বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম বৈষম্যবাদী দেশ। গত দেড়-দুই দশকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, মেগা প্রকল্প বা চোখধাঁধানো উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়েনি। এ রকম চরম বৈষম্য আর কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির একটি দেশ সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের আঁতুড়ঘর হয়েই থাকে। চব্বিশের অভ্যুত্থান তার বড় প্রমাণ।

আরও পড়ুন

দুই.

৫ অক্টোবর মধ্যরাতে সরকার রান্নার গ্যাস বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়িয়েছে। এবারে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম একলাফে বাড়ানো হয়েছে ২৫২ টাকা। এলপিজির দাম যে বাড়তে যাচ্ছে, তার প্রস্তুতি বাজারে দুই সপ্তাহ ধরেই ছিল। দাম বাড়ানোর আগে ১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকারের নির্ধারণ করা দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ ২ হাজার ৫০০ টাকাতেও সেই সিলিন্ডার মিলছিল না। এ দুই সপ্তাহ ধরে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার করে বলা হয়েছে, বাজারে এলপিজির কোনো সংকট নেই। আমদানির তথ্যও বলছে, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে এলপিজির আমদানি একটুও কমেনি।

এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াবের তথ্য বলছে, আগস্ট মাসে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিকটন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। তাহলে বাজারে এলপিজি মিলছে না কেন? এটা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, জনগণকে জিম্মি করে দাম বাড়ানোর সেই অতি পরিচিত কৌশল। শেষ পর্যন্ত বিইআরসি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। এবার হয়তো বাজারে এলপিজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করবে।

গত ৭ সেপ্টেম্বরের দৈনিক সংবাদের একটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গাজীপুরে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ২০ মাসে ১ হাজার ১৭৬টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর ছোট একটি অংশও যদি অর্থনৈতিক কারণে ঘটে থাকে তাহলেও পরিস্থিতিকে ভয়াবহ বলতেই হবে।

গত এপ্রিলে যখন এলপিজির দাম বাড়ানো হয়েছিল, তখনো একই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম একলাফে অনেকটা বাড়ানো হবে, মানুষ বাধ্য হয়ে সেই দামে কিনতে শুরু করবে। এরপর সরকার কিছুটা কমিয়ে দাম নির্ধারণ করবে। এতে ব্যবসায়ীরা খুশি থাকবে, সরকার ও ভোক্তার মধ্যে স্বস্তি তৈরি হবে।

শুধু এলপিজি ক্ষেত্রে নয়, সব ক্ষেত্রেই এই মডেল চালু রয়েছে। গোটা আওয়ামী আমলে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলো নাগরিকদের জিম্মি করে এভাবেই দাম বাড়াত। অন্তর্বর্তী আমলেও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। বিএনপি সরকারের আমলেও সেটা থেকে মুক্তি মেলেনি।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ যে অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সে কারণে আর সব দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বড় চাপে পড়েছে। জনগণের সব অংশকেই কমবেশি ভুগতে হচ্ছে, কষ্ট করতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, নাগরিকদের বিশাল একটি অংশের পিঠ যখন দেয়ালে ঠেকেছে, তাদের যখন খাদ্যতালিকা থেকে কার্বোহাইড্রেট কাটছাঁট করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ব্যবসায়ীদের নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানোর সুযোগ কেন দেওয়া হলো?

এই যে বাজারে কারসাজি করে দাম বাড়ানো হলো, তাতে জনগণের পকেট থেকে বাড়তি কত টাকা গোষ্ঠীবিশেষের হাতে চলে গেল? একদিকে দেশে আশঙ্কাজনক হারে গরিব মানুষ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে কেন দ্রুতগতিতে শতকোটিপতির সংখ্যাও বাড়ছে, তার সূত্র এখানেই মেলে। এটা স্বজনতোষী অর্থনীতির ক্ল্যাসিক উদাহরণ।

এলপিজির দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর রান্নার খরচ বাড়বে।
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

তিন.

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প পোশাক খাতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এই হিসাবে এই খাতে শ্রমিকদের গড় আয় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার বেশি নয়। যে পোশাকশ্রমিকের মাসিক আয় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা, তাঁকে যদি মাস শেষে রান্নার জ্বালানি আর বিদ্যুৎ বিলের পেছনে ৩ হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হয়, তাহলে বাসাভাড়া আর অন্যান্য খরচ মিটিয়ে খাওয়ার পেছনে তাঁর কত টাকা থাকতে পারে?

গত ৭ সেপ্টেম্বরের দৈনিক সংবাদের একটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গাজীপুরে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত ২০ মাসে ১ হাজার ১৭৬টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর ছোট একটি অংশও যদি অর্থনৈতিক কারণে ঘটে থাকে তাহলেও পরিস্থিতিকে ভয়াবহ বলতেই হবে।

যুদ্ধ, করোনা মহামারি—এসব বৈশ্বিক বাস্তবতা এড়ানোর সুযোগ বাংলাদেশের নেই। কিন্তু নাগরিকদের, বিশেষ করে গরিব ও নির্দিষ্ট আয়ের লোকদের সুরক্ষা তো দিতে হবে।

ভারতেও রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে গরিব ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে ভর্তুকি দেওয়া হয়। অথচ বাংলাদেশের বাজারে গরিব ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র প্রায় না থাকলেও বাজারে যেন পুরাদস্তুর সমাজতন্ত্র চালু আছে। সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও সমাজতন্ত্র চালু রয়েছে। কেননা, ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর সরকারের আয়ের এখনো বড় অংশ।

এলপিজির বাজারের এই জিম্মিদশার কারণে অন্তর্বর্তী আমলে বিপিসির মাধ্যমেও এলপিজি আমদানির কথা উঠেছিল। সেটা এখনো কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। যেহেতু বাজার তদারকির কোনো সক্ষমতা সরকার দেখাতে পারছে না, সেহেতু বিপিসির মাধ্যমে এলপিজির আমদানি বাড়ানোটাই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার উপায় হতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণকে সুরক্ষা দেবে, না ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে সুযোগ করে দেবে, সেই সিদ্ধান্ত সরকারকে সবার আগে নিতে হবে।

  • মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী

* মতামত লেখকের নিজস্ব

[email protected]