ইরান যুদ্ধ, মুনাফার কৌশল এবং ভবিষ্যতের ভাবনা

কয়েকটি নৌযান হরমুজ প্রণালি পার হচ্ছে। ওমান, ২২ মে ২০২৬ছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক মনোযোগ আবার যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ঝুঁকির দিকে চলে গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সাধারণ মানুষ ভয়, অনিশ্চয়তা আর সহিংসতার মুখোমুখি। সেখানকার জনপদগুলো এখন বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতি ও যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবন বাঁচানোই এই মুহূর্তে প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তবে আগামী দিন বা সপ্তাহগুলোয় যা-ই ঘটুক না কেন, আসল শিক্ষা কিন্তু একই থাকবে।

এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি কাঠামোগত দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। যত দিন দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে, তত দিন যেকোনো জায়গার অস্থিরতা পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক কষ্টের কারণ হবে।

এটি আরেকটি বিষয়ও স্পষ্ট করেছে। বিকেন্দ্রীকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়া এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে।

পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি খরচ বেড়েছে। এতে তেল ও গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতিগুলোয় মূল্যস্ফীতি ও পারিবারিক বাজেটের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকাজুড়ে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়েছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাত, বিদ্যুৎ বিল এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।

আরও পড়ুন

এটিই হলো ‘ফসিলফ্লেশন’ বা জীবাশ্ম মূল্যস্ফীতি। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণেই এই মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়

একটি অর্থনীতি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর যত বেশি নির্ভরশীল, সীমানার বাইরের অস্থিরতায় সেটি তত বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। এর বিপরীতটাও সমান সত্য। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি এই ঝুঁকি কমায়। এটি আন্তর্জাতিক সংকট এবং পারিবারিক খরচের মধ্যকার সম্পর্ককে দুর্বল করে। ফলে দেশগুলো আরও স্বাবলম্বী ও জ্বালানি খাতে স্বাধীন হয়ে ওঠে।

অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) সতর্ক করেছে। তারা বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল করছে। উচ্চ জ্বালানি মূল্যের প্রভাব পড়ছে পরিবহন, বিদ্যুৎ বিল এবং ভোক্তামূল্যের ওপর। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, অন্তত ৪৬টি দেশের সরকার তাদের জনগণকে জ্বালানির বাড়তি দাম থেকে বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের শিক্ষা হলো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, তা খবরের শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা বলেছে, তেল, গ্যাস ও সারের উচ্চমূল্য খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ডব্লিউএফপির হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে।

বারবার দেখা গেছে, অস্থিরতা ও দামের ওঠানামা জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর জন্য আকাশচুম্বী মুনাফা বয়ে আনে। রিস্টাড এনার্জির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধের প্রথম মাসেই বিশ্বের ১০০টি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানি প্রতি ঘণ্টায় তিন কোটি ডলারের বেশি বাড়তি মুনাফা করেছে। যখনই কোনো সংকট এ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে প্রকাশ করে, তখন এই শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া হয় একেবারে চেনা। তারা আরও ড্রিলিং, আরও পাইপলাইন, দ্রুত অনুমোদন, বড় সরকারি ভর্তুকি এবং পরিবেশগত সুরক্ষা কমানোর দাবি তোলে।

আরও পড়ুন

যে সংকট জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার ক্ষতি সামনে আনে, তাকেই আবার সেই নির্ভরশীলতা বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটিই হলো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসার কৌশল। সংকটকে মুনাফায় রূপান্তর করো, আর সেই সংকটকে ব্যবহার করেই আবার সেই ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দাও, যা মূলত এই ভঙ্গুরতা তৈরি করেছিল। এর ফলে এমন একটি চক্র তৈরি হয়, যা সমাজকে বারবার অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে ফেলে। আরও খারাপ বিষয় হলো, সমাজকে এমন সব শক্তিকে ভর্তুকি দিতে বাধ্য করা হয়, যা তাদেরই অস্থিতিশীল করছে। এমনকি যদি এই নির্দিষ্ট সংঘাত কমেও যায়, হরমুজ প্রণালি খুলেও দেওয়া হয় এবং জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল হয়, তবু মূল ঝুঁকি কিন্তু থেকেই যাবে।

পরবর্তী সংকট অন্য কোনো যুদ্ধ, অন্য কোনো ভূরাজনৈতিক সংঘাত, সরবরাহ–ঘাটতি বা চরম আবহাওয়ার কারণে আসতে পারে। যত দিন অর্থনীতি ভঙ্গুর বিশ্ববাজারের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল থাকবে, তত দিন সাধারণ মানুষ এমন সব শক্তির মুখোমুখি হবে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই আলোচনা শুধু যুদ্ধবিরতি, নৌপথ বা স্বল্পমেয়াদি দামের ওঠানামার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। স্থিতিশীলতা বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে এবং এর ওপর জোর দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রায়ই কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান হিসেবে দেখা হয়। অথচ এটি এখন সমানভাবে একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সমাধানও বটে।

আরও পড়ুন

প্রতিটি ছাদে বসানো সৌরবিদ্যুৎ–ব্যবস্থা, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক বাস এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী ভবন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে পারিবারিক খরচের সম্পর্ককে দুর্বল করে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেউ অবরুদ্ধ করতে পারে না, এর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া যায় না কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাতের মুখেও ফেলা যায় না। এটি অস্থির জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি কমায় এবং জ্বালানির স্বাধীনতা জোরদার করে।

যেসব দেশ বিকেন্দ্রীকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানিব্যবস্থার দিকে রূপান্তর দ্রুত করবে, তারা ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানির ধাক্কা থেকে সুরক্ষিত থাকবে। আর যারা নির্ভরশীল থাকবে, তারা বারবার এই জীবাশ্ম মূল্যস্ফীতির চক্রের মুখোমুখি হবে। ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের শিক্ষা হলো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে, তা খবরের শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়।

  • মাদস ফ্লারুপ ক্রিস্টেনসেন গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনালের নির্বাহী পরিচালক এবং পরিবেশ আন্দোলনকর্মী

    আল–জাজিরা থেকে অনূদিত