ইরান সংকট নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে

হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে উপসাগরীয় নিরাপত্তার নিয়ম নির্ধারণ করছেছবি: রয়টার্স

ইরান সংকটকে ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। যখন কোনো অঞ্চলে সামরিক শক্তি প্রত্যাশিতভাবে ‘প্রতিরোধক্ষমতা’ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তেল। এখন হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে উপসাগরীয় নিরাপত্তার নিয়ম নির্ধারণ করছে, যেখানে একসময় প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিবেচিত হতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর।

হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সংকট সামাল দিতে যে জরুরি তেল মজুত থেকে অতিরিক্ত সরবরাহ দেওয়া হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কমে আসছে। এর ফলে বাজারে আবারও দামের চাপ বাড়ছে। কিন্তু সমস্যাটা শুধু দামের নয়। এর পরপরই একের পর এক প্রভাব তৈরি হয়—পেট্রল ও ডিজেলের দাম, জাহাজ চলাচল ও বিমা খরচ, কাঁচামালের দাম এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি। এটি এশিয়া থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি প্রণালি যদি খুব দ্রুত খুলেও দেওয়া হয়, তবু ক্ষতি সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হবে না। কারণ, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা রাতারাতি পুনর্গঠিত হয় না।

আরও পড়ুন

উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এখন ইরানের সঙ্গে কথা বলা ছাড়া বাস্তব কোনো পথ নেই। এটি কোনো আদর্শগত অবস্থান নয়; বরং নিরাপত্তার কঠিন হিসাব। পুরোনো সমীকরণ ভেঙে পড়ছে, আর যেসব সামরিক ঘাঁটি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে বলে ভাবা হয়েছিল, বাস্তবে তা ততটা কার্যকর নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনকে কেন্দ্র করে যে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা থেকেও কোনো স্পষ্ট সমাধান আসেনি। এর কারণ, চীন দুর্বল নয়; বরং তারা বিষয়টিকে বাস্তব দৃষ্টিতে দেখে। তাদের অবস্থান হলো হরমুজ প্রণালি খুলতে হলে ইরানের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সমঝোতা প্রয়োজন। এখানেই ট্রাম্পের সমস্যার মূল জায়গা। তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারেন, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করতে পারেন না। বাজার কোনো আলোচনায় বসে না, সে শুধু তার প্রভাব দেখায় এবং শাস্তি দেয়।

আরও পড়ুন

এ অবস্থায় দেশগুলো দুই ধরনের পথে এগোচ্ছে। একদিকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার একক ও বিচ্ছিন্ন চেষ্টা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ সংকট এড়াতে নতুন একটি কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা। সৌদি আরব দ্বিতীয় পথটির নেতৃত্ব দিতে চাইছে। কারণ, চলমান অস্থিরতার খরচ এখন সমঝোতার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে।

পশ্চিমা বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে একটি ‘উপসাগরীয় হেলসিংকি চুক্তি’র মতো কাঠামোর ধারণা সামনে আনছে, যা ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার হেলসিংকি প্রক্রিয়ার অনুকরণে তৈরি হতে পারে। এই কাঠামো শুধু সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এতে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এর লক্ষ্য হবে অনাক্রমণ চুক্তি, অর্থনৈতিক স্বাভাবিকীকরণ এবং একটি পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নব্যবস্থা তৈরি করা।

তবে এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কি এ ধরনের আঞ্চলিক চুক্তি কার্যকর হতে পারে? যদি উপসাগরীয় দেশগুলো এবং ইউরোপ ও ইরান একটি অনাক্রমণ চুক্তিতে যায়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তখনো ইরানে হামলার সক্ষমতা রাখে, তাহলে সেই চুক্তির বাস্তব মূল্য কতটা থাকবে?

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে এই কাঠামোর ভেতরে আনা সহজ নয়। কারণ, তারা নিজেরাই ইরানের সঙ্গে দ্রুত কোনো দ্বিপক্ষীয় সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছে। তাহলে তারা কেন এমন একটি বৃহত্তর কাঠামো মেনে নেবে, যা তাদের সামরিক স্বাধীনতাকে সীমিত করে?

এর ফলে একটি তৃতীয়, আরও সংবেদনশীল পথ তৈরি হচ্ছে—উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইউরোপ বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে এগোতে পারে। এর অর্থ হবে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক বা গোয়েন্দা কার্যক্রমের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহার করতে না দেওয়া। এমনকি এমন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা, যা অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করে এবং হরমুজ সংকটকে আবারও ফিরিয়ে আনে। এটি কোনো ছোট সিদ্ধান্ত নয়; বরং বড় কৌশলগত পরিবর্তন।

তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে এখনো কৌশলগত ঐক্য নেই। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি সমন্বিত সামরিক প্রতিক্রিয়া গড়ে তোলার কিছু উদ্যোগ আছে। কিন্তু সমস্যা শুধু প্রতিক্রিয়ার ধারণা নয়; বরং তার লক্ষ্য ও সীমারেখা।

  • তামের আজরামি বেলজিয়ামে বসবাসরত রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন ছাত্র

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত