চীনের নতুন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ঘিরে কেন আতঙ্ক

পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় পানির নিচ থেকে।ছবি: এক্স (টুইটার)/চীনা মিলিটারি বিউগল

গত সোমবার প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ অংশে একটি চীনা সাবমেরিন দূরপাল্লার ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় এই পরীক্ষা করা হয়। পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রটি পানির নিচ থেকে ছোড়া হয়েছিল। এতে কোনো আসল যুদ্ধাস্ত্র ছিল না, ছিল একটি নকল বা ডামি ওয়ারহেড। ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষেপণাস্ত্রটি টুভালুর কাছাকাছি সাগরে গিয়ে পড়েছে।

চীন সরকার অবশ্য জানিয়েছে, এই উৎক্ষেপণ তাদের বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের একটি নিয়মিত অংশ। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা লক্ষ্যবস্তুকে উদ্দেশ্য করে করা হয়নি। বেইজিং আরও জানায়, তারা অন্য দেশগুলোকে এ বিষয়ে আগেই জানিয়েছিল। তাই বিষয়টি নিয়ে কেউ যেন ‘অতিরিক্ত ব্যাখ্যা’ বা ভিন্ন অর্থ না খোঁজে।

তবে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ কড়া ও তাৎক্ষণিক। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওয়াং এই পরীক্ষাকে ‘আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্টকারী’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বিশ্লেষকদের অনেকেই দ্রুত এই ঘটনাকে অন্য একটি বিষয়ের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। সেদিন সকালেই অস্ট্রেলিয়া ও ফিজির মধ্যে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়েছিল। তাদের মতে, বেইজিং আসলে এই পরীক্ষার মাধ্যমে ভয় দেখাতে চেয়েছে যে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র পুরো প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে।

আরও পড়ুন

এটি কি কেবলই নিয়মিত পরীক্ষা?

যেসব পারমাণবিক পরাশক্তির কাছে কৌশলগত ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আছে, তারা সবাই নিয়মিত এমন পরীক্ষা করে। সাবমেরিন বা ভূমি—যেখান থেকেই ছোড়া হোক না কেন, অস্ত্রগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে কি না এবং লক্ষ্যবস্তু নিখুঁতভাবে ভেদ করতে পারছে কি না, তা যাচাই করার জন্য এই পরীক্ষা জরুরি। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ভারতও একইভাবে অস্ত্রহীন ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে।

সেই হিসেবে চীনের এই পরীক্ষা নতুন কিছু নয় বা হঠাৎ আতঙ্কিত হওয়ার মতোও কিছু নয়। এটি পারমাণবিক অস্ত্রাগার সচল রাখার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই পরীক্ষাগুলো ঘন ঘন না হলেও নিয়মিত করা হয়। এবারের পরীক্ষাটির সময় এমনভাবে মিলে গেছে যখন রাশিয়ার সঙ্গে চীনের বার্ষিক নৌ-মহড়া শুরু হচ্ছিল।
তবে এই পরীক্ষা বা এর সময়টি কাউকে ভয় দেখানোর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল—এমন দাবির পক্ষে স্পষ্ট কোনো প্রমাণ নেই।

চীন সবসময়ই ‘আগে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার’ (নো–ফার্স্ট–ইউজ) নীতি মেনে চলে। এর অর্থ হলো, অন্য কোনো দেশ আগে পারমাণবিক হামলা না করলে চীন নিজে থেকে তা করবে না।

সাবমেরিন থেকে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘সেকেন্ড স্ট্রাইক’ বা পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা ধরে রাখা। এর মানে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো বড় শক্তি যদি চীনের মূল ভূখণ্ডে পারমাণবিক হামলা চালিয়ে সবকিছু ধ্বংসও করে দেয়, তাও পানির নিচে থাকা সাবমেরিনগুলো টিকে থাকবে এবং পাল্টা জবাব দিতে পারবে।

সাবমেরিন থেকে ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘সেকেন্ড স্ট্রাইক’ বা পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা ধরে রাখা। এর মানে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো কোনো বড় শক্তি যদি চীনের মূল ভূখণ্ডে পারমাণবিক হামলা চালিয়ে সবকিছু ধ্বংসও করে দেয়, তাও পানির নিচে থাকা সাবমেরিনগুলো টিকে থাকবে এবং পাল্টা জবাব দিতে পারবে।

অস্ট্রেলিয়া, ফিজি বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ছোট ছোট দেশগুলোকে ভয় দেখানোর জন্য এই ‘পাল্টা আঘাতের’ ক্ষমতা প্রদর্শনের কোনো যুক্তি নেই। কারণ, চীনের ভূমি থেকে ছোড়া সাধারণ আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রই অস্ট্রেলিয়া বা প্রশান্ত মহাসাগরের যেকোনো দ্বীপে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট।

সাবমেরিন থেকে ছোড়া এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আসলে অন্য পারমাণবিক পরাশক্তিদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এর উদ্দেশ্য হলো শত্রুকে বোঝানো যে, প্রথম ধাক্কায় আমাদের সবকিছু ধ্বংস করলেও আমরা পাল্টা আঘাত করতে সক্ষম।

চীন যদি সত্যিই ফিজিকে ভয় দেখাতে চাইত, তবে ফিজির আকাশসীমার কাছ দিয়ে একটি বোমারু বিমান উড়িয়ে দেওয়া কিংবা কাছাকাছি এলাকায় একটি যুদ্ধজাহাজের বহর পাঠানো অনেক সহজ ও কম খরচে করা যেত।

আরও পড়ুন

দুর্বল ব্যবস্থাপনা

তার মানে এই নয় যে, চীন এই পুরো বিষয়টি খুব ভালোভাবে সামাল দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সরকারের অভিযোগ, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তাদের বিষয়টি জানানো হয়েছিল। ক্যানবেরার মতে, এটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সংক্রান্ত ‘হেগ কনভেনশন’ বা আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থী।

অস্ট্রেলিয়ার এই আপত্তিটি যৌক্তিক। কারণ, অস্ত্রহীন হলেও এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র ওই অঞ্চলের উড়োজাহাজ ও জাহাজ চলাচলের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। চীনের এই ত্রুটিটি শুধরে নেওয়া উচিত। তবে নোটিশ দেওয়ার সময় নিয়ে তৈরি হওয়া এই জটিলতা আর ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না—এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
আসল সমস্যাটি লুকিয়ে আছে এই পরীক্ষাগুলোর প্রতি বিশ্বের দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রশান্ত মহাসাগরে সাবমেরিন থেকে এমন ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাত, তবে অস্ট্রেলিয়া বা তার মিত্ররা সম্ভবত চোখও পিটপিট করত না।

তাই বলা যায়, ক্ষোভের আসল কারণ ক্ষেপণাস্ত্র বা কম সময়ের নোটিশ নয়। আসল কারণ হলো, ভবিষ্যৎ শত্রু ভাবাপন্ন একটি দেশ এমন এক সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শন করছে, যা অন্য সব পরাশক্তির ইতিমধ্যেই আছে এবং তারা নিয়মিতই তার চর্চা করে।

আরও পড়ুন

দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়

সবকিছুর পরও, চীনের এই পরীক্ষা ও এর সময় নির্ধারণের পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না—তা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে আমাদের কাছে থাকা তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

তবে এটি নিশ্চিত যে, পারমাণবিক শক্তিধর চীন অন্যান্য পরাশক্তিদের মতোই তাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী ও ঝালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই ঘটনাটিকে কেউ নিয়মিত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে দেখবে, নাকি ভূ-রাজনৈতিক হুমকির সংকেত হিসেবে নেবে—তা ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে কে কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি দেখছে, তার ওপর।

  • ড. জেমস ডয়ার অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ান ইনস্টিটিউট অব ল এনফোর্সমেন্ট স্টাডিজের স্ট্র্যাটেজি ও লিডারশিপ বিষয়ের শিক্ষক।
    সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনুবাদ।